“এটার অর্থ হল দেওয়াল ধরে ধরে ওপরে উঠতে হবে।”
ফ্রান্সিস বলে উঠল, “হ্যারি, এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। দেওয়ালের পাথর ভেঙে ভেঙে সিঁড়ির মতো করে আস্তে আস্তে উঠে যেতে হবে। শেষে বাঁদিকে গিয়ে ওই কুঠুরি দুটোয় ঢুকতে হবে। আমি নিশ্চিত ওই কুঠুরি দুটোতেই রয়েছে রাজা হুনাকমিনের গুপ্ত ধনভাণ্ডার। ওই বয়স্ক লোকটি এইভাবে বানানো সিঁড়ির কথাই বলেছিল।”
“এবার কী করবে?” শাঙ্কো বলল।
“চলো ডানদিকের দেওয়ালটা ভাল করে দেখা যাক।” ফ্রান্সিস বলল।
দু’জনে ডান দিকের দেওয়ালের কাছে এল। দেখল দেওয়ালের বেশ কিছু উঁচু পর্যন্ত জংলা গাছপালায় ঢাকা। ফ্রান্সিস গাছটাছ সরাল। দেখল–দেওয়ালের গোড়া থেকে বেশ কিছু উঁচু পর্যন্ত এক হাত অন্তর অন্তর ভাঙা খোদল। ওই খোদলগুলোয় পা রেখে রেখে অনায়াসে ওপরে ওঠা যায়। সিঁড়ির মতো। ওই বয়স্ক লোকটি এই সিঁড়ির কথাই বলেছিল।
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল, “শাঙ্কো, সরাইখানার মালিকের কাছ থেকে হাতপাঁচেক শক্ত দড়ি নিয়ে এসো তো।” শাঙ্কো মালিকের কাছে গেল। বেশ লম্বা দড়ি নিয়ে এল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর ছোরাটা দিয়ে দড়িটা দু’টুকরো করল। রেখে দিল।
“কখন যাবে?” হ্যারি বলল।
“সন্ধের পরে। সারারাত সময় পাব। তবু কাজটা দ্রুত করতে হবে।” ফ্রান্সিস বলল।
“ফ্রান্সিস, আগে যেমন গুপ্তধন উদ্ধারের আগে সেই রাজ্যের রাজার সম্মতি নিতে, এবার কিন্তু তা করছ না।” শাঙ্কো বলল।
“উপায় নেই শাঙ্কো। এভাবে বলতে গেলে রাজা আমাদের কয়েদঘরে ঢোকাতে পারে। কাজেই এবার সেসব না করে লুকিয়ে গোপনে গুপ্তধন উদ্ধার করব।”
.
ফ্রান্সিসরা সকলে সরাইখানায় ফিরে আসছে তখনই দেখল ঘোড়ার গাড়িতে লোকজন শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পায়ে হেঁটেও চলে যাচ্ছে অনেকে। ফ্রান্সিসরা অবাক। একজন লোককে হ্যারি ধরল। বলল–ভাই আপনারা চলে যাচ্ছেন কেন? লোকটি বলল–রাজকুমারের অসুখ। রাজকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ হলে তবেই পূর্ণিমা উৎসব হবে।
ফ্রান্সিস হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বলল, পূর্ণিমা উৎসব এখন বিশ বাঁও জলে। কবে রাজকুমার সম্পূর্ণ সুস্থ হবে কে জানে? ততদিন উৎসব বন্ধ।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় এল। সরাইখানার মালিক বলল–দেখুন কী কাণ্ড। রাজকুমারের অসুখ করেছে সব উৎসব বন্ধ। হ্যারি বলল–এই পূর্ণিমা উৎসব কতদিন হয়ে আসছে?
–অনেকদিন থেকে। দু’তিনদিন ধরে উৎসবের জায়গা সাজানো হয়। বেশ বড় মঞ্চও হয়। রাজকুমার রাজকুমারীকে নিয়ে রাজরাণী আসেন। সারারাত ধরে গানবাজনা নাচ চলে। দর্শক শ্রোতারা যেন পাগল হয়ে যায়। কী আনন্দ। কী উল্লাস। এখন সব গেল। কবে রাজকুমার সুস্থ হবে। কবে পূর্ণিমা উৎসব হবে সেসব ঝুলে গেল।
সরাইখানাগুলো ফাঁকা হয়ে গেল। কত লোক চলে গেল। এইসময় সরাইখানাগুলো। কত অর্থ লাভ করে। এখন কী হবে কে জানে।
ফ্রান্সিসরা ঘরে এসে টানা বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস পড়তে পড়তে মৃদুস্বরে বলল–“হ্যারি আজকের উৎসবের দিনটাতেই ভেবেছিলাম কাজে নামবো–সব পিছিয়ে গেল।
–দিনটা ভালোই বেছেছিলে। কিন্তু তুমি কি নকশাটার অর্থ বের করতে পেরেছো। হ্যারি বলল।
–প্রায়। এখন নকশার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা। তখনই বুঝবো আমি নকশার অর্থটা ঠিক বুঝেছি কি বুঝিনি। কাজটা শুরু করলেই বুঝবো আমি নকশার নির্দেশ বুঝলাম কি বুঝলাম না।
–তাহলে এখন তুমি কী করবে?
–এই সরাইখানাতেই থাকবো। যতদিন না রাজপুত্র সুস্থ হয় ততদিন।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কথা শুনছিল। এবার বলল–আচ্ছা ফ্রান্সিস তুমি পূর্ণিমা উৎসবের রাতটাই বেছে নিতে চাইছো কেন?
ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল–নকশার নির্দেশ অনুযায়ী দেয়ালের পাথর ভাঙতে হবে। কিন্তু সব পাথর একই সময় ভাঙা হবে না। আস্তে আস্তে ভাঙতে হবে। নকশাটা তো এখন বের করা চলবে না। অন্য সময় তোমাকে নকশা থেকে বুঝিয়ে দিতাম মন্দিরের ওপর দিকের ঘর দুটোও দেখতে হবে। ঘর দুটো প্রায় ঝুলে আছে। কাজ শুরু করলেই মনে হয় ভেঙে পড়বে। কাজেই পাথরভাঙা ঘর ভেঙে পড়া এত শব্দ ধারেকাছের লোকজনের কানে যাবেই। উৎসবের দিন বাড়িতে বড় কেউ থাকবে না। সবাই তখন নাচগানের উৎসবে। কাজেই তখন কারও কিছু কিছু ভাঙাটাঙার কাজ চালানো যাবে। তাই পূর্ণিমা উৎসবের রাতটাকেই বেছেছি। সবদিক থেকে সুবিধাজনক। এখন সমস্ত কাজই পিছিয়ে গেল।
–সাবাস ফ্রান্সিস। সমস্ত ব্যাপারটাই সহজে বুঝিয়ে দিলে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–শাঙ্কো আমার কথাটাতো জানো-শুধু কব্জির জোরে লড়াই হয় না বুদ্ধির জোরও লাগে।
ফ্রান্সিসরা ফিরে আসছে। রাস্তায় দেখল ঘোড়ায়টানা গাড়িতে বোঝাই হয়ে লোকজন নগর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দু’একজন কাঁদছেও। সত্যিই তো অনেক আশা করে এসেছিল–নাচগান দেখবে শুনবে সারারাত আনন্দ করবে ফুর্তি করবে। সব বন্ধ হয়ে গেল। এখন রাজপুত্রের সুস্থ হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে থাকা। দূর দূর জায়গা থেকে লোকজন এসেছিল। আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে নিজের ঘরবাড়িতে।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় দেওয়া ঘাসের বিছানায় আধশোয়া হয়ে কথা বলছিল। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এখন তো বেশ কয়েকদিন বেকার হয়ে বসে থাকতে হবে। কিছুই করবার নেই। তারপর বলল–আচ্ছা ফ্রান্সিস রাজপুত্রের চিকিৎসার জন্যে আমরা তো আমাদের চিকিৎসক ভেনকে নিয়ে আসতে পারি। ফ্রান্সিস বলল– সম্ভাবনা নয়। এখন তুলামে গিয়ে জাহাজঘাটায় নোঙর করা আমাদের জাহাজে যেতে হবে। ভেনকে এতটা পথ নিয়ে আসতে হবে। ততদিনে হয়তো রাজপুত্রের অসুখ বেড়ে গেল। অবশ্য দুটো ঘোড়া পেলে আমি দু’একদিনের মধ্যেই ভেনকে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু ভুলে যেও না হ্যারি–আমরা বিদেশী। রাজা আমাদের বিশ্বাস করবে না। ভেনকে চিকিৎসা করতে দেবে না। কাজেই আমরা আগ বাড়িয়ে কিছু করবো না। আমাদের কোন সমস্যার সৃষ্টি করবো না। হ্যারি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো–তুমি ঠিকই বলেছো। আসলে আমি চাইছিলাম রাজকুমারের সুচিকিৎসা হোক রাজকুমার দ্রুত সুস্থ হোক। ভেন সেটা পারবে?
