–দেব বৈ কি। বল তো তোমাকে বেঁধে খাওয়াতে পারি। তুমি আমার ছেলের বন্ধু।
–তাহলে আমাকে কিছু খেতে দিন। আমার হাতে সময় কম। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। বস। বুড়িমা বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়িমা একটা কাঠের থালা নিয়ে এল। ফ্রান্সিসের দিকে থালাটা এগিয়ে ধরে বলল–এই সামান্য খাবারই আছে।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস কাঠের থালাটা নিল। দেখল–বেশ কিছু মাংসর বড়া আর হাতে তৈরি কেক।
ফ্রান্সিস গোগ্রাসে খেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সব শেষ। বুড়িমা জলের ঘটি দিল। ফ্রান্সিস ঢ ঢক্ করে জল খেল। বলল–বুড়িমা আর কিছু বড়া হবে? রাস্তায় খেতাম।
–খাও না। বুড়িমা বলল।
–আপনি?
রান্না করে খাব।
–ফ্রান্সিস বলল–একটা কাপড়ের টুকরোয় বেঁধে দেবেন।
বুড়িমা চলে গেল। একটু পরেই কাপড়ের থলেতে মাংসের বড়া বেঁধে নিয়ে এল। ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস ওটা কোমরের ফেট্টিতে গুঁজে রাখল।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–বুড়িমা আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো
ধন্যবাদের দরকার নেই। তুমি আমার ছেলেকে নিয়ে এসো। বুড়িমা বলল। ফ্রান্সিস রাস্তায় এসে দাঁড়াল। রাস্তায় তেমন ভিড় নেই। ঘোড়ায় টানা গাড়ি যাচ্ছে আসছে। একটা গাড়িতে দেখল খুবই ভিড়। গাড়িটা থামল। ঘোড়াটাকে জল, ছোলা খাওয়ানো হচ্ছে। তখনই ফ্রান্সিস একজনকে জিজ্ঞেস করল- আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?
–চিচেন ইতজা–পূর্ণিমা উৎসবে।
দেখুন আমার ভাড়া দেবার ক্ষমতা নেই। আমাকে নিয়ে যাবেন?
–বিনি ভাড়ায়? পাগল? আমরা দুদিন আগেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। কত লোককে নেওয়া হল না–জায়গা নেই বলে। আর বিনা ভাড়ায় যেতে চাইছেন? লোকটি বলল। ফ্রান্সিস সরে এল। হাঁটতে লাগল।
রাত হল। ফ্রান্সিস সমানে হেঁটে চলল। রাত হয়েছে। মাংসের বড়া শেষ। ফ্রান্সিস অন্ধকারে হেঁটে চলল। জল তেষ্টা পেয়েছে। বেশ খিদেও পেয়েছে।
একটা মোড়ে স্ত্রীলোক কয়েকজনের ভিড় ফ্রান্সিস কাছে এল। দেখল একটা বড় ইঁদারা। একজন স্ত্রীলোক একটা লোহার পাত্রে জল তুলতে লাগল। দড়ি বাঁধা পাত্রটি ওপরে তুলল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। মুখের কাছে হাত পাতল। স্ত্রীলোকটি ফ্রান্সিসকে জল খেতে দিল। ফ্রান্সিস জল খেল। জল নিয়ে চোখ মুখে ঝাঁপটা দিল। মুখ তুলল। তেষ্টা মিটল।
ফ্রান্সিস হাঁটতে লাগল। এতক্ষণ আকাশে মেঘ ছিল। উঁদ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ বৃষ্টিও হল। ফ্রান্সিস বড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল।
বৃষ্টি থেমে যেতেই আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ দেখা গেল। চারদিকে চাঁদের আলো। সব কিছু রাস্তা বাড়িঘর গাছপালা সব পরিষ্কার দেখা যেতে লাগল। ফ্রান্সিস আনন্দে দু’হাত তুলে ওদের ভঙ্গিতে জিগির দিল–ওহোহো।
এবার আর একটা মোড়ে এল। একটা দোকানে বেশ ভিড়। ফ্রান্সিস দোকানটায় ঢুকল। দেখল শরতের দোকান। দোকানের দুদিকে দুটো বেঞ্চি মতো কাঠের পাটাতন রাখা। ফ্রান্সিস বসে পড়ল।
দোকান মালিক কাঠের গ্লাসে সরবৎ দিচ্ছে। ফ্রান্সিসও একটা গ্লাস নিল। সরবৎ খেতে লাগল। কী কী মিশিয়ে সরবৎ তৈরি সেটা তো জানার উপায় নেই। তবে শরবণ্টা খেয়ে গায়ে বেশ জোর পেল। হাঁটার ক্লান্তিটা কমে গেল। ফ্রান্সিস বেরোতে গেল। দোকানের মালিক হাত পাতল। ফ্রান্সিস বলল–আমি আপনাকে সত্যি কথাই বলছি। একটা গুণ্ডার জন্যে আমি বন্ধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। এক বন্ধুর কাছে অর্থ দামী জিনিস থাকে। আমার কাছে এখন রাজার একটা মুদ্রা নেই। আমি দাম দিতে পারবো না।
মালিক জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল-না-না। যেভাবে পারো দাম দাও।
সত্যি বলছি আমার থলি শূন্য।
–আমি সেসব বুঝি না দাম দাও নইলে তোমাকে বেঁধে রাখা হবে। কাল সকালে শান্ত্রী এলে তোমাকে ধরিয়ে দেব।
ফ্রান্সিস হো হো করে হেসে উঠল। যারা খাচ্ছিল তারা অনেকেই ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে দেখল।
একজন লম্বামতো লোকফ্রান্সিসের কাছে এগিয়ে এল। সে মালিককেবললক হয়েছে?
দেখুন না এই লোকটা শরবৎ-এর দাম না দিয়ে পালাতে চাইছে। ফ্রান্সিস মালিকের সামনে এগিয়ে এল। দাঁত চাপা স্বরে বলল–মিথ্যে বলো না। আমি পালাতে চেষ্টা করি নি। মালিক ফ্রান্সিসের চোখের দিকে তাকিয়ে বেশ ঘাবড়ে গেল। চুপ করে রইল। লম্বা লোকটি কোমর থেকে একটা ভেলভেটের থলে বের করল। বলল–কত পাওনা হয়েছে আপনার?
দুই মুদ্রা।
–এই নিন। লম্বা লোকটি মুদ্রা দিয়ে বলল–আর একটি কথাও নয়। চলে যান এখান থেকে। মালিক প্রায় দৌড়ে চলে গেল। লম্বা লোকটি ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে এল। মোমবাতির আলোয় ফ্রান্সিস দেখল–ভদ্রলোকের গায়ে বেশ দামী পোশাক। লোকটি ফ্রান্সিসের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল ইউবেক। ফ্রান্সিসও হাতটা ধরে বলল– ফ্রান্সিস। দুজনে করমর্দন করল।
–আসুন একটু কথা বলি। ইউবেক বলল। দুজনে কাঠের পাটাতনে বসল। ইউবেক বলল–আপনি বিদেশী। এখানে এলেন কী জন্যে?
–সে আরেক কথা। ফ্রান্সিস বলল।
–তবু একটু শুনি।
ফ্রান্সিস অল্প কথায় নিজেদের দল বেঁধে দেশে দেশে ঘোরা, গুপ্তধন আবিষ্কার এসব বলল।
–আপনি কোথায় যাবেন? ইউবেক বলল।
–চিচেন ইতজা–পূর্ণিমা উৎসবে। ফ্রান্সিস বলল।
-সে তো আমরাও যাচ্ছি। আমরা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে যাচ্ছি। গাড়োয়ানকে বলে দেখি আর একজনকে নিয়ে যাওয়া যাবে কি না। চলুন।
