দোকানের বাইরে গিয়ে ওরা আবার পূবমুখো হাঁটতে লাগল।
বিকেল হল। যেতে যেতে সন্ধ্যে হল। একটা জঙ্গলের কাছে পৌঁছল ওরা। সাইল থামল। ফ্রান্সিস, রবার্টও থামল। সাইল বলল–চলোএখানেই রাতের খাওয়া খাবো, শোবো, ঘুমোবো।
একটা বিরাট গাছের গোড়ায় এসে সাইল ওর পোটলা থেকে বাসনটাসন রাখল। ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে পড়ল। ঝোলাটোলা রাখল। সাইল বলল–এখন সবচেয়ে জরুরী কাজটা করতে হবে। একটা ঝর্ণাটর্ণা খুঁজে বের করতে হবে। জল না হলে কিছুই রান্না করা যাবে না। একটা ঝর্ণার খোঁজে বনে ঢুকতে হবে।
–তাহলে তো তোমাকে যেতে হয়। রবার্ট বলল।
–আমি যেতে পারি। এসব আমার অভ্যেস আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–না। তুমি যাবে না। রবার্ট বলল।
–আমি যাচ্ছি। সাইল বলল। তারপর বাসনের ঝোলা থেকে একটা একটু বড় কাঠের পাত্র বের করল। সেটা হাতে নিয়ে সাইল জঙ্গলে ঢুকল।
ফ্রান্সিস গাছের নিচে বসল। রবার্টও ওর পাশে বসল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল– রবার্ট কিছুতেই ফ্রান্সিসকে চোখের আড়ালে যেতে দিচ্ছে না। দুজনে বসে রইল অন্ধকারে। ফ্রান্সিস পালাবার ছক কষতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইল কাঠের বড় বাটিটা ভর্তি জল নিয়ে এল। বগলে শুকনো ডালটাল নিয়ে এল। বলল–এই জলটা আমরা খাই। আমাদের নিশ্চয়স তেষ্টা পেয়েছে। বাটিটা ধরে ধরে তিনজনে জলটা খেয়ে নিল। সাইল শুকনো ডালটাল রাখল। রবার্টকে বলল আমি আবার জল আনতে যাচ্ছি। রবার্টকে বলল–তিনটে পাথর এনে উনুন বানাও।
সাইল ঘটি নিয়ে চলে গেল। রবার্ট অন্ধকারের মধ্যে গাছতলাটার একটু দূরে থেকে তিনটে বড় পাথর আনল। উনুন বানাল।
সাইল জল নিয়ে এল। পাত্র বের করে আটা মাখতে লাগল। বলল-রবার্ট উনুন চকমকি দিয়ে জ্বালাও। রবার্ট অন্ধকারে হাতের আন্দাজে ঝোলা থেকে চকমকি পাথর বের করল। শুকনো ডালটাল আর শুকনো পাতা নিয়ে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালল।
অল্পক্ষণের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল। সাইল উনুনে একটা লোহার চ্যাপ্টামত পাত্র বসাল। মোমবাতি বের করল। উনুনের আগুন থেকে মোমবাতি জ্বালল। জোর বাতাস নেই। মোমবাতি একেবারে নিভে গেল না। তবে মোমবাতির শিখা নড়তে লাগল মাঝে মাঝে। সাইল রুটি বানাতে লাগল। মোমবাতির আলোয় দেখতে দেখতে পনেরোখানা রুটি বানাল। বলল–যাও বড় পাতা নিয়ে এসো। রবার্টঅন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে কয়েকটি পাতা পেল। নিয়ে এল। সাইল মধুর পাত্রটা বের করল। বলল–বসে পড়। ফ্রান্সিস আর রবার্ট পাতা সামনে নিয়ে বসল। সাইল ওদের পাতায় রুটি দিল। তারপর মধুর পাত্র থেকে মধু ঢেলে দিল। মোমবাতির মৃদু আলোয় দেখে দেখে রুটি খেতে লাগল। ঐ মধুমাখা রুটি ফ্রান্সিসের কাছে যে কী সুস্বাদু লাগল! এবার সাইলও খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ। সাইল যে জলটুকু বাঁচাতে পেরেছিল সেই জল ওরা ভাগ করে– খেল। খিদে মিটল।
এবার শুয়ে পড়া। তিনজনেই গাছের নিচেই শুকনো পাতা জড়ো করে তার ওপর শুয়ে পড়ল। পরিশ্রান্ত ওরা একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল হল। ফ্রান্সিসদের ঘুম ভাঙল। সাইল বলল–আর দেরি করবো না। সকালের খাওয়া খেয়েই বেরিয়ে পড়বো। আজকেই তুলামে পৌঁছবো।
গতরাতের বাসি রুটি মধু খেল। তারপর আটার ঝোলা, বাসনটাসনের ঝোলা নিয়ে চলল ওরা।
দুপুরে এক চাষীর বাড়িতে খেল। তারপর শেষ বিকেলে ওরা তুলামে পৌঁছল। ওরা খুঁজে খুঁজে একটা সরাইখানায় এল। দরদাম করে সরাইখানার পাতা বিছানায় ওরা বসল।
ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। সাইলও আধশোয়া হল। রবার্ট বসে রইল। ফ্রান্সিস বলল–এখন তো রাজা তুতজের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। কাল সকালে রাজসভায় গিয়ে কথা বলতে হবে। কাজেই আজ রাতে খাওয়া ও বিশ্রাম।
রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল ওরা।
পরদিন তৈরি হয়ে ওরা রাজবাড়ির দিকে চলল। তখনই ফ্রান্সিস দেখল বেশ কয়েকটা ঘোড়ার গাড়ি পশ্চিমমুখে চলেছে। আরোহীরা আনন্দে হৈ হৈ করছে। এরা কি তবে পূর্ণিমা উৎসবে যাচ্ছে?
একটা গাড়িতে লোক তোলা হচ্ছিল। ফ্রান্সিস কাছে একজন যুবককে জিজ্ঞেস করল–আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?
–পূর্ণিমা উৎসবে।
–পূর্ণিমা উৎসব কবে?
–পরশু। যুবকটি গাড়িতে উঠে পড়ল।
ফ্রান্সিস বেশ উত্তেজনা বোধ করল। আমাকে আজকেই পালাতে হবে।
পরদিন সকালে ওরা রাজা তুতজের রাজসভায় গেল। রাজা তুতজ সিংহাসনে বসে আছেন। বিচার চলছে। ফ্রান্সিস সবকিছুই তাড়াতাড়ি সারতে চাইছিল। মাত্র একটা দিন হাতে।
একটু পরেই একজন বন্দীকে নিয়ে সেনাপতি রাজসভায় এল। ফ্রান্সিস সাইলকে বলল–তুমি সেনাপতিকে বল যে আমি রাজাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। সাইল আস্তে আস্তে সেনাপতির কাছে গেল। বলল–আমরা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ রাজাকে দিতে চাই। কী সংবাদ? সেনাপতি বলল।
–আমরা রাজাকে রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধনের একটা নকশা দিতে চাই।
বলো কি? ঠিক তো? সেনাপতি বলল।
–হ্যাঁ।
–দেখছি। সেনাপতি হেঁটে হেঁটে রাজার পাশের আসনে বসা মন্ত্রীর কাছে গেল। এসব বলল। একটু পরেই সেনাপতি ফ্রান্সিসদের এগিয়ে আসতে বলল।
ফ্রান্সিসরা এগিয়ে গেল। রাজা ফ্রান্সিসকে দেখে বললেন–তুমি তো ভাইকিং। দুজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলে। তারপর পালিয়ে ছিলে।
–হ্যাঁ মান্যবর। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাদের কাছে রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধনের নকশা আছে? রাজা বলল।
