–তেমন কিছু নয়। তবে নিয়মিত ওষুধ লাগাতে হবে। সাতদিন একেবারে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। ভেন বলল।
–ভেন, আপনি ওষুধ খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে গেছেন তো? মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ, হ্যারিকে সব নির্দেশ দিয়েছি। ভেন বলল। তারপর দুটো ওষুধের বোয়াম কাপড়ের ঝোলা হামানদিস্তা নিয়ে ভেন চলে গেল।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বিস্কো কেবিনঘরে এল। বেশ গরম পড়েছে। কেবিনঘরে থাকা চলবে না। ও একটা মোটা কাপড়ের চাদর নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এল। জোর হাওয়া বইছে। বিস্কো মাস্তুলের কাছে চাদরটা পাতল। তারপর শুয়ে পড়ল। আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ। আধখানা চাঁদ আকাশে। বিস্কো চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদটা কখনো মেঘে ঢাকা পড়ছে। বেশ অন্ধকার তখন। মেঘ সরে যেতেই চাঁদ বেরিয়ে আসছে। তখন আলো। চাঁদ আবার মেঘে ঢাকা পড়ছে। বিস্কো চাঁদ আর মেঘের খেলা দেখতে লাগল। তারপর পাশ ফিরে শুল। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
বিস্কোর মত সাত আটজন ভাইকিং ডেক-এ ঘুমোচ্ছিল।
হঠাৎ একটা জোর শব্দ হতে বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল। বিস্কো এদিক ওদিক তাকালো। ভাবতে লাগল শব্দটা কোনদিকে হয়েছে? তখনই আবার শব্দ হল। বিস্কো এবার বুঝল শব্দ হয়েছে হালের দিকে। বিস্কো আস্তে আস্তে উঠে বসল। আস্তে আস্তে পা ফেলে চলল হালের দিকে। হালের কাছে আসতেই দেখল গায়ে, চাদর জড়ানো একটা লোক তখনই হাল থেকে জাহাজের ডেক-এ নামল। প্রায় অন্ধকারেই বিস্কো দেখল লোকটির কোমরে গোঁজা তরোয়াল। বিস্কো সাবধান হল। ভাবল ঐ লোকটা তরোয়াল বের করবার আগেই বিস্কো লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটা সাবধান হবার সুযোগই পেল না। চিৎ হয়ে ডেক-এর ওপর গড়িয়ে পড়ল। বিস্কো দ্রুত লোকটার কোমর থেকে তরোয়ালটা বের করে নিল। লোকটা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। বিস্কো বলল–তুমি কে? লোকটি ভাঙা গলায় বলল–দোহাই। তরোয়াল চালাবেন না। আমি সব বলছি।
–বেশ বলো।বিস্কো তরোয়াল নামিয়ে বলল। লোকটার গায়ে ইনকাদের পোষাক। বেশ ধূলো মাখা, মলিন।
বিস্কোদের কথাবার্তায় দুজন ভাইকিং বন্ধুর ঘুম ভেঙে গেল। দুজন বিস্কোদের কাছে এল। দেখল বিস্কো তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। বিস্কো এক বন্ধুকে বলল–যাও ফ্রান্সিসকে ডেকে নিয়ে এসো। বন্ধুটি ছুটে গেল। একটু পরেই ফ্রান্সিস এল। বিস্কোকে বলল কী ব্যাপার?
–এই লোকটা লুকিয়ে আমাদের জাহাজে উঠেছে। বিস্কো বলল।
ফ্রান্সিস লোকটার দিকে তাকাল। বলল, তুমি তো ইনকা?
হা। লোকটা মাথা ওঠানামা করল।
–তুমি আমাদের জাহাজে এসেছো কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–আশ্রয় নিতে। লোকটি বলল।
–কেন? অন্য কোনখানে আশ্রয় নিতে পারতে। ফ্রান্সিস বলল।
–না। কোন ইনকার বাড়িতে আশ্রয় নেবার উপায় নেই। লোকটি বলল।
–কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–সব বলছি। তার আগে আমাকে খেতে দিন। দুদিন যাবৎ না খেয়ে আছি। লোকটি বলল।
ফ্রান্সিস বিস্কোকে বলল–একে আমাদের রসুইঘরে নিয়ে যাও। পেট ভরে খেতে দাও। তারপর লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল–তোমার নাম কি?
কাপাক বলেই ডাকবেন। কাপাক বলল।
–বেশ। যাও। আমি তোমার ফেরার জন্যে অপেক্ষা করছি। ফ্রান্সিস বলল।
কাপাক খেতে গেল। তখনই হ্যারি এল। বলল–ফ্রান্সিস কী ব্যাপার?
–ঠিক বুঝতে পারছি না। এক ইনকা আমাদের জাহাজে লুকিয়ে উঠেছে। আমাদের কাছে আশ্রয় চায়। ও যেন বলতে চাইছে কোন ইনকা ওকে আশ্রয় দেবে না। কারণটা ও এখনও বলেনি। দুদিন না খেয়ে আছে। তাই আগে খেতে পাঠালাম। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখা যাক–কথা বলে। হ্যারি বলল।
কিছুক্ষণ পরে বিস্কো কাপাককে নিয়ে এল। ফ্রান্সিসকে বলল কাপাক প্রায় তিনজনের খাবার খেয়েছে। বোঝাগেল ও সত্যিই খুব ক্ষুধার্ত ছিল।
ফ্রান্সিস বলল–কাপাক এবার তোমার পরিচয়টা দাও।
কাপাক বলতে লাগল–পেরুর বর্তমান রাজা পাচাকুটি। আমি তার ভাই।
-বলো কি? রাজার ভাই–তোমার এই দুর্দশা কেন? কোথাও থাকা, খাওয়ার জায়গা পাচ্ছো না! ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলো তো। ফ্রান্সিস বলল। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে কাপাক বলল-বড়ভাই আমাকে কিছু যোদ্ধার সঙ্গে পাঠিয়েছিল– তিতিকানা হ্রদের চারপাশে যে উপজাতিরা বাস করত তাদের যুদ্ধে হারিয়ে ঐ অঞ্চল ইনকা সাম্রাজ্যের মধ্যে আনতে। আমি যোদ্ধাদের নিয়ে তিতিকানা অঞ্চলে গেলাম। সেখানকার সব উপজাতিদের যুদ্ধে হারিয়ে দিলাম। অঞ্চলটা আনলাম ইঙ্কা সাম্রাজ্যের মধ্যে। উপজাতি সর্দারদের বন্দী করলাম। তিতিকানা অঞ্চলে একজন ইনকা আর কিছু সৈন্য রেখে আমরা ফিরে আসছিলাম। তখন কয়েকজন সৈন্য আমাকে মাজোর্কা নগরের কথা বলল। মাজোর্কা নগরের কথা আমি আগেও শুনেছিলাম। সৈন্য কয়েকজন বলল–তারা খবর পেয়েছে মাজোর্কার রাজা কুয়েক হুয়া এখন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ওখানে অরাজকতা চলছে। মন্ত্রী আর সেনাপতির মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। সৈন্যরাও বুঝতে পারছে না কার হুকুম তারা মানবে–মন্ত্রীর না সেনাপতির? এই ডামাডোলের মধ্যে আমরা সহজেই মাজোর্কা জয় করতে পারব। আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। একটাই কথা ভাবলাম আমার দাদা মাজোর্কা জয় করতে বলে নি। বলেছিল তিতিকানা হ্রদের চারপাশের উপজাতিদের যুদ্ধে হারিয়ে রাজধানী কুজকোতে ফিরতে হবে। মাজোর্কা জয়ের নির্দেশ দাদা দেয় নি। তবু আমি ভাবলাম–যদি মাজোর্কা জয় করে আসি তাহলে দাদা বোধহয় মনঃক্ষুণ্ণ হবে না। ইনকাদের সাম্রাজ্যও তো বাড়বে এতে। কাজেই আমি সৈন্যদের নিয়ে যাত্রা করলাম মাজোর্কার দিকে। মারাত্মক ভুল করলাম। তখনও বুঝিনি এর ফল কী হবে।
