হঠাৎ সামনে নদী। আমি চিৎকার করে বললাম–ঈগর–নৌকো। দুজনে নদীর পারে এসে গড়ানো পাথরের গায়ে বসে পড়লাম। দুজনেই দ্রুত গড়িয়ে চললাম। এইসময়ে একটা বর্শা আমার কাঁধ কেটে বেরিয়ে গেল। আমি দ্রুত পেছনে ফিরে এক বুনোমানুষের বুকে হাতের বর্শাটা ঢুকিয়ে দিলাম। বুনো মানুষটা হাত পা ছড়িয়ে পড়ে গেল। আমি ঈগরের হাতের বাঁধনটা খুলে দিলাম। ঢালু পার দিয়ে গড়াতে গড়াতে নৌকোটার সামনে এসে আমরা থামলাম। এই সময় একটা বর্শা ঈগরের হাঁটুর নিচে লেগে পড়ে গেল। আবছা অন্ধকারে দেখলাম রক্ত পড়ছে। ঈগরের হাত ধরে লাফিয়ে নৌকোয় উঠলাম। নৌকোর গলুইয়ে বৈঠা রাখা। বৈঠা নিয়ে বাইতে লাগলাম। নৌকো বেশ কিছুটা চলে এসেছে তখন জলে শব্দ শুনলাম। বৈঠা চালাতে চালাতে দেখলাম দুজন বুনোমানুষ বর্শা নিয়ে সাঁতার দিয়ে আসছে। আমাদের কাছাকাছি এসে একজন আমার দিকে বর্শা ছুঁড়ল। আমি দ্রুত মাথা নোয়ালাম। বর্শাটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে জলে পড়ল। আর একটা বুনোমানুষ বর্শা হাতে। আমাদের কাছে সাঁতরে এল। ও বর্শা ছোঁড়ার আগেই আমি বৈঠাটা ওর কান লক্ষ্য করে যত জোরে সম্ভব চালালাম। বুনোমানুষটি আর্ত চিৎকার করে জলে ডুবে গেল।
অল্পক্ষণ পরেই নৌকোটা তীরে এসে লাগল। আমরা দুজন লাফ দিয়ে নামলাম। তারপর পাড় বেয়ে উঠতে লাগলাম।
তখনই সূর্য উঠল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ল। স্পষ্ট হল আকাশ নদী গাছপালা।
একটু থেমে কাপাক বলল–একটা বিনীত অনুরোধ–ঈগর হালে বসে আছে। তাকে উঠে আসতে অনুমতি দিন। শাঙ্কো বলল–আমি যাচ্ছি। শাঙ্কো চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঈগরকে সঙ্গে নিয়ে এল। ঈগরের গায়ে সব পোশাক জলে ভেজা।
ফ্রান্সিস বলল–আগে আপনারা ভেজা পোশাক ছাড়ন।
–আসুন। শাঙ্কো বলল। দুজন শাঙ্কোর পিছু পিছু গেল।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস একটা কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
–কী কথা। ফ্রান্সিস বলল।
–ওরা রাজধানী কুজকোতে না গিয়ে এই বন্দরে এল কেন?
-হ্যাঁ। আমার মনে হয় রাজধানী কুজকোয় ওঁরা থাকতে পারে নি। আবার ওঁরাই কুজকোতে না গিয়ে এখানে এল কেন? উদ্দেশ্য একটা বিদেশী জাহাজে চড়ে দেশত্যাগ। ওঁরা আর এই পেরুতে কোনদিন ফিরে আসবে না। তবে ওরা দুজনে দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন বোঝা যাচ্ছে না। ওঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সব জানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিসরা ডেক-এ বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে কাপাকরা এল। পরনে ভাইকিংদের পোশাক। দুজন বসল। ফ্রান্সিস বলল–কাপাক আপনারা রাজধানী কুজকোতে ফিরে গেলেন না কেন?
–তাহলে বলি–কাপাক বলতে লাগল কয়েকটি অঞ্চল বাদে প্রায় সারা পেরু অঞ্চল আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা পাচাকুটির অধীন। কথা প্রসঙ্গে একদিন রাজা পাচাকুটি আমাকে বললেন-তিতিকানা হ্রদের চারপাশের অঞ্চল জয় করতে হবে। আমাদের অধীনে আনতে হবে। ইনকা সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করতে হবে। কাপাক একটু থেমে বলতে লাগল–কিছু সৈন্যসামন্ত নিয়ে আমি যুদ্ধযাত্রা করলাম। তিতিকানা হ্রদের তিনদিককার দেশগুলো সহজেই জয় করলাম। কিন্তু একটি রাজ্য অধিকার করতে বেশ লড়াই করতে হল।
যা হোক সব যুদ্ধ জেতা রাজ্যে একজন করে নির্ভীক সৈন্যদের রাজা করে দিয়ে আমি কুজকো ফিরে চললাম। পথে কয়েকজন সৈন্য আর এই ঈগর আমাকে বলল কিছুদূরে একটি নগরী আছে মাজোৰ্কা। ফলে ফুলে সুশোভিত এই নগরের সবই সুন্দর। অন্য দুতিনজন সৈন্যও বলল ঐ সুন্দর নগরীর কথা।
সেদিন সকালে সব সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললাম–আমরা এখন দেশে ফিরে যাবো না। মাজোর্কা নগর আমরা যুদ্ধ করে জয় করবো। ইনকা সাম্রাজ্যের অধীনে আনবো। কাজেই আমরা এখন মাজোর্কা জয় করতে যাবো। এখন দেশে ফিরবো না? সৈন্যরা অস্ত্র উঁচুতে তুলে আমাকে সমর্থন জানালো।
আমরা মাজোর্কার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। দিন দুয়েকেরমধ্যে মাজোর্কা পৌঁছলাম। শুনলাম রাজা কুয়েক হুয়া অসুস্থ। যা হোক আমরা প্রায় বিনা বাধায় মাজোর্কা দখল করলাম।
ফেরার সময় কুজকোর কাছাকাছি এসে ঈগরকে পাঠালাম আমাদের কীভাবে অভ্যর্থনার আয়োজন হয়েছে এটা জানতে।
ঈগর বিরসমুখে ফিরে এল। বলল–রাজার অনুমতি না নিয়ে মাজোর্কা দখল করার জন্যে আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। রাজাজ্ঞা। সবাইকে মানতে হবে। আপনি কুজকো ঢুকলেই বিপদে পড়বেন।
–ঈগর আমাদের পালাতে হবে। তৈরি হও। কথাটা বলে চারদিকে তাকাতে লাগলাম।
তখন রাস্তার পাশে একটা খোলা মাঠে রাঁধুনিরা রান্নার আয়োজন করছে। সবাই ঘোড়া থেকে নেমেছে। মাঠের একদিকে আপেল গাছের সারি। ঈগরকে ইঙ্গিত করে ঐ বাগানের আড়ালে গেলাম। ঈগরও এল। আমি বললাম– ঈগর আমার পেছনে। আমি আপেল বাগানের পরেই একটা পায়ে চলা পথ পেলাম। দুজনে ঘোড়া ছোটালাম। গ্রামটাম পেলাম না।
বেশ কিছুক্ষণ ঘোড়া ছুটিয়ে একটা গ্রামের কাছে থামলাম। খাওয়া তো হয়নি। খুব খিদে পেয়েছে। আপেলের বাগান থেকে তিনটি পাকা আপেল নিয়ে এসেছিলাম। দুজনে তাই খেলাম।
প্রায় সন্ধ্যে পর্যন্ত ঘোড়া ছোটালাম। একটা গ্রামে এলাম। গ্রাম চার পাঁচটা পাথরের বাড়ি। কাছাকাছি বেশ কটা খামার। দেখে খুশি হলাম। এই গ্রামের লোকদের অবস্থা ভালই। খাওয়াতো শুধু আমাদের খাওয়া নয়। ঘোড়া দুটোকেও জল ছোলা খাওয়াতে হচ্ছিল। ঠিক করলাম আয়াচুচো গিয়ে ঘোড়া দুটো বিক্রি করে দেব। ওখানে ঘোড়া কেনাবেচার হাট বসে। গ্রামে সব ঘরের দরজাই কালো পাথরের। একটা বাড়ি দেখলাম সাদা পাথরের। সাদা পাথরের দাম বেশি।
