এবার প্রহরী দু’জনকে তাদের থাকার ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। একটা ঘরের দরজা খুলে দুজনকে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল।ফ্রান্সিস একজন প্রহরীর ফেট্টি খোলার সময় ঘরের চাবিটা পড়ে গিয়েছিল। ফ্রান্সিস সেটা তুলে নিজের কোমরের ফেট্টিতে রেখেছিল।
এবার সেই চাবি দিয়ে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ফ্রান্সিসরা মন্দিরের ডান দিকের দেওয়ালের কাছে এল। তখনই ফ্রান্সিস বলে উঠল, “হিসেবে গোলমাল হয়ে গেছে। আসার সময় একটা কুড়ুল আনতে ভুলে গেছি। কিন্তু দেরি করা যাবে না। শাঙ্কো একটা কুড়ুল নিয়ে এসো। নইলে সব চেষ্টা বৃথা।”
শাঙ্কো প্রহরীদের ঘরের কাছে এল। প্রহরীদের নিশ্চয়ই এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়। তা হলে কাঠকুটো জোগাড় করতে হয়। কাঠ কাটতেও হয়। তার মানে কুড়ুল লাগে।
শাঙ্কো প্রহরীদের যে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে তার পাশের ঘরটার দোরগোড়ায় এল। ঘরটার বারান্দায় চাঁদের উজ্জ্বল আলো পড়েছে। সেই উজ্জ্বল আলোয় ঘরের অন্ধকার অনেকটা দূরীভূত হয়েছে। শাঙ্কো ঘরে ঢুকল। দেখল–একপাশে কাঠটাঠ রাখা। শাঙ্কো কাঠগুলোর কাছে এল। দেখল পাশেই একটা কুড়ুল পড়ে আছে। শাঙ্কো কুড়ুলটা তুলে নিল। বাইরে এল। দেখল, কুলটা ছোট। কিন্তু মুখটা বেশ ধারালো। শাঙ্কো ফিরে এল।
ফ্রান্সিস কুড়ুলটা নিল। কুড়ুলটা ছোট হয়ে ভাল হয়েছে।
এবার ফ্রান্সিস জংলা গাছ ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে দেওয়ালের কাছে এল। দেওয়ালের নীচের দিকে পাথরের পাটা ভেঙে পা রাখার ব্যবস্থা সেই বয়স্ক লোকটি করে রেখেছিল।
ফ্রান্সিস খোঁদলে পা রেখে রেখে অনেকটা উঠে এল। এই খোঁদলগুলো সেই বয়স্ক লোকটি কুড়ুল চালিয়ে ভেঙে ভেঙে করেছিল। এবার ফ্রান্সিস চাঁদের আলোয় দেখে দেখে পাথরের পাটায় কুড়ল চালিয়ে খুলে ফেলতে লাগল। আর সব লোকজন। পূর্ণিমার উৎসবে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। অস্পষ্ট গানবাজনার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কুড়ুল চালাবার শব্দ আর কে শুনবে বন্দি প্রহরী দু’জন ছাড়া।
আস্তে-আস্তে ফ্রান্সিস উঠতে লাগল। একটা-দুটো পাথরের পাটা খসিয়ে ফ্রান্সিস নীচে ফেলে দিচ্ছে। ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রান্সিস দেওয়ালের মাথায় উঠে গেল। নীচে দাঁড়ানো হ্যারি, শাঙ্কো, আলফানসো তাকিয়ে আছে ফ্রান্সিসের দিকে। উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় ফ্রান্সিসকে ওরা বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।
এবার ফ্রান্সিস দেওয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে কুঠুরিতে যাওয়ার কাঠের আর গুঁড়ো পাথরচুন দিয়ে তৈরি লম্বা অংশটা দেখল। এখান থেকে সাঁকোর মতো ওটার ওপর দিয়ে হেঁটে কুঠুরি দুটোয় যাওয়া যাবে।
ফ্রান্সিস চারদিক ভাল করে দেখে নিল। না–কুঠুরিতে যাওয়ার অন্য কোনও পথ নেই। ফ্রান্সিস সেই পাটাতন দিয়ে তৈরি পথটায় ডান পা রাখল। পা দিয়ে চাপ দিয়ে বুঝল দীর্ঘদিনের রোদ বৃষ্টি জলে পাটাতনটা বেশ নরম হয়ে গেছে। পায়ের চাপ দিলে দোল খাচ্ছে ওই পাটাতনটা।
ফ্রান্সিস চাঁদের আলোয় সব দেখতে পাচ্ছিল। পা-টা তুলে এনে নিচু হয়ে হাত রাখল ওই পাটাতনে। স্পষ্ট বুঝল পাটাতনটা পড়ে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস হাত তুলে নিয়ে এবার আবার বাঁ-পাটা রাখল। চাপ দিয়ে দাঁড়াতে গেল। পাটাতনটায় কড়কড় শব্দ, হল। ফ্রান্সিস বুঝল ওই পাটাতনে একটু বেশি চাপ পড়লে ভেঙে পড়বে।
ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে নকল নকশাটা বের করল। হ্যারি নকশাটা নকল করে রেখেছিল। ভাল করে দেখল–ওই অস্পষ্ট রেখাটা কুঠুরির দিকেই যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব। হয়তো পাথরকুচি চুন বালি জল মিশিয়ে দেওয়া আস্তরণটা আগে শক্ত ছিল। কিন্তু এখন রোদ বৃষ্টিতে পাটাতনটা নরম হয়ে গেছে। অল্প ধাক্কায় ভেঙে পড়ে যেতে পারে। ফ্রান্সিস কী করবে বুঝে উঠতে পারছেনা। হ্যারিদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে মনস্থির করতে পারত। কিন্তু এখন তার উপায় নেই। পাটাতন ভেঙে গেলে কুঠুরি দুটোও ভেঙে পড়বে। সেই ভগ্নস্তূপেই খুঁজতে হবে রাজা কমিনের গুপ্ত ধনভাণ্ডার।
এবার ফ্রান্সিস নীচের দিকে তাকাল। দেখল শাঙ্কো ওরা ডান দিকের দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ফ্রান্সিসের দিকে। কুঠুরি ভেঙে পড়লে ওদের কিছু হবে না। তবু সাবধানের মার নেই। ফ্রান্সিস দু’হাতের তালু গোল করে নীচের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে নিজেদের ভাষায় বলে উঠল,”কুঠুরি ভেঙে পড়বে। সাবধান।” হ্যারিরা আরও সরে গেল।
পাটাতনের কাছে এসে দাঁড়াল ফ্রান্সিস। ডান পা নামিয়ে পাটাতনে পায়ের চাপ দিতে লাগল। দু-চারবার জোরে পায়ের চাপ দিতেই কুঠুরি দুটো সশব্দে ভেঙে পড়ল সিঁড়ির ওপর। চারদিকে নৈঃশব্দের মাঝখানে বেশ জোরালো শোনাল শব্দটা। চুনের গুঁড়ো ছড়িয়ে গেল। সাদা আস্তরণ সৃষ্টি করল। হ্যারিরা চুনের সাদাটে আস্তরণ উড়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
ফ্রান্সিস যত দ্রুত সম্ভব নেমে এল।
সাদা চুনের আস্তরণ উড়ে গেল। এবার সকলে ধ্বংসস্তূপের কাছে এল। চাঁদের আলোয় দেখতে লাগল যদি গুপ্তধনের কিছুনজরে পড়ে। কিন্তু চুনাপাথর বালি ছাড়া কিছু নেই।
শাঙ্কো বলল, “ফ্রান্সিস ওই কুঠুরি দুটোর কোনওটাতে গুপ্তধন ছিল না।”
“না, না” ফ্রান্সিস বলল, “এখনও সেটা প্রমাণিত হয়নি। সব পাথরটাথর সরাও।”
