–কীসের বিজ্ঞপ্তি? সাইল বলল।
–পূর্ণিমা উৎসব কবে হবে তারা জানিয়েছেন কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ দেখবো। সাইল চলে গেল।
রবার্ট পাহারায় রইল। রবার্ট দুপুরের খাওয়াদাওয়া করার পর সেই যে পাতলা কম্বলের ওপর শুয়েছে আর ওঠার নাম নেই।
সন্ধ্যা নামল। অন্ধকার গুহায় ফ্রান্সিস বসে রইল। রবার্ট শুয়ে রইল।
একসময় ফ্রান্সিস বলল-রবার্ট।একটুগাত্রোত্থান কর–মানে ওঠ। মোমবাতিটা জ্বালাও।
–আমি অন্ধকারেও দেখতে পাই। রবার্ট বলল।
–আমি তো তোমার মতো বেড়াল নই। অন্ধকার আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না। ফ্রান্সিস বলল।
–সাইল এসে মোমবাতি জ্বাললো। ততক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকো। রবার্ট বলল।
–বেশ। অন্ধকার থাকলে ভালো–আমার পালানোর সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেঘোরে ছোরা খেয়ে মরবে। রবার্ট বলল।
–হুঁ। তুমি জবরদস্ত পাহারাদার। ফ্রান্সিস বলল।
রবার্ট কোন কথা বলল না। জোরে একবার শ্বাস ফেলে পাশ ফিরল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরকারি জিনিস নিয়ে সাইল ফিরল।
ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল রাজার বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছে?
–না। রাজপুত্র সুস্থ হয়েছে সেই বিজ্ঞপ্তিটাই সাঁটা আছে। সাইল বলল।
–শুভ সংবাদ। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–ওকথা বলছ কেন? সাইল জানতে চাইল।
–আছে আছে। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করে বলল।
একটু রাত হতে সাইল রাঁধতে বসল। রাঁধতে রাঁধতে বলল–তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে। কাল সকাল সকাল খেয়ে বেরুবো আমরা।
–তাহলে তুলমের মন্দির দেখতে যাচ্ছো? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। সাইল বলল।
তখন রাত গভীর। ফ্রান্সিস তখনও ঘুমোয়নি। আবার পালানোর জন্যে তৈরি হল। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে গুহামুখের দিকে চলল। অন্ধকারে সাইলকে ছাড়াল। রবার্টকে ছাড়িয়ে যেতেই রবার্টের মোটা গলা শুনল–ফ্রান্সিস মিছিমিছি মৃত্যুকে ডেকে এনো না। রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন খুঁজে বের করতে আমাদের সাহায্য কর। গুপ্তধন পেলেই তোমার মুক্তি।
ফ্রান্সিস নিজের জায়গায় ফিরে এল। বলল–রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন কোথায় আমি জানি না।
নকশায় নির্দেশ আছে। একমাত্র তুমিই সেই নির্দেশ বুঝে গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারবে। কাজেই আমাদের হাত থেকে তোমার মুক্তি নেই। পালাবার চেষ্টা করো না। ছোরা তোমার হৃৎপিণ্ড ভেদ করবে। তুমি মারা যাবে। রবার্ট থেমে থেমে বলল।
ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন ভোরে সাইল রবার্টের কথাবার্তায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। ঝর্ণার জলে, হাত মুখ ধুতে যাচ্ছে রবার্ট পেছন পেছন এল।
গুহায় ফিরে দেখল সাইল খেতে দিয়েছে। রুটি আর কলা, আধখানা আপেল।
সাইল বলল–ফ্রান্সিস খাবার খেয়ে নিয়ে তৈরি হও। অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা তৈরি হল। ফ্রান্সিসকে একটা ঝোলা দেওয়া হল। রবার্ট আর সাইল ঝোলায় রান্নার বাসনটাসন নিল। গুহা থেকে বেরিয়ে এল। চলল পূবমুখো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর ছাড়িয়ে উন্মুক্ত প্রান্তরে এল। রোদ বেশ চড়া। রোদের তেজ সহ্য করে ওরা চলল।
শেষ দুপুরে একটা ছোট বসতিতে এল। এখন খাওয়া। সাইল বলল- চল দেখি কারো বাড়িতে খেতে পারি কিনা।
একটা দোকানের সামনে এল। সাইল দোকানদারের কাছে গেল। বলল–আমরা বেশ দূর থেকে আসছি। আমাদের কিছু খেতে দিতে পারেন? দোকানদার বলল দেখি–স্ত্রীকে রাজি করাতে হবে। একটা পাটাতন দেখিয়ে বলল আপনারা বসুন। ফ্রান্সিসরা বসল। এতদূর হেঁটে শরীর বিশ্রাম চাইছিল। কিন্তু সাইল বলল–এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়লে চলবে না। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে।
দোকানদার এল। হেসে বলল–আমাদের তো রান্না খাওয়া হয়ে গেছে। আপনারা বিশ্রাম করুন। কিছুক্ষণের মধ্যে রান্না হয়ে যাবে। আপনারা কি ততক্ষণ এখানেই বিশ্রাম করবেন না ভেতরবাড়িতে বিছানায় বিশ্রাম করবেন? সাইল ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–আমরা ভেতরবাড়িতে যাব। শোবো। শুধু বসে থেকে বিশ্রাম হয় না।
ঠিক আছে। আসুন। দোকানদারের পেছনে পেছনে ওরা ভেতরবাড়িতে ঢুকল। একটা ঘরের দরজা খুলে দোকানদার ফ্রান্সিসদের অপেক্ষা করতে বলল।
ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকে দেখল মেঝেয় বিছানা পাতা। শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। ফ্রান্সিসরা আস্তে আস্তে বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। সাইলও শুয়ে পড়ল। কিন্তু রবার্ট শুয়ে পড়ল না। বসে রইল।
কেউ কোন কথা বলছিল না। এত খিদে পেয়েছে যে কেউ কথা বলতে পারছে না।
ঘণ্টাখানেক পরে একটি অল্পবয়স্ক মেয়ে এল। হাতে গোল গোল বড় পাতা। ওদের সামনে মেঝেয় পাতাগুলো দিল। একটু পরে দোকানদারের স্ত্রী ঢুকল। হাতে কাঠের বড় বেকারি। তাতে রুটি রাখা। দোকানদারের স্ত্রী রুটি পাতায় দিতে লাগল। ফ্রান্সিস শুধু রুটিই খেতে লাগল। দেখাদেখি সাইল আর রবার্টও শুধু রুটি খেতে লাগল। দোকানদারের স্ত্রী এবার কাঠের গামলায় শাকসজির ঝোল নিয়ে এল। পাতায় দিল। ফ্রান্সিসরা খেতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে স্ত্রীলোকটি মাংস নিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের ঝোলসহ মাংস দিল। তিনজন গোগ্রাসে খেতে লাগল। আর এক দফা রুটি দেওয়া হল। ফ্রান্সিস আরো দুখানা রুটি চাইল। স্ত্রীলোকটি হেসে মাথা এপাশ ওপাশ করে বলল- আর রুটি নেই। যদি বলেন তাহলে রুটি করে দিতে পারি।
–ঠিক আছে। আমরা আর থাকবো না। চলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল। তিনজনেই উঠে দাঁড়াল। মেয়েটি হাতমুখ ধোবার জল দিল। জল খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রান্সিসরা বাড়ির বাইরে এল। দোকানদারের কাছে গিয়ে ফ্রান্সিস বলল– আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমরা ভাল খেয়েছি। রবার্ট বলল—-আর বসা নয়। চলো সব।
