–রাজা তখনও অসুস্থ? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। আমরা খুব সহজেই মাজোর্কার সৈন্যদের হারিয়ে দিলাম। রাজপথের পাহারাদাররা পালিয়ে গেছে। মাজোর্কার লোকজন রাস্তায় নেই বললেই চলে। সবাই নিজেদের বাড়ির ভেতরে। আমরা বিনা বাধায় রাজবাড়ির সামনে এলাম। দেউড়ির বড় দরজাটা হাঁ করে খোলা।
আটদশজন রাজরক্ষী তরোয়াল উঁচিয়ে আমাদের দিকে ছুটে এল। আমি চাইনি আরো লড়াই হোক। তাই আমি চিৎকার করে ওদের বললাম– মিছিমিছি মরতে আসছো কেন? সমস্ত মাজোর্কা আমাদের অধীনে এখন। তোমরা অস্ত্র ত্যাগ কর। বিনা কারণে আর তোমাদের হত্যা করবো না। ওরা বুঝল ওরা পরাস্ত হয়েছে। এখন লড়াই করতে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। ওরা অস্ত্র ত্যাগ করল।
-তারপর? হ্যারি জানতে চাইল।
–বলছি। কাপাক বলল। একটু চুপ করে থেকে কাপাক বলতে লাগল—
তখন সকাল হয়েছে। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। রোদ ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
–আমরা রাজবাড়িতে ঢুকলাম। সব পাহারাদার পালিয়েছে। বাইরের মন্ত্রণা ঘর পার হয়ে অন্তঃপুরে ঢুকলাম। একটা কাঠের বড় শয্যায় একজন গলা পর্যন্ত চাদরে ঢেকে শুয়ে আছেন। তার মাথার কাছে বসে আছেন একজন মহিলা। বুঝলাম এরাই রাজা আর রাণী। আমি বললাম–আপনারাই বোধহয় রাজা কুয়েক হুয়া আর রাণী।
অসুস্থ রাজা আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। বললেন–আপনি ঠিকই বুঝেছেন। এখন আপনারা কি চান?
–আমি আপনাদের বন্দী করতাম। কিন্তু যা শুনেছিলাম তা ঠিক। আপনি গুরুতর অসুস্থ। আমি বললাম।
–হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। আমার পুত্র কন্যাকে অন্যত্র রেখেছি। আপনি আমাদের হত্যা করতে পারেন।
আমি খোলা তরোয়াল কোষবদ্ধ করলাম। আমার সঙ্গীরাও তরোয়াল কোষবদ্ধ করল।
রাজা ক্ষীণস্বরে বললেন–ওষুধটা দাও। রাণী বিছানা থেকে উঠলেন। একটা চিনেমাটির গ্লাসে জল নিয়ে ওষুধের বড়িটা নিয়ে এগিয়ে এলেন। রাজাকে ওষুধ খাওয়ালেন।
আমি বললাম–মাননীয় রাজা আপনি অসুস্থ। আপনি এখানেই থাকবেন। ওষুধ খেয়ে সুস্থ হবার পর আপনাকে মাজোর্কা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এটা আমার কথা বললাম। আমাদের রাজা পাচাকুটি এরপরে যা স্থির করবেন সেটাই করতে হবে। তবে আপনাদের গায়ে হাত দেওয়া হবে না এটা জেনে রাখুন। রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুখে দাড়ি গোঁফ চোখ দুটো কোটরে। সারা মুখ সাদাটে রক্তহীন। বুঝলাম রাজার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। ভাবছি কী করবো এখন।
রাজা কুয়েক হুয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝলাম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই বললাম–আপনি অমন করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? কাপাক থামল।
এসময় ফ্রান্সিস বলল–কাপাক আপনাকে তুমি করে বলা উচিত হয়নি। মাফ করবেন।
–না–না তাতে কী হয়েছে? কাপাক হেসে বলল।
হ্যারি বলল–আপনি কী যেন বলছিলেন।
-হা—-কাপাক বলল। তারপর বলতে লাগল–আমার কথা শুনে রাজা কুয়েক হুয়া আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। আমি রাজার কাছে গেলাম। রাজা ফিস ফিস করে কী বললেন আমি ঠিক বুঝলাম না। রাজা বুঝল সেটা। আমাকে মাথা নামাতে ইঙ্গিত করল। আমি রাজার মুখের উপর ঝুঁকলাম। রাজা বললেন–আপনার সঙ্গের সৈন্যদের এখান থেকে দূরে যেতে বলুন। একটা খুব দরকারি কথা আপনাকে বলব। আমি সঙ্গের সৈন্যদের বললাম–তোমরা যাও। আমি আসছি। সৈন্যরা বেরিয়ে গেল।
রাণী ভেতরের ঘরে গিয়েছিলেন। তখনই রাণী ঘরে ঢুকলেন। রাজার শিয়রে গিয়ে বসলেন।
একটা কথা বলি।রাজা বললেন।
–কী কথা। রাণী বললেন।
–পুরুষানুক্রমে যে নক্সাটা গয়নার বাক্সে পড়ে আছে সেটা এঁকে দেব। রাজা বললেন।
–উনি কি পারবেন নক্সাটা ঠিক বুঝতে? রাণী বললেন।
–দেখা যাক। একটু থেমে বললেন–তাহলে নক্সাটা বের করে দাও। রাণী উঠে দাঁড়ালেন। রাজার মাথার বালিশের নিচে হাত ঢোকালেন। একটা চামড়ার ছোট্ট ব্যাগমত বের করলেন। রাজার হাতে দিলেন। রাজা ওটা হাতে নিলেন। ব্যাগটা আমাকে দিলেন। আমি ছোট্ট ব্যাগটা খুললাম। দেখি একটা গোল বিবর্ধক কাঁচ রয়েছে একটা খোপে। অন্য খোপ থেকে বেরুলো একটা নক্সাটা ছোট্ট চৌকোনো পার্চমেন্টের শক্ত কাগজ।
–ঐ কাগজে একটা নকশা আঁকা আছে। রাজা বললেন। আমি দেখেটেখে কিছুই বুঝলাম না।
–ঐ বিবর্ধক কঁচটা দিয়ে নক্সাটা দেখুন। রাজা বললেন।
একটু থেমে কাপাক বলল–আমি বিবর্ধক কাঁচটা দিয়ে দেখলাম–তাসের মতো চৌকোনো কাগজটার চারদিকে সোজা দাগ। চারদিকে চারটে করে ফুলদানি তাতে ফোঁটা ফুল বুঝলাম এই নকশার অর্থ বের করতে আমার সময় লাগবে। বললাম তাহলে এই নকশাটা আমাকে দিলেন?
-হ্যাঁ। আমার ঠাকুর্দার হাত থেকে বাবা পেয়েছিলেন। ঠাকুর্দা বলেছিলেন নক্সা দিলাম। এর অর্থ বের করতে পারলে তুমি প্রচুর হীরে মণি মুক্তোর অলংকার পাবে। সোনা, রূপো তো পাবেই। রাজা হাঁপাতে লাগলেন। আমি বললাম–আমি বুঝেছি। আর কথা বলবেন না। আমি চলি। আপনি বিশ্রাম করুন। আমি চলে এলাম।
ঘোড়ায় চড়ে সমস্ত মাজোর্কা ঘুরলাম। রাজার তৈরি সৈন্যাবাস ফাঁকা। কেউ নেই। আমি আমার সৈন্যদের সৈন্যাবাসে আসতে খবর পাঠালাম।
কিছুক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা এল। আমি একটা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। নক্সাটা কোমরে গোঁজা। বের করলাম। বিবর্ধক কাঁচ দিয়ে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় নক্সাটা বেশ কিছুক্ষণ দেখলাম। কিন্তু প্রায় কিছুই বুঝলাম না।
