“বেশ চলো৷” ফ্রান্সিস বলল।
পাশের ঘরটা খাবার ঘর। ফ্রান্সিসরা এসে দেখল সরাইখানায় যারা আশ্রয় নিয়েছে তারা অনেকেই খেতে বসেছে। ফ্রান্সিসরা একপাশে বসল। সরাইখানার লোকে ফ্রান্সিসদের সামনে বেশ বড় গোল শুকনো পাতা রেখে গেল। এবার খাবার দেওয়া হতে লাগল। ফ্রান্সিসরা খিদের জ্বালায় গোগ্রাসে খেতে লাগল।
খাওয়াদাওয়া সেরে ফ্রান্সিসরা নিজেদের জায়গায় এল। হ্যারি, শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বসে রইল। আলফানসোকে বলল, “আলফানসো, ঘুমিয়ে পড়ো না তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
আলফানসো কিছু বুঝল না। উঠে বসে রইল।
একটু পরে ফ্রান্সিস ডাকল, “আলফানসো।”
–“বলুন।” আলফানসো বলল।
–“আমি তোমার সম্বন্ধে সব কথা জানতে চাই। আমাকে মিথ্যে বলবে না। যা সত্য তাই বলবে।” ফ্রান্সিস বলল।
–“বেশ, কিন্তু কী ব্যাপারে–মানে” বলতে গিয়ে আলফানসো থেমে গেল।
–“বলছি।” ফ্রান্সিস বলল। তারপর একটু থেমে বলল, “তোমার দেশের বাড়ির অবস্থা কেমন?”
–“অবস্থা বলতে কী বোঝাচ্ছেন?” আলফানসো বলল।
–“আর্থিক অবস্থা। তুমি সব ছেড়েছুঁড়ে জাহাজে চাকরী নিলে কেন?”ফ্রান্সিস বলল।
–“সে অনেক কথা ফ্রান্সিস।” আলফানসো বলল।
–“শুনুন তাহলে”, আলফানসো আস্তে আস্তে বলতে লাগল, “খুব দরিদ্রের ঘরে আমার জন্ম। ছেলেবেলায় মাকে হারিয়ে ছিলাম। আমার কোনও ভাইবোন ছিল না। আমি আর বাবা থাকতম লিসবন বন্দরের কাছে ঘুপচি ঘরে। বাবা সেই ভোরে উঠে দু’জনের রান্না করত। নিজের ভাগের খাবার খেয়ে চলে যেত আর আমি সারা সকাল সারা দুপুর রাস্তায়, ডকে খেলে বেড়াতাম।” আলফানসো থামল। তারপর বলতে লাগল, “বাবা কাজ করতেন বন্দর এলাকায়। মালপত্র ওঠানো নামানোর কাজ। বড় পরিশ্রমের কাজ। সন্ধ্যের মুখে কাজ থেকে ফিরে এলে বাবার ক্লান্ত মুখখানা দেখতাম। বাবা তখন মড়ার মত শতচ্ছিন্ন বিছানায় শুয়ে থাকত। রাতে আর রান্না হত না। দোকান থেকে একটা বড় রুটি আর ঝোল কিনে আনতাম। তাই খেয়ে রাত কাটত।” আলফানসো একটু চুপ করে থেকে বলল–“এমনিতে আমি দুঃখটুঃখ বড় একটা গায়ে মাখতাম না। কিন্তু সমবয়সী ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দেখলে আমার ভীষণ মনখারাপ হয়ে যেত। ধরে নিতাম পড়াশুনা আমার কপালে নেই।” আলফানসো চুপ করে রইল। তারপর বলতে লাগল, “একদিন বাবা কাজ থেকে ফিরে বললেন,
–“কালকে তোকে স্কুলে ভর্তি করে দেব। কী? পড়াশুনা করবি তো?”
আমি বললাম, “বাবা প্রতি মাসে স্কুলের মাইনে দিতে গেলে তো আমাদের একবেলা উপোস করে থাকতে হবে।”
–“না রে। জাহাজের এক মালিক আমার কাজকর্ম দেখে খুশি হয়ে বেশ কিছু অর্থ আমাকে দিয়েছে। অন্তত বছর কয়েক তোর পড়াশুনা চালাতে পারব। আমি একটু বিশ্রাম করে নিই। তারপর তোকে পণ্ডিত কস্টিল্লোর কাছে নিয়ে যাব। আলফানসো থামল। তারপর বলতে লাগল, “সন্ধ্যের একটু পরে বাবা আমাকে নিয়ে কস্টেল্লোর কাছে গেলেন। কস্টেল্লো বললেন, “তোমার ছেলেকে ভর্তি করে নেব। কিন্তু ও তো রাস্তায় রাস্তায় খেলে বেড়ায়, পড়াশোনা করবে কখন?” বাবা আমার দিকে তাকালে। বাবা কিছু বলার আগে আমি বললাম, “স্কুলে ভর্তি হলে আমি আর এভাবে ঘুরে বেড়াব না। সব ছাত্রের মতো আমিও পড়াশোনা করব।” একটু থেমে আলফানসো বলতে লাগল, স্কুলে ভর্তি হলাম। খুব মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। মাস কয়েক পর ক্লাসের পরীক্ষার ফল বেরোল। আমি সেই পরীক্ষায় প্রথম হলাম। বাবা তো আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলেন। পড়াশোনায় আমার উন্নতি দেখে পণ্ডিত কস্টেল্লো আমাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন। বছরচারেক পড়তে পেরেছিলাম, হঠাৎ একদিন বাবা মারা গেলেন। আর পড়াশোনা হল না। দু’বেলা খাবারই জোটে না–এই অবস্থা।”
একটু চুপ করে থেকে আলফানসো বলতে লাগল, “একদিন সকালে আমার জামাটামা বইটই সব পোঁটলা বেঁধে জাহাজঘাটায় এলাম। এ জাহাজে সে জাহাজে কাজ খুঁজতে খুঁজতে একটা জাহাজ পেলাম। সেখানে জাহাজ ধোয়ামোছা রান্নাঘরে কাজে সহায়তা করা এসব কাজের চাকরি পেলাম। সেই জাহাজ দেশ বিদেশের মালপত্র আমদানি রফতানির কাজ করে। কত দেশে ঘুরলাম। তারপরের কথা তো বলেছি।”
ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো, যেসব পড়ার বই নিয়ে বেরিয়েছিলে সে সব বই আর আছে?”
–“হ্যাঁ, বুক দিয়ে আগলে রেখেছি সেসব বই। জাহাজ যখন দেশে ফিরে আসতো তখন আরও বই কিনতাম। সব আছে।” আলফানসো বলল।
–“কিন্তু সেসব বই রেখে কী হবে?” ফ্রান্সিস বলল।
–“যদি কখনও সুযোগ পাই, বিচ্ছু বেশি অর্থ জমাতে পারি তো দেশে ফিরে একটা স্কুল খুলব বন্দর এলাকায়। স্থানীয় দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করব।”আলফানসো বলল।
–“পারবে স্কুল চালাতে?” হ্যারি বলল।
–“নিশ্চয়ই পারব। কিন্তু অর্থাভাব বেশি হলে হাল ছেড়ে দিতে হবে। আমার সেই ভয়। আমি তো ভিখিরি।” আলফানসো বলল।
–“তুমি সব পাবে, অর্থ সাহায্য ভবিষ্যতের জন্যে অর্থ ও নিরাপত্তা মানে কেউ তোমাকে বাধা দেবে না–তুমি নিশ্চিন্তে তোমার খুশিমতো তোমার কাজ করে যাবে।” ফ্রান্সিস বলল।
–“তাহলে তো আমি–মানে–আমি আমার সমস্ত জীবন শিক্ষাদানে ব্যয় করব।” আলফানসো বলল।
–“ঠিক আছে। তুমি প্রয়োজনে অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য পাবে। কিন্তু তোমাকে স্কুল করতে হবে তোমার দেশে নয়, এখানে।” ফ্রান্সিস বলল।
