এবার তিনজনে খালি জলের পীপে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস বলল–বাঁ দিকটা মনে হচ্ছে মরুভূমি। ডানদিকে ঐ টিলাটার দিকে চল। তিনজনে দুটো পীপে নিয়ে চলল।
ওরা টিলার কাছে এল। ছোট টিলা। শুকনো খটখটে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার টিলার নিচটা কিচ্ছু ওপাশে ছোট বুনো গাছ ফার্ণ গাছ। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–হ্যারি এখানে জল আছে। টিলার ওপাশে চল। ওরা টিলাটা ঘুরে ওপাশে আসছে তখন খুব মৃদু জল পড়ার আওয়াজ শুনল। কাছাকাছি আসতেই দেখল টিলার মাঝামাঝি জায়গা থেকে জল বেরোচ্ছে। ঝর্ণা। জল নিচে পড়ে পড়ে গর্ত হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো গর্ত মত জায়গাটাতে পীপে বসাও। তবে খুব বেশি জল পড়ছে না। পীপে ভরতে সময় লাগবে।
শাঙ্কো গর্তটায় পীপে বসাল। পীপেয় জল পড়তে লাগল। শাঙ্কো ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি টিলার ছায়ায় বসে রইল।
একটা পীপে ভরে গেল। শাঙ্কো পীপেটা ধরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁধে তুলে নিল। নিজেদের নোঙর করা জাহাজের দিকে চলল। ফ্রান্সিস অন্য পীপেটা বসাল। পীপেটা ধরে রেখে ঝর্ণার জল ভরতে লাগল।
হঠাৎ ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। তখনও পীপেটা জলে ভরে নি। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল–হ্যারি আমরা বোধহয় বিপদে পড়লাম। পেছনের জংলা ডালপাতা ভাঙবার শব্দ হল। পাঁচ-ছ’জন ইনকা যোদ্ধা খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে এল। ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে ঘিরে দাঁড়াল। যোদ্ধাদের মাথায় ফেট্টির মতো বাঁধা তাতে নানা পাখির পালক গোঁজা। যোদ্ধাদের পরনে নানা রঙের পোশাক। তাতে রঙীন সুতোর কাজ করা। মাথায় লম্বা চুল। বেশ শক্ত সমর্থ চেহারা। তখনই ফ্রান্সিসের পীপেটা ভরে গেছে।
ইনকা যোদ্ধাদের দলনেতা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস আর হ্যারির দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা কারা? কোত্থেকে এখানে এসেছো? হ্যারি বলল–আমরা ভাইকিং। আমাদের জাহাজে চড়ে আমরা নানা দেশ ঘুরে বেড়াই। গুপ্তধনের কথা শুনলে আমরা সেই গুপ্তধন উদ্ধার করি।
–তারপর গুপ্তধন নিয়ে পালাও। দলনেতা বলল।
–এই অভিযোগ মিথ্যে। ফ্রান্সিস বলল।
এবার দলপতি তরোয়াল কোষবদ্ধ করল। বলল–তোমাদের তরোয়ালও ফেলে দাও। ফ্রান্সিস আর হ্যারি তরোয়াল রেখে দিল বালির উপর। দলপতি বলল–এখন বলো তো, এখানে কেন এসেছো?
–আমাদের জাহাজে পানীয় জল ফুরিয়ে গেছে। এখানে ঝর্ণা থেকে জল নেব বলে এসেছিলাম। আমাদের কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই। ফ্রান্সিস বলল।
যা হোক–তোমাদের বন্দী করা হল। দলপতি বলল।
–আমরা তো কোন অপরাধ করি নি। তাছাড়া আমাদের জাহাজে আমাদের বন্ধুরা। সব তৃষ্ণার্ত। তাদের জন্যে এই জলভরা পীপে নিয়ে যাচ্ছিলাম। এটা জাহাজে পৌঁছে দিয়ে আমি চলে আসবো। ফ্রান্সিস বলল।
–যদি পালাও? দলপতি বলল।
–আমার বন্ধু হ্যারি রইল। বন্ধুকে ফেলে তো পালাতে পারবো না।
হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস শাঙ্কো আসছে। শাঙ্কো আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। বুঝল ওরা বন্দী হল।
–শাঙ্কো তরোয়াল ফেলে দাও। শাঙ্কো ওদের কাছে এল। তরোয়াল কোমরের ফেট্টি থেকে বের করে বালির ওপর ফেলে দিল। দলপতি একজন ইনকা সৈন্যকে ইঙ্গিত করল। সেই সৈন্যটি তরোয়ালগুলো তুলে নিল। নিজের কোমরে প্যাচানো দড়ি খুলল। তরোয়ালগুলি বেঁধে ঝুলিয়ে নিল।
–তাহলে আমি জলের পীপেটা জাহাজে রেখে আসছি। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি যদি আর না ফেরো? দলপতি বলল।
দুই বন্ধুকে ফেলে পালাবো? ফ্রান্সিস বলল।
–তা পারো। দলপতি বলল।
–আমাদের বন্ধুত্ব অত ঠুনকো নয়! যাক গে বেলা বাড়ছে। আমি যাচ্ছি।
তুমি যদি না ফেরো তাহলে তোমার বন্ধুদের এখানেই হত্যা করা হবে। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি শাঙ্কো আমি জলের পীপে পৌঁছে দিয়ে আসছি। শাঙ্কো ওদের দেশী ভাষায় বলল–বন্ধুদের এনে লড়াই করতে পারি। এরা ছয় জন।
–না। ঐ দেখ। ঘোড়ায় চড়ে ইকা যোদ্ধারা আসছে! মানে সৈন্যাবাস কাছেই আছে।
দলপতি ফ্রান্সিসকে বলল–বেলা বাড়ছে। জল নিয়ে যাও। তারপর ফিরে এসো।
ফ্রান্সিস দেখল ঘোড়ায় চড়ে ইকা যোদ্ধারা এদিকেই আসছে। ফ্রান্সিস পীপেটা কাঁধে তুলে নিল। চলল ওদের জাহাজের দিকে।
টিলার পাশেই কয়েকটা পাথরের খণ্ড পড়ে ছিল। হ্যারি তার একটাতে বসল। শাঙ্কোও পাশে বসল! যোদ্ধারাও কয়েকজন পাথরে বসল। এখানে ঝর্ণাটা আছে বলে পাথরগুলো খুব গরম নয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস নৌকো চালিয়ে তীরে উঠল। নৌকোও পারের ওপর দিকে টেনে এনে রাখল।
ফ্রান্সিস হ্যারিদের কাছে এসেছে তখনই সাত আটজন অশ্বারোহী যোদ্ধা ওখানে এল। টিলাটার ওধারে যোদ্ধারা বসেছিল। অশ্বারোহী যোদ্ধারা ওখানে এল। অশ্বারোহীদের মধ্যে সবচেয়ে সামনে আসছে একজন একটা ধবধবে সাদা ঘোড়ায় চড়ে।
যোদ্ধারা উঠে পরপর দাঁড়াল। বোঝা গেল অশ্বারোহী যোদ্ধাদের মধ্যে ঐ লোকটিই সেনাপতি। গায়ে সূতীর কাজ করা পোশাক। কপালে নীল রঙের ফেট্টি। তাতে পাখির পালক গোঁজা। কোমরে কোষবদ্ধ তরবারি। তারা সংখ্যায় সাত আটজন। তারা আগের যোদ্ধাদের সামনে এল। সেনাপতি দলনেতাকে বলল কাঁপাকের কোন খোঁজ পেলে? যোদ্ধারা মাথা নুইয়ে সেনাপতিকে সম্মান জানাল। দলপতি বলল– না। আমরা চারদিকে খোঁজখবর নিচ্ছি।
–হ্যাঁ। তল্লাশী চালিয়ে যাও। সেনাপতি বলল। তারপর ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বলল–এরা কারা?
–এরা ভাইকিং। দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। গুপ্তধন আবিষ্কার করে।
