সকলে হাত লাগাল। ধুলো-পাথর ভাঙা কাঠ সরিয়ে দেখতে লাগল। এক জায়গায় প্রায় আধখানা দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। শাঙ্কো দেওয়ালটা বেশ গায়ের জোর খাঁটিয়ে তুলে ফেলল। তখনই দেখা গেল একটা লম্বাটে বাক্স। গুঁড়ো চুনের মধ্যে। শাঙ্কো বলে উঠল, “ফ্রান্সিস, এই বাক্সটা দ্যাখো।” ফ্রান্সিস ছুটে এল। বাক্সটা দেখে বলল, “রাজা হুনাকমিনের এই গুপ্তভাণ্ডার এখন আমাদের হাতে।” ফ্রান্সিস কোমর থেকে ফেট্টিটা খুলল। বাক্সটার গায়ে লেগে থাকা চুনের ধুলো মুছল। দেখা গেল কালো কাঠের বাক্সটার গায়ে সোনারমিনে করা ফুল, লতা-পাতা। মাঝখানে নৃত্যরত হরিণ। রাস্তায় লোকজনের কথাবার্তা শোনা গেল। উৎসব শেষ। সকলে বাড়ি ফিরছে। ফ্রান্সিস ফেট্টির কাপড়টা দিয়ে বাক্সটা জড়াল। তারপর চাপাস্বরে বলল, “আর এক মুহূর্তও এখানে নয়। চলো সব।”
ওরা মন্দিরের চত্বর পার হচ্ছে তখনই প্রহরীদের একজনের চাপা কথা শুনতে পেল, “বাঁচাও, বাঁচাও।”
ওরা দ্রুত ছুটে এসে রাস্তায় উঠল। বেশ তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগল সরাইখানার দিকে। এখন সড়কপথ জনশূন্য নয়। উৎসব থেকে লোজন ফিরছে। কথাবার্তায় খুশির ধ্বনিতে ভরে উঠেছে বড় রাস্তাটা।
গুপ্তধনের বাক্সটা ফ্রান্সিস ফেট্টির কাপড় চাপা দিয়ে নিয়ে চলেছে।
ভোর ভোর ওরা সরাইখানায় পৌঁছল। নিজেদের জায়গায় এসে বসল। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস, তুমি কি নিশ্চিত যে গুপ্তধন এই কাঠের বাক্সটাতেই আছে?”
আমি নিশ্চিত–এই বাক্সটাতেই রাজা হুনাকমিন তার গুপ্তধন রেখে গেছেন। নকশায় দ্যাখো এক নৃত্যরতা হরিণের ছবি আছে। বাক্সের ওপরেও সেই ছবিটাই মিনে করে করা।”
“এখন বাক্সটা কি খুলবে?” হ্যারি বলল।
“না, এখানে নয়। তুলাম যাব–আমাদের জাহাজে উঠব, তারপর।” আলফানসো বলল, “আমার একটা কথা ছিল। আমাকে বলেছিলেন–
ফ্রান্সিস বলে উঠল, “ঠিক, ঠিক। আমার মনেই ছিল না। হ্যাঁ। হ্যারি আলফানসো নতুন করে জীবন শুরু করুক, ওইজন্যই আমি ওকে গুপ্তধনের কিছু অংশ দেব।”
“তা হলে তো বাক্স খুলতেই হয়।” হ্যারি বলল।
“ঠিক আছে।” কথাটা বলে ফ্রান্সিস ঘরটার চারদিকে তাকিয়ে দেখল। উৎসব শেষ। অনেক লোক চলে গেছে। পাঁচ-ছ’জন লোক এদিক-ওদিক শুয়ে-বসে আছে। ফ্রান্সিস বলল, “এখন খোলা যাবে। কিন্তু আসল জিনিসটাই তো নেই। বাক্সটার চাবি কোথায়?”
শাঙ্কো বলল, “উপায় নেই ফ্রান্সিস, বাক্সটা ভাঙতে হবে।”
“বুঝলাম, কিন্তু কীভাবে ভাঙবে।” ফ্রান্সিস বলল।
“একটা সরু লম্বা পেরেক চাই। তা হলেই তালাটা ভাঙা যাবে।” শাঙ্কো বলল।
“তা হলে সেইরকম একটা পেরেক জোগাড় করো।” ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি বলল, “শাঙ্কো, বাক্সটা এখানে ভাঙা উচিত হবে না। এখানে লোক কম থাকলেও বাক্স ভাঙা আর ভাঙা বাক্স থেকে সোনা, মণি-মাণিক্য বের হলে এই কয়েকজনের নজরে পড়বেই। দৃশ্যটা সাধারণ দৃশ্য থাকবে না। অত দামী দামী জিনিস, এরাই হয়তো আমাদের কাবু করে সব মূল্যবান জিনিস নিয়ে পালাতে পারে।”
“তা হলে তুমি কী বলো?” ফ্রান্সিস বলল।
“এই সরাইখানার পেছনেও দু-একটি ঘর আছে। রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘর। এখন সকালের খাবার তৈরি হচ্ছে। রাঁধুনিরা সব রান্নাঘরে। ভাড়ার ঘর ফাঁকা। ওখানে গিয়ে বাক্স ভাঙতে হবে। তা হলে আর কারও কিছু সন্দেহ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, মূল্যবান কিছুই কারও নজরে যেন না পড়ে।” ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল, “হ্যারি ধন্যবাদ। এতটা আমি ভাবিনি। তা হলে শাঙ্কো-যাও। রাঁধুনিদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করো। সেই সঙ্গে পেরেকের খোঁজটাও করো।”
শাঙ্কো চলে গেল। পেছনে রান্নাঘরে এল। দেখল দু’জন খাবার তৈরি করছে। একজন সেসব কাঠের গামলায় তুলছে।
শাঙ্কো সেই পরিবেশনকারীকে বলল, “আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল।”
“বলুন।” লোকটি বলল।
“আপনাদের পাশের ভাড়ার ঘরের তো কেউ নেই এখন?” শাঙ্কো বলল।
না। কেন বলুন তো?” লোকটি বলল।
“একটা বাক্স আমাদের সঙ্গে ছিল। তার চাবিটা খুঁজে পাচ্ছি না। কাজেই বাক্সটা “ভাঙতে হবে। আপনাদের ভাড়ার ঘরে বাক্সটা নিয়ে গিয়ে তালা ভাঙব। এখন আপনারা যদি অনুমতি দেন।”
শাঙ্কোর এত সম্মান দিয়ে কথা বলায় রাঁধুনি খুব খুশি। বলল, “যান না।”
“তখন ওই ঘরে কেউ যাবে না তো?” শাঙ্কো বলল।
“না। কেউ যাবে না।” লোকটি বলল।
“আচ্ছা, আপনারা তো কখনও বস্তাটস্তা সেলাই করেন। সেইরকম সূচ আছে আপনাদের কাছে?” শাঙ্কো বলল।
“ওরকম দুটো সূচ আছে আমাদের।” লোকটি বলল।
“তার একটা পাব?” শাঙ্কো বলল।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ভাঁড়ার ঘরের কাঠের তাকের ওপর আছে।” লোকটি বলল।
“ঠিক আছে। তা হলে আমাদের বাক্সটা নিয়ে আসছি।” শাঙ্কো বলল।
“আসুন।” রাঁধুনি বলল।
শাঙ্কো এসে সব বলল। ফ্রান্সিস হেসে বলল, “শাবাশ শাঙ্কো।”
সকলে ভাড়ার ঘরের দিকে চলল। শাঙ্কো কাপড় জড়ানো বাক্সটা নিয়ে চলল।
ভাড়ার ঘর এই সকালেও একটু অন্ধকার-অন্ধকার। শাঙ্কো তাকটায় হাত দিয়ে খুঁজল। দুটো সরু সঁচ পেল। দু-তিনটে কাঠের পাটাতনের ওপর আটা-ময়দা এসবের বস্তা রাখা। শাঙ্কো সেই পাটাতনের ওপর বাক্সটা রাখল। তারপর চাবির ফুটোয় সঁচটা ঢুকিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগল। কিন্তু বাক্স খুলল না। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর হাত থেকে সূচটা নিল। ঘোরাতে লাগল। কিন্তু তালা খুলল না। ফ্রান্সিস বলল, “এভাবে খোলা যাবে না। ভেতরের তলাটা ভাঙতে হবে। তার জন্য লম্বা পেরেক, হাতুড়ি চাই। শাঙ্কো, দ্যাখো একটা হাতুড়ি, পেরেকের ব্যবস্থা করতে পারো কি না।”
