“এখানে!” আলফানসো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস বলল, “হ্যাঁ এখানে তুমি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের তোমার মাতৃভাষা স্পেনীয় ভাষা শেখাবে। তলতেক ভাষা তুমি ভালই শিখেছ। সেই ভাষার লিখিত রূপ : দেবে। সেই ভাষায় বই লিখবে কী? পারবে তো?”
আলফানসো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মাথা নিচু। তারপর মাথা তুলল। ফ্রান্সিস দেখল আলফানসোর চোখে জল। আলফানসো কান্নাভেজা গলায় বলল, “ছেলেবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন আমি শিক্ষকতা করব। ভাবিনি কোনওদিন সেই স্বপ্ন সার্থক হবে।”
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। বলল, “আলফানসো ঘুমোও। রাত হয়েছে।”
আলফানসো শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম আসছে না। ফ্রান্সিসের সাহায্য পেলে ও সবকিছু করতে পারবে। কিন্তু ফ্রান্সিস কী সাহায্য করবে তা বলেনি। একটু বেশি রাতে আলফানসো ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন একটু সকাল সকাল খাওয়াদাওয়া সারল ফ্রান্সিসরা। তারপর চলল চিচেন ইজ্জার মন্দিরে। মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। প্রহরী দু’জন বর্শা হাতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। লোকজন ঢুকছে বেরোচ্ছে অবাধে। প্রহরী দু’জন কাউকে বাধা দিচ্ছে না।
ফ্রান্সিসরাও ঢুকল। সামনেই সিঁড়ি বেয়ে উঠল ওরা। সিঁড়ি অনেকটা উঠে নীচে নেমে গেছে। ফ্রান্সিস সেখানে এসে আলফানসোকে বলল–“তুমি তো নীচের গর্ভগৃহ, নয় রাত্রির দেবতার মূর্তি, রাজা হুনাকমিনের কফিন সবই দেখেছ।”
–“হ্যাঁ, সে সব আমি আপনাদের বলেছি।” আলফানসো বলল।
–“কিন্তু সেসব জায়গায় কোথাও রাজা হুনাকমিনের গুপ্ত ধনসম্পদ গুপ্তভাবে রাখা আছে এমন কিছু লক্ষ্য করো নি?” ফ্রান্সিস বলল।
–“ন্নাঃ! দ্যাখো এত লোকজন প্রতিদিন ওইসব গর্ভগৃহে যাচ্ছে কারও না কারও নজরে নিশ্চয়ই কিছু পড়তো।” আলফানসো বলল।
–“হু।” ফ্রান্সিস সিঁড়িটা যেখানে বাঁক নিয়ে নীচে নেমে গেছে সেখানটায় দাঁড়াল। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। মন্দিরের মাথায় রয়েছে দুটো কুঠুরি। একটা বড় তার ওপর আর একটা ছোট। এখান থেকে এই দুটো কুঠুরির দূরত্ব হবে ন’দশ হাত। কাজেই এখান থেকে ওই কুঠুরি দুটোয় যাওয়া অসম্ভব। কাজেই সেই প্রৌঢ় লোকটি তাদের দুজনের সিঁড়ি থেকে ছিটকে পড়ার কথা বলেছিল সেই সিঁড়ি এই সিঁড়ি নয়। কিন্তু অন্য কোনও সিঁড়ি ফ্রান্সিসের চোখে পড়ল না। তারা কোন সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল? ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে লাগল। বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেও লাগল। তখনই দেখল মন্দিরের একপাশে চুনাপাথর বালি এসব দিয়ে গাঁথা একটা পাথরের দেওয়াল। দেওয়ালটা উঠে গেছে একবারে মন্দিরের মাথার কাছে। সেই দেওয়াল থেকে দুটো অংশ সোজা বেরিয়ে ওই দুটো কুঠুরির নীচে গিয়ে শেষ হয়েছে। ওপাশেও একটা দেওয়াল উঠেছে। তারও একটা অংশে গিয়ে মিশেছে কুঠুরি দুটোর নীচে। ফ্রান্সিস বুঝল ওই দুটো বর্ধিত অংশ দুটো কুঠুরি দুটোর ভারসাম্য রক্ষা করছে? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওই কুঠুরি দুটোয় যাওয়া। মিস্ত্রিরা কী করে অত উঁচুতে উঠে গিয়ে কুঠুরি দুটো তৈরি করেছিল? নিশ্চয়ই কুঠুরিতে যাওয়ার জন্য কোনও উপায় ছিল। ফ্রান্সিস ভাল করে দেখল। দু’পাশ থেকে দুটো পাথরের টানা দেওয়াল। তার ওপরই ওই দুটো কুঠুরি। তা হলে পাথরের দেওয়ালের মাথা থেকে ওই টানা পর্যন্ত উঠতে হবে। তারপর টানা ধরে যেতে হবে ওই কুঠুরিতে। রাজা হুনাকমিনের ধনসম্পদ কি ওখানেই গোপনে রাখা হয়েছে? কিন্তু ওখানে যাওয়ার কোনও উপায়ই তো নেই।
ফ্রান্সিস বলল, “হ্যারি, আমি একটু চারদিক ঘুরে দেখছি। তোমরা এখানেই থাকো।”
শাঙ্কো বলল, না ফ্রান্সিস তোমাকে একা ছাড়ব না। আমিও তোমার সঙ্গে যাব।”
–“বেশ চলো।” ফ্রান্সিস বলল।
খাওয়ার পরে ফ্রান্সিসরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল। তারপর ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল। মন্দিরটার চারদিক একবার ঘুরে এল। কিন্তু কোনও সিঁড়ি পেল না। অথচ সেই বয়স্ক লোকটি বলেছিল এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে সঙ্গী তাকে ধাক্কা মেরেছিল। ছিটকে পড়ে সাংঘাতিকভাবে আহত হয়ে পড়ে যুবকটিও মারা যায়।
ফ্রান্সিস মন্দির থেকে কিছুটা দূরে সরে এল। শাঙ্কোও এল। ফ্রান্সিস কোমরের ফেট্টি থেকে নকশাটা বের করল। মন্দিরের সঙ্গে মেলাতে লাগল। দেখল সবই মিলে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা কীভাবে ওঠবার চেষ্টা করেছিল তার কোনও নির্দেশ নকশাটায় নেই। ফ্রান্সিস নকশা দেখিয়ে শাঙ্কোকে সেই কথা বলল। তারপর নকশাটা শাঙ্কোকে দিয়ে বলল, “দ্যাখো তো, ওপরের কুঠুরিদুটোতে যাওয়ার কোনও নির্দেশ নকশাটায় আছে কি না।”
“হ্যারি থাকলে ভাল হত। ও পারত। আমি অতশত বুঝি না। হ্যারিকে ডেকে আনছি।” শাঙ্কো চলে গেল। ফ্রান্সিস নকশাটা দেখতে লাগল। এখানে লোকজনের ভিড় কম।
হ্যারি এল। নকশাটা হাতে নিল। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ হ্যারি বলে উঠল, “ফ্রান্সিস, দ্যাখো তো এটা কিসের দাগ?”
দাগ? দেখি তো।” ফ্রান্সিস নকশাটা হাতে নিল। হ্যারি ডান দিকের দেওয়ালের গা ঘেঁষে একটা খুব অস্পষ্ট রেখা দেওয়ালের গায়ে গায়ে ওপরের দিকে উঠে গিয়ে বাঁ দিকে বেঁকে কুঠুরি দুটোয় গিয়ে শেষ হয়েছে।”
হ্যারি বলল, “এই রেখাটার অর্থ বুঝতে পারলে?”
“না।” ফ্রান্সিস ভাবতে ভাবতে বলল।
