দুজনেই উঠল। ইউবেক বলল–আপনি তখন হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন কেন? ফ্রান্সিস হেসে বলল–কত কত বহুমূল্যবান অলঙ্কার সোনার চাকতি একটা বিরাট সোনার ঘণ্টা–এসব গুপ্তধন আমি বুদ্ধি খাঁটিয়ে উদ্ধার করেছি। আর আজ আমার পকেটে একটা তামার মুদ্রাও নেই।
যাক গে এই নিয়ে দুঃখ করবেন না। আমরা এবার যাবো। ইউবেক গলা চড়িয়ে বলল বন্ধুরা–গাড়িতে এসো। ইউবেক-এর বন্ধুরা দোকান থেকে বেরিয়ে এল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল একটা দুই ঘোড়া টানার গাড়ি দাঁড়িয়ে। ইউবেক-এর বন্ধুরা গাড়িতে উঠতে লাগল। ইউবেক ফ্রান্সিসকে নিয়ে গাড়োয়ানের কাছে গেল। ডাকল–বিভান?
–বলুন স্যার। বিভান বলল।
আমাদের গাড়িতে একজন লোক নেয়া যেতে পারে? ইউবেক বলল।
–গাড়ির ভেতরে আর জায়গা হবে না। উনি আমার পেছনে বসতে পারেন। তবে বেশ কষ্ট হবে।
–আমি ওভাবে যেতে পারবো। ফ্রান্সিস বলল।
ইউবেকআর বন্ধুরা গাড়িতে উঠল। ফ্রান্সিস বিভানের পেছনে টানা কাঠেরওপর বসল।
বিভান মুখে শব্দ করে চাবুকমারল। তখনইবিভানের কনুইফ্রান্সিসের পাঁজরায় গুতো দিল।
ফ্রান্সিস বুঝল বিভান যতবার চাবুক মারবে আবার একটু গুঁতো খেতে হবে। ফ্রান্সিস পরেরবার একটু কাত হয়ে গুঁতো এড়াল। এটা বারবারই হতে লাগল।
রাস্তায় গাছগাছালিতে জোৎস্না ছড়ানো। ঘোড়ার ক্ষুরের টক্ টক্শব্দ। নিশাচর পাখি। গাছের ডালের মধ্যে দিয়ে উড়ে গেল। আনন্দে ফ্রান্সিসের মন ভরে গেল।
বাকি রাতটা না ঘুমিয়েই কাটল। অবশ্য এমন একটা জায়গায় ফ্রান্সিসকে বসতে হয়েছে যেখানে ঘুমোনো অসম্ভব।
পূবদিকের আকাশে কমলা রং ধরল। একটু পরেই সূর্য উঠল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়াল। ঠাণ্ডা বাতাস বইল।
গাড়ি যখন চিচেন ইতজায় পৌঁছল তখন বিকেল। একটা সরাইখানার সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল। ফ্রান্সিস নামল। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। কোমর, পা যেন অসাড় হয়ে গেছে।
ইউবেকের কাছে এল ফ্রান্সিস। অনেক ধন্যবাদ জানাল। ইউবেক বলল, আমাদের সঙ্গে খাবেন চলুন।
–উপায় নেই। আমাকে খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুদের কাছে যেতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত হাঁটতে লাগল। কোমরে পায়ের ব্যথাটা কমে গেছে। রাস্তায় বেশ ভিড়। আজকে রাতেই পূর্ণিমা উৎসব।
সরাইখানার সামনে এল ফ্রান্সিস। তখনও হাঁপাচ্ছে। দরজা থেকেই গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি-শাঙ্কো। হ্যারি, শাঙ্কো শুয়ে ছিল। দুজনেই উঠে ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে এল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। শাঙ্কোরও সেই অবস্থা।
ফ্রান্সিস বলল–হ্যারিশক্ত হও। শাঙ্কো মালিককে বলো তো কিছু খেতে দিতে পারবে কিনা। শাঙ্কো চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বলল–তরকারি আছে। মাংস নেই, মাংসের ঝোল আছে।
–ঠিক আছে। ওসব থাকলেই হবে। আমায় খেতে দিতে বল। ফ্রান্সিস বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস খেয়ে নিল। এতক্ষণে মাথা শরীর যেন শান্ত হল।
ফ্রান্সিস বলল–আমি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেব। একটু রাত হলেই চিচেন ইতজায় যাবো। কাজে নামবো। ফ্রান্সিস গায়ের জামাটা খুলে সরাইখানার বিছানায় শুয়ে পড়ল। শরীর এত ক্লান্ত প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে উঠল। কিন্তু বিছানা থেকে উঠল না। শুয়ে রইল।
“তোমার কি বিশ্বাস যে, ওই দুটো ছোট্ট কুঠুরিতেই গুপ্তধন আছে?” হ্যারি বলল।
“আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যাকগে–একটা সূত্র তো পেলাম নকশাটায়। দেখা যাক, পাই কি না। না পেলে আবার চেষ্টা করতে হবে। দেখতে হবে, অন্য কোনও উপায়ে গুপ্তধনের হদিস করা যায় কিনা।” ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধে হওয়ার আগেই দেখা গেল রাস্তায় নোকজনের ভিড় বাড়ছে। ভিড় চলেছে পূর্ণিমা উৎসবের নাচগানের আসরে।
ফ্রান্সিস শুয়ে শুয়ে ভাবছে কীভাবে সমস্ত কাজটা সারবে।
কিছু পরে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল, “চলো সব। আজকে রাতের মধ্যেই গুপ্তধন খুঁজে বের করতে হবে। আজকের রাতটাও ভাল পেয়েছি। এক– পূর্ণর্চাদের আলো, দুই–বহু লোক পূর্ণিমা উৎসবে যাবে। নগর প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে যাবে। সারারাত। এই দুটো সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে।”
দুড়ি দুটো কোমরে বেঁধে নিয়ে ফ্রান্সিসরা সরাইখানার বাইরে এল। চলল চিচেন ইতজার মন্দিরের দিকে।
চাঁদের আলোয় মন্দিরের সামনে এসে দেখল বড় দরজাটা খোলা। তারপর চত্বরে বর্শা হাতে দুই প্রহরী পাহারা দিচ্ছে। মন্দিরে কোনও জনপ্রাণী নেই। একেবারে শূন্য।
ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল, “শাঙ্কো, ডান দিকের দাড়িওয়ালা আমার বাঁদিকেরটা তোমার। দু’জন প্রহরী চত্বরে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিচ্ছে।”
দেওয়ালের আড়ালে গিয়ে চুপ করে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো প্রহরী দু’জনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরী একজনের হাতে বর্শা রইল কিন্তু অন্যজনের বর্শা ছিটকে গেল। দুজনেই মন্দির চত্বরে পড়ে গেল। প্রহরী দু’জনের কোমরের ফেট্টি খুলে নিল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। যার হাতে বর্শা ছিল তার হাতটা শাঙ্কো পা দিয়ে চেপে ধরল। প্রহরীটি বর্শা ছেড়ে দিল। এবার ফেট্টি দিয়ে দু’জনের মুখ বাঁধা হল। প্রহরী দু’জন চেঁচিয়ে ওঠারও সময় পায়নি–এত দ্রুত দু’জনের কোমরের ফেট্টি চেপে বাঁধা হল মুখ। তারপরে কাটা দড়ি দিয়ে দু’জনের হাত বাঁধা হল। একজন প্রহরী মুখে গোঁ গোঁ শব্দ করছিল। ফ্রান্সিস তার মুখে জোরে এক চড় কষাল। গোঙানি বন্ধ হয়ে গেল।
