ঘোড়া থেকে নেমে সাদা দরজার সামনে এলাম। আঙ্গুলঠুকে শব্দ করলাম। আর একবার ঠুকতেই দরজা খুলে গেল। দেখি একজন বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে। বললাম খুব সমস্যায় পড়ে আপনাদের সাহায্য চাইতে এসেছি। মাজোর্কা থেকে আসছি। যাবো– আয়াচুচো শহরে! এক বুড়ো বেরিয়ে এল। বলল–আপনারা কারা? কোথায় যাবেন? বুঝলাম আমাদের কথা বারবার বলতে হবে। কারণ বুঝলাম বুড়ো লোকটি কালা। অনেক কষ্টে ঘরে আসার অনুমতি পেলাম।
ভেতরের একটা ছোট ঘরে আমাদের বসতে বলল। আমরা মেঝেতে বসে রইলাম। মেঝের শুকনো ঘাস বিছানো। দড়ি দিয়ে বাঁধা বসে আরামই পেলাম। সন্ধ্যে হয় গেছে অনেকক্ষণ। অন্ধকার ঘরে মহিলাটি একটা জ্বলন্ত মোমবাতি রেখে গেল। তাতেই ঘরের চারধার যা দেখতে পাচ্ছিলাম।
সেই দুটো আপেল খাওয়ার পর থেকে উপোস করে আছি। খিদেয় প্রায় নেতিয়ে পড়লাম। ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ বাইরের দরজা খোলার শব্দ। কে ঢুকল। বয়স্কা মহিলাটির ছেলেই হবে। যে ঢুকল সে মার সঙ্গেই কথা বলছিল। মা সবই বলল।
ছেলেটি আমাদের ঘরে ঢুকল। আমাদের এক ঝলক দেখল। বলল- আপনারা কারা? কোত্থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?
কাপাক বলল–ঈগর তুই সামলা। ঈগর আস্তে আস্তে আমাদের কথা বলল। শেষে বলল–আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত। আগে খেতে দিন। তারপরে যা বলার বলবো।
— বেশ। যুবকটি বলল। তারপর বলতে বলতে চলল–মা-রান্না কদুর? ওদের খেতে দাও। সারাদিন না খেয়ে আছে। মার কথাও শুনলাম–আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতের রান্না হয়ে যাবে। ওদের একটু অপেক্ষা করতে বল।
আমরা আর কোন কথা বললাম না। দুজনেই শুয়ে রইলাম। খেতে খেতে একটু রাতই হল। যুবকটি এল। কিছু কথাবার্তা হল। আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে গোল রুটির সঙ্গে আলুসেদ্ধ খেয়ে ঘোড়ায় উঠলাম। ঘোড়া ছোটালাম আয়াচুচোর দিকে।
কাপাক থামল। ফ্রান্সিস বলল তুমি অনেকক্ষণ কথা বলছো। একটু দম নাও। তুমি কুজকো গেলে না কেন সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি।
হা। আপনি বুঝেছেন। আপনাদেরও একঘেয়ে লাগছে বোধহয়।
–না-না। আপনি বলুন। হ্যারি বলল।
কাপাক বলতে লাগল–পরদিন সকালেই ঘোড়া ছোটালাম আয়াচুচোর দিকে। সন্ধ্যের আগেই আয়াচুচো পৌঁছলাম। সারাদিন খাওয়া জোটে নি। খিদে তৃষ্ণায় দুজনেই কাতর।
আয়াচুচো একটা ছোট শহর তবে লোকজনের সংখ্যা ভালোই। পাথরের বাড়িঘর। খুঁজে খুঁজে একটা ছোট সরাইখানা পেলাম। সেদিনের মত ঘোড়া বেচাকেনা হাটটা দেখে এলাম। এখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। হাট ভেঙে গেছে।
রাতটা সরাইখানায় কাটালাম।
পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ঘোড়া দুটো নিয়ে চললাম ঘোড়া বেচাকেনার হাটে। লোকজনের বেশ ভিড়। ঘোড়া থেকে নামলাম। দুতিনজন প্রায় ছুটে এল। একজন বলল–আমাকে কিছু মুদ্রা দিন। আমি ঘোড়াদুটো ভাল দামে বিক্রি করিয়ে দেব। বাকিরাও একই কথা বলল। আমি বললাম–বেশ আগে বিক্রি কর–তারপর তোমাকে যা দেবার দেব। ওরা রাজি হল। এখন কাকে বিক্রি করতে দেব–এই নিয়ে ওদের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেল। যে লোকটি আমার কাছে প্রথম এসেছিল তাকেই বিক্রি করতে দেব। আমি বললাম। ঝগড়া মিটল।
ঘোড়া দুটো দেখে লোকটি বলল–জিন বসার আসন পাদানি এসব বিক্রি করবেন কেন। নিজের কাছে রেখে দিন।
–কোন দরকার নেই। তুমিই নাও। আমি বললাম।
–বেশ। লোকটা এক গাল হেসে বলল।
লোকটা ঘোড়া দুটো নিয়ে হাটে ঢুকল।
আমরা ঘাসের জমির ওপর বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে লোকটি এল। দুই কাঁধে ঝুলছে ঘোড়ার সাজ সরঞ্জাম। কোমরের খুঁট থেকে সোনার মুদ্রা বের করল। হেসে বলল–ভাল দামে বিক্রি করেছি। নিন দাম। আমি সোনার মুদ্রাগুলো নিলাম। একটা সোনার মুদ্রা লোকটিকে দিলাম। লোকটি খুব খুশি।
লোকটি চলে গেল। আমরা সরাইখানায় ফিরে এলাম। সেই রাতটা ঐ সরাইখানায় কাটিয়ে পরদিন সকালেই এই পিসকো বন্দরে এলাম। দেখলাম দুতিনটে জাহাজ নোঙর ফেলে জলে ভাসছে। জাহাজের মাথায় যার যার দেশের পতাকা উড়ছে। তিনটে জাহাজেরই পতাকা দেখলাম। একটা ইংরেজদের অন্যটা ফরাসীদের। আপনাদের জাহাজে দেখলাম ডেনমার্কের পতাকা। অবশ্য আপনাদের দেশের পতাকা চিনতে বেশ কষ্টই হল। আমরা ঠিক করলাম এই জাহাজেই আমরা উঠবো। ডেনমার্ক অনেক দুরের দেশ। তবে আমাদের দেশের কাছে।
একটু রাত হতে আমরা জলে সাঁতার কেটে আপনাদের জাহাজে এলাম। তারপর তো আমরা কী করেছি আপনাদের দেখা।
–আপনাদের সব কথাই শুনলাম। একটু পরে ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল– আমাদের জাহাজে থাকবেন, খাবেন আমাদের কোন আপত্তি নেই। তবে কিছু খরচ দেবেন। আমরা খুব একটা বড়লোক নই।
–নিশ্চয়ই দেব। তা আপনারা আপনাদের দেশের দিকে কবে যাচ্ছেন? কাপাক বলল।
–সেটা এখনও স্থির করিনি। মাজোর্কার রাজা আপনাদের একটা নক্সা দিয়েছেন। আপনি নক্সাটা একটু দেখতে দিন।
নিশ্চয়ই। কথাটা বলে কাপাক কোমরের খুঁট থেকে নক্সাটা বের করল। ফ্রান্সিসের হাতে দিল।
ফ্রান্সিস বিবর্ধক কঁচটা নিয়ে নকশাটা দেখতে লাগল।
.
খুঁজে খুঁজে একটা সরাইখানা পেলাম। ছোট সরাইখানা। সরাইওয়ালাকে বললাম আমাদের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি পারেন খেতে দিন।
–কী খাবেন?
–মাংস রুটি। ব্যস আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। ঈগর বলল।
সরাইওয়ালার একজন লোক আমাদের ঘরটায় ঢুকতে বলল। ঢুকলাম এটাই শোবার ঘর। ঘাসপাতা বাঁধা বিছানা। মাথার বালিশ বলে কিছু নেই। কিন্তু আর অত ভাববার সময় নেই। হাতমুখ ধুয়ে এসে শুয়ে পড়লাম। আরো দু’জন লোকও ছিল।
