-ঠিক আছে–নক্সাটা পরে দেখছি। তারপর কী করলেন? ফ্রান্সিস বলল।
রাতের খাবার খেয়ে ঘরে এলাম। ক্লান্ত শরীর। শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ একটা চিন্তা মাথায় এল। আচ্ছা–নকশাটা বোঝাচ্ছে রাজা কুয়েক হুয়ার ঠাকুর্দার ধনসম্পদ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন? যদি গোপনেই রাখলেন তবে ছেলেকে মানে রাজা কুয়েক হুয়াকের বাবাকে বললেন না কেন? না-না। কাল সকালে একবার রাজার কাছে যেতে হবে। আরো কিছু জানার আছে। কথা বলা থামিয়ে কাপাক বলল–আপনাদের শুনতে একঘেয়ে লাগছে নিশ্চয়ই।
— না না ফ্রান্সিস বলল–আপনি বলুন।
কাপাক বলতে লাগল–আমি পরদিন সকালে রাজা কুয়েক হুয়ার কাছে গেলাম। সঙ্গে ঈগরকে নিয়ে গেলাম। রাজার শয়নঘরে ঢুকলাম। দেখি রাজা উঠে বসেছেন। রাণী তাকে সকালের খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন।
–তা হলে আমি যাই। পরে আসবো। আমি বললাম।
–না–না। রাজা মুখ মুছতে মুছতে বললেন–বসুন। আমার হয়ে গেছে।
দেয়ালের কাছে রাখা আসনে দু’জন বসল। এবার আমি বললাম একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না।
–কোন কথা? রাজা বললেন।
–আপনার ঠাকুর্দা ধনসম্পদ গোপনে রেখেছিলেন কেন? আমি জানতে চাইলাম।
–এই মাজোর্কার নদীর ওপারে থাকে দুতিন গোষ্ঠীর বুনোমানুষরা। দুটি গোষ্ঠী সভ্য হয়েছে কিন্তু একটি গোষ্ঠী এখনও বুনো স্বভাবের। এরা মাঝে মাঝে এই মাজোর্কা নগরে এসে লুঠপাট করে পালিয়ে যায়। তাই এদের হাত থেকে বাঁচাতে ঠাকুর্দা গোপনে ধনসম্পদ রেখেছিলেন পরে পিতাকে বলে যাবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু ঐ বুনোমানুষদের সঙ্গে লড়াইয়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান। বাবাকে কিছু বলে যেতে পারেন নি। আমিও অবশ্য ঐ ধনসম্পদের আশা ছেড়ে দিয়েছি।
–তা কেন? আমি দেখছি। আমি বললাম। কাপাক বলল।
দেখুন চেষ্টা করে। রাজা বললেন।
আমি বললাম–আপনার প্রাসাদরক্ষীরা কোথায় গেল?
–এই রাজবাড়ির পেছনদিকে একটা বড় ঘর আছে। ওটাই দ্বাররক্ষীদের থাকবার ঘর। ওরা বোধহয় বেরোতে সাহস পাচ্ছে না।
–ঠিক আছে। আমি ওদের ভরসা দিচ্ছি। আমি বললাম। রাজবাড়ির থেকে বাইরে এলাম। তারপর রাজবাড়ির পেছনে গেলাম। রাজার রক্ষীদের বললাম– কাজে যাও। কোন ভয় নেই। বিস্তৃত মাঠ পার হয়ে আমরা নগরে এলাম। ঈগরকে বললাম–গলা চড়িয়ে বলে দে আপনারা যে যার বাড়িতে চলে আসুন। আর লড়াই হবে না। ঈগর আমার কথাগুলো জোরে চেঁচিয়ে বলল। লোকজন আস্তে আস্তে ফিরে আসতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই প্রচার চালালাম তারপর আস্তানায় ফিরে এলাম।
–তারপর? হ্যারি বলল।
–বিকেলের দিকে আমি ঈগরকে নিয়ে নদীর দিকে গেলাম। তখন অন্ধকার হয়ে আসছে। দেখলাম নদীটি বেশ নীচে দিয়ে বয়ে চলেছে। ঢেউ নেই তেমন। তবে আন্দাজে বোঝা যাচ্ছে বেশ স্রোত আছে। হঠাৎই দেখলাম একটা নৌকো নদীতে দোল খাচ্ছে। আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলাম–বুনোমানুষ! জোরে বললাম–ঈগর পালা। আমার কথা শেষ হওয়ামাত্র পিঠে বর্শার খোঁচা খেলাম। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ছোটার চেষ্টা করলাম না। ছুটতে গেলে বর্শা পিঠে ঢুকে যাবে। ঈগর প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—বুনোমানুষ।
–চুপ করে ওরা যেমন নির্দেশ দেয় সেভাবেই চলল। আমি বললাম।
চারপাঁচজন বুনোমানুষ বর্শা হাতে পাশের ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এল। একটা বুনোমানুষ আমাদের কাছে এসে কী বলল। কিছুই বুঝলাম না। বুনোমানুষদের দেখলাম। সারা গায়ে লোম। মুখে লালচে দাড়ি গোঁফ। মাথায় কঁকড়া লাল চুল। যে আমার পিঠে বর্শার মুখটা চেপে ধরেছিল সেই বর্শার মুখটা জোরে চেপে ধরল। বুনোমানুষরা তখন হাঁটতে শুরু করেছে। নদীর ঢালু পার দিয়ে আমরা নামতে লাগলাম। আমরা দুজনে কখনও কখনও হোঁচট খাচ্ছি। কিন্তু বুনোমানুষরা সোজা চলেছে। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার নয়। আকাশে ভাঙা চাঁদ। এই আবছা আলোতেও চারদিকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।
ওরা ঠেলে নৌকোয় ওঠালো। সারাক্ষণ পিঠে বর্শার মুখ চেপে ধরা। সবাই নৌকোয় উঠল। ওরা এমনভাবে বসল দাঁড়ালো সহজে সবাই এঁটে গেল। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নৌকো চলল। নদীর জল ছুঁয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বইল। একজন বৈঠা বাইতে লাগল।
ওপারে নৌকো এসে লাগলো। সবাই আস্তে আস্তে নেমে এল। আমার পিঠে বর্শার খোঁচা। আমি আর ঈগর চললাম। আবছা দেখলাম ঈগরের পিঠেও একজন বর্শা চেপে ধরে আছে। নদীর ওপারে উঠে গাছগাছালি পার হয়ে একটা উঠোনের মত জায়গায় এলাম। আমি শুধু চারদিকে নজর রেখে যাচ্ছি কীভাবে পালাবো। একটা কথা বুঝলাম না বুনোমানুষরা আমাদের ধরল কেন? আমাদের নিয়ে ওরা কী করবে?
ওরা উঠোনের একপাশে আমাদের দাঁড় করাল। প্রথমে একজন হাতে দড়ি নিয়ে এল। ঈগরের হাত বাঁধল। আমার কাছে আসতেই আমি ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলাম। বুনোমানুষরা হকচকিয়ে গেল। আমি দুহাত নেড়ে বার বার কেঁদে উঠতে লাগলাম। বুনোমানুষরা হো হো করে হাসতে লাগল। আমি বাঁ হাতের কনুইটা বার বার দেখাতে লাগলাম। বুনোমানুষটা কী ভাবল জানি না। আমার হাত বাঁধলো না।
ওরা উঠোনের মাঝখানে আগুন জ্বালল। আগুনটা ঘিরে ওদের নাচ শুরু হল। দুটো কাঠ ঠুকে তাল দিতে লাগল কয়েকজন।নাচ চলল। রাত গম্ভীর হল। আমি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে নজর রাখছি। বুনোমানুষরা কে কী করছে।
একসময় দেখলাম একজন বুনোমানুষ একগাদা শুকনো কাঠ অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দিল। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। এবার বুনোমানুষটা ঈগরের কাছে এল। ঈগরের হাতে বাঁধন আর একটা দড়ি বাঁধাল। আমি চিৎকার করে বললাম–ঈগর পালাও। আমি কাছেই দাঁড়ানো এক বুনোমানুষের হাত থেকে বর্শাটা এক ঝাঁকুনি দিয়ে কেড়ে নিলাম। বললাম–ঈগর ছোটো। দুজনে ছুটতে শুরু করেছি তখনই একটা বর্শা। এসে সামনের একটা গাছের গায়ে গেঁথে গেল। ঈগর সঙ্গে সঙ্গে বর্শাটা খুলে নিয়ে ছুটল। আমরা বুনোমানুষদের ছাড়িয়ে যেতে পারছিলাম না।খুবই স্বাভাবিক। বুনোমানুষরা এই জঙ্গলেই থাকে। গাছের বাধা দ্রুত পার হয়ে ওরা ছুটতে অভ্যস্ত। আমি তবু হাল ছাড়লাম না। দু’একটা বর্শা আমাদের সামনে পেছনে পড়তে লাগল। সেই বর্শা খুঁজে বের করতে গিয়ে ওরা পিছিয়ে পড়ছিল।
