বিকেলের দিকে তুলাম নগরে পৌঁছল। জাহাজঘাটায় এল। দূর থেকে বন্ধুরা ফ্রান্সিসদের দেখতে পেল। অনেকটা ছুটে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো।
সকলে জাহাজে উঠল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, “ভাইসব, এবার আমি বাধ্য হয়ে গুপ্তধনের অংশ নিয়েছি। বাকিটা একজন বিশ্বস্ত লোককে দিয়েছি। এবার চলো আমাদের মাতৃভূমির দিকে।”
বন্ধুরা সঙ্গে সঙ্গে পাল খাটাতে চলল। ঘড়ঘড় শব্দে নোঙর তোলা হল। জাহাজ চলল। জোর বাতাসে পালগুলো ফুলে উঠল। দাঁড় টানার প্রয়োজন নেই। সমুদ্রের জলের ঢেউ ভেঙে জাহাজ চলল।
পাথরের ফুলদানি
গতকাল গভীর রাতে পেড্রো সমুদ্রতীর দেখেছিল। কয়েক মাস পর ওরা ডাঙার খোঁজ পেল। ফ্রান্সিসের বন্ধু রা খুশিতে তখন লাফালাফি করছে। ফ্রান্সিসেরও ঘুম ভেঙে গেল। মারিয়াও খুশি। বলল–ডাঙা দেখা গেছে। ঐ ডাঙায় যারা থাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে জানা যাবে আমরা কোথায় এলাম। আমাদের দেশই বা কতদূরে।
–হ্যাঁ। তা জানা যাবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বিছানা থেকে উঠে বলল– কিন্তু অজানা জায়গায় নামা বিপজ্জনক।
–সেই ভয় পেলে তো কিছুই করা যায় না। মারিয়া বলল।
তখনই দরজায় টোকা দেবার শব্দ হল। ফ্রান্সিস দরজা খুলল। হ্যারি দাঁড়িয়ে। হ্যারি হেসে বলল–ডাঙা দেখা গেছে। এখন এটাই ভাববার যে আমরা এখানে নামবো কি না।
ফ্রান্সিস বলল–নেমে লোকজনের দেখা পেলে তবে তো বুঝতে পারবো কোথায় এলাম।
–তা তো বটেই–ফ্রান্সিস বলল–এখন ভোর হয়ে আসছে। তৈরি হয়ে যেতে যেতে সকাল হয়ে যাবে। তখন ঐ ডাঙায় যাওয়া বিপজ্জনক।
তবে তো কাল রাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। হ্যারি বলল।
তাই হবে। কাল রাত বাড়লে আমরা যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। হ্যারি মারিয়াকে বলল–রাজকুমারী কয়েক মাস ধরে আপনি নিশ্চয়ই খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
দুশ্চিন্তা হয় না? চারদিকে শুধু জল আর জল। মাটির দেখা নেই। এটা ভালো লাগে? রাজকুমারী মারিয়া বলল।
–তা তো বটেই। যাক গে–ডাঙার খোঁজ পাওয়া গেছে। এটাই বড় কথা। চলি।
হ্যারি চলে গেল। ফ্রান্সিস এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। মারিয়াও নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়ল। অল্পক্ষণের মধ্যেই দুজনে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল হল। সকালের খাওয়া দাওয়া চলল। তখনই রাঁধুনী হ্যারির কাছে এল। হ্যারি বলল–কী ব্যাপার?
ব্যাপার বড় চিন্তার। রাঁধুনী বলল।
–চিন্তার? কী হয়েছে? হ্যারি বলল।
–খাবার জল ফুরিয়ে এসেছে। দু’একদিনের মধ্যেই খাবার জল ফুরিয়ে যাবে। রাঁধুনি বলল।
বলো কি। হ্যারি বেশ চিন্তায় পড়ল। বলল–দেখি। ফ্রান্সিসকে বলছি।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরের সামনে এল। দরজায় টোকা দিল। ফ্রান্সিস একটা থালায় সকালের খাবার নিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে বলল–দরজা খোলা। হ্যারি ঘরে ঢুকল। বলল–ফ্রান্সিস–ভীষণ সমস্যায় পড়লাম।
-কেন? কি হয়েছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
রাঁধুনী বলে গেল-খাবার জল ফুরিয়ে আসছে হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস একটু ভেবে নিয়ে বলল-জল কম খেতে হবে। একটু পরেই আমাদের ডাঙায় নামতে হবে। খাবার জলের খোঁজ করতে হবে। জল আনতে হবে।
–এই দিনের বেলাই যাবে? হ্যারি বলল।
–তাই যেতে হবে। উপায় নেই। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা চলবে না।
–দিনের বেলা যাবো? বিপদে পড়বো না তো? হ্যারি বলল।
–দেখা যাক। বিপদ হতে পারে। তার মোকাবিলা করবো। তরোয়ালের লড়াই এ নামতে হলে নামবো। তবে সবই করতে হবে খুব হিসেব করে। অবস্থা বুঝে। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে দেরি করে কি লাভ। এখুনি চলো। হ্যারি বলল।
–তুমি আর শাঙ্কো তৈরি হও। আমি আসছি। ফ্রান্সিস বলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস তরোয়াল কোমরে ঝুলিয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। ততক্ষণে হ্যারি শাঙ্কো উঠে এসেছে।
ভাইকিং বন্ধুরা এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব খাবার জল ফুরিয়ে গেছে। আমরা খাবার জল আনতে যাচ্ছি। বিপদ আপদ হতে পারে। কিন্তু আমি তার পরোয়া করছি না। আমাদের যদি ফিরতে দেরি হয় তোমরা দুশ্চিন্তা করো না।
ওদিকে শাঙ্কো দুটো জলের পীপে জাহাজের দড়ি দড়া ধরে ধরে ছোট নৌকোয় তুলেছে। ফ্রান্সিস হ্যারি হালের দিকে আসছে তখন হ্যারি আস্তে বলল–ফ্রান্সিস রাজকুমারীকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে যাও। ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল। মারিয়া পেছনে পেছনে আসছিল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। মারিয়াকে বলল–মারিয়া দুশ্চিন্তা করো না। আমাদের কোন ক্ষতি হবে না।
দড়ির মই হালের কাছে নিচে নামিয়ে দেওয়া হল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি মইয়ের সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে ছোট নৌকোটায় নেমে এল। শাঙ্কো নৌকোটার বাঁধা দড়ি খুলে দিল। নৌকোটা জাহাজের গা থেকে সরে এল। শাঙ্কো বৈঠা বাইতে লাগল। নৌকো তীরভূমির দিকে চলল।
ফ্রান্সিস ডাঙার দিকটা চোখ কুঁচকে দেখতে লাগল। রোদ বেশ চড়া। ডাঙার বাঁপাশে দেখল শুধু বালি। মাটি নেই। ডানপাশে মাটি দেখল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে নরম মাটি নয়। বেশ শক্ত মাটি। ঘরবাড়ি বা লোকজন দেখা গেল না। ফ্রান্সিসের তখন একটাই চিন্তা–এখানে তো নামবো কিন্তু এখানে খাবার জল পাবো তো? তখনই দেখল ডানদিকে একটা টিলার মত।
শাঙ্কো নৌকো তীরে ভেড়াল। তিনজনেই নামল। শাঙ্কো বৈঠা রেখে নৌকোটা টেনে তীরের বেশ কিছু ওপরে নিয়ে এসে রাখল। যদি খুব জোর জোয়ারও আসে নৌকোটা ভেসে যাবে না।
