শাঙ্কো আবার সেই রাঁধুনির কাছে গেল। দেখল সেই রাঁধুনি নেই। অন্য রাঁধুনি বলল, “ও সকালের খাবার দিচ্ছে। কিছু পরে আসবে।”
শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, “বাক্সটা নিয়ে চলো সকালের খাবারটা খেয়ে আসি। তারপর তো হাতে যথেষ্ট সময় থাকবে।”
সকলে সকালের খাবার খেতে এল। খাওয়ার পর ওরা চলল পেছনের ভাড়ার ঘরের দিকে। শাঙ্কো চলল সরাইখানার মালিকের কাছে। হাতুড়ি, পেরেক চাই। মালিক বলল কিছু পেরেক একটা কাঠের বাক্সে ছিল। হাতুড়িও ছিল। কিন্তু এখন কোথায় সেগুলো সে জানে না। খুঁজতে হবে।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল সব। ফ্রান্সিস বলল, “তা হলে হাতুড়ি, পেরেক খোঁজা যাক।”
শাঙ্কো চারদিকে যখন তাকিয়ে দেখছে, তখনই নজরে পড়ল কুড়ুলটা। পাশেই কাঠের চ্যালা রাখা। শাঙ্কো ছুটে কুড়ুলটা নিয়ে এল।
ফ্রান্সিস বলল, “কী হলো?”
“কুড়ুল দিয়ে বাক্সটার তালার জায়গাটা ভেঙে ফেলব।” শাঙ্কো কথাটা বলে বাক্সটা মাটির মেঝেয় রাখল। তারপর কয়েকটা চ্যালাকাঠ নিয়ে এল। কুড়ুল দিয়ে কাটতে লাগল। আলফানসো বলল, “আপনি কী করছেন?” শাঙ্কো কোনও কথা বলল না। হ্যারি ব্যাপারটা বুঝতে পারল না।
ফ্রান্সিস বলে উঠল, “শাবাশ শাঙ্কো।”
“আর ব্যাপারটা কী?” হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, “শাঙ্কো কাঠের বাক্সে কুড়ুল চালাবার আগে কাঠ কাটছে। সবাই কাঠ কাটছে এইটাই বুঝবে। তার মধ্যেই শাঙ্কো বাক্সটায় কুড়ুলের ঘা বসাবে। সকলে ভাববে কাঠই কাটা হচ্ছে। অন্য কিছু নয়।” ফ্রান্সিসের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শাঙ্কো কাঠের বাক্সের চাবির ছিদ্রের ফুটোটার ওপর জোরে কুড়ুল চালাল। বাক্সটার ডালাটা ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে বাক্সটার ভাঙা ডালাটা তুলতে গেল। তখন সকলে ভাঙা বাক্সটার কাছে এল।
ফ্রান্সিস ভাঙা ডালাটা টান দিতেই উঠে এল। মণিমাণিক্যে ভর্তি ভাঙা বাক্সটা। কতরকম গয়না, অলঙ্কার। সেগুলো থেকে হীরের দ্যুতি বের হচ্ছে। ফ্রান্সিস ওপর থেকে বিচিত্র নকশার গয়নাগাঁটিগুলো নামিয়ে রাখল। সেসবের নীচেই অনেক স্বর্ণমুদ্রা।
সেই অতি মূল্যবান অলঙ্কার, মিনে করা ছোট্ট ছুরির বাঁট, সোনার ফ্রেমে বাঁধানো আয়না এসব দেখে আলফানসোর চোখ তখন ছানাবড়া। এত মূল্যবান জিনিস! ফ্রান্সিস, হ্যারি, শাঙ্কোর কাছে এরকম ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। কাজেই ওরা অবাক হল না।
ফ্রান্সিস বলল, “হারি, শাঙ্কো এসব এখানেই ভাগ করে আমরা নিয়ে যাব। কী বলো?”
“বাক্স ঢেকে রাখো।” হ্যারি বলল।
“শুধু বাক্স ঢেকে রাখা নয়। একেবারে এখানেই সব সেরে নিই। এ রকম শূন্য ঘর এখানে আর কোথাও পাব না।” ফ্রান্সিস বলল।
“ঠিক আছে। যা করার তাড়াতাড়ি করো।” হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস বাক্স থেকে সোনার মুদ্রাগুলো সব তুলতে তুলতে বলল, “হ্যারি তোমার কোমরের ফেট্টিটা খুলে পাতো।” হ্যারি ফেট্টি খুলে পাতল। ফ্রান্সিস সোনার মুদ্রাগুলো সেই কাপড়ে ঢালল। তারপর কাপড়টা পেঁচিয়ে নিয়ে তার মধ্যে সোনার মুদ্রাগুলো বেঁধে হাতে ঝুলিয়ে নিল।”
“আলফানসো, আমরা এখন চলে যাব। আমরা আর দেরি করতে পারব না। তুমি কাঠের বাক্সে অলঙ্কারগুলো ভরে কোমরের ফেট্টি খুলে তাতে বেঁধে নাও। বাক্সটা এখানেই রেখে দাও।” ফ্রান্সিস বলল।
“কিন্তু বাক্সটার গায়ে সোনার গিল্টিগুলো রয়েছে।” আলফানসো বলল।
“বেশি লোভ কোরো না। যাকগে, তোমাকে কেন এত অলঙ্কার দিলাম এবং এসব নিয়ে তুমি কী করবে তা আমি আগেই তোমাকে বলেছি। তুমিও রাজি হয়েছ। কথার খেলাপ কোরো না।” ফ্রান্সিস বলল।
“না ফ্রান্সিস। আপনার সব নির্দেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।” আলফানসো বলল।
“ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?” হ্যারি বলল।
“দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে সমুদ্রতীরের তুলাম নগরের দিকে রওনা হব। বন্ধুরা। নিশ্চয়ই আমাদের কোনও খবর না পেয়ে চিন্তায় পড়েছে।
ফ্রান্সিসরা দুপুরের খাওয়া খেল। স্বর্ণমুদ্রায় ভরা পুঁটুলিটা হ্যারির কাছ থেকে নিল। শাঙ্কোকে দিয়ে বলল, “কোমরে পেঁচিয়ে নাও।” শাঙ্কো পুঁটুলিটা লম্বা করে কোমরে বেঁধে নিল।
ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো, বাক্সটা এখানে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। তুমি কোমরের ফেট্টিটা খুলে বাক্সটাও জড়িয়ে নাও। কেউ যেন না দ্যাখে। তারপর তোমাকে কী করতে হবে বলেছি।”
আলফানসো ফ্রান্সিসের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। কান্না-ভেজা গলায় বলল, “আপনি আমাকে নতুন জীবন দান করলেন। এই জীবনই আমি ছেলেবেলা থেকে কামনা করেছি। আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাব জানি না।”
ফ্রান্সিস হেসে আলফানসোর পিঠে আস্তে চাপড় দিল। বলল–“তা হলে আলফানসো, আমরা জাহাজে বন্ধুদের কাছে ফিরে যাচ্ছি। চলি।”
ফ্রান্সিস, হ্যারি, শাঙ্কো সরাইখানার পাওনা মিটিয়ে রাস্তায় নামল। আলফানসো তখনই তাড়াতাড়ি ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, “আপনাদের অতটা পথ হেঁটে যেতে কষ্ট হবে। আমি একটা শস্যটানা গাড়ি নিয়ে আসছি। আপনারা অপেক্ষা করুন।”
ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। আলফানসো ডানদিকের গলিপথে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে ও একটা শস্যটানা গাড়িতে চড়ে এল। গাড়োয়ানের সঙ্গে ভাড়া ঠিক করে দিল।
ফ্রান্সিসরা গাড়িটাতে উঠল। এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলল কোবা নগরের দিকে।
ঘণ্টাকয়েকের মধ্যে ওরা কোবা নগরে পৌঁছল। সেখানে এক সরাইখানায় রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে একটা গাড়ি ভাড়া করে চলল তুলাম নগরের দিকে।
