“ভালই হল। কালকের রাতটা আমরা কাজে লাগাতে পারব।” ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল।
“তা হলে কাল রাতেই গুপ্তধনের জন্য চেষ্টা করবে?” হ্যারি বলল।
“হ্যাঁ।” ফ্রান্সিস বলল।
“ঠিক বুঝলাম না।” হ্যারি বলল।
“শোনো, সেই আহত লোকটি বলেছিল, সিঁড়ি থেকে ও আর তার সঙ্গী এক যুবক ছিটকে পড়ছিল। কালকে চিচেন ইতজায় যেতে হবে। সারাদিন ওখানেই থাকব। সব ভাল করে দেখতে হবে। একটা সূত্র নিশ্চয়ই পাব। সেটা ভেবে নিয়ে কাজে নামতে হবে।” ফ্রান্সিস বলল।
“গুপ্তধন আবিষ্কারের আগে রাজার সঙ্গে কথা বলে তার অনুমতি নেবে না?” হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল, “হ্যারি, এই প্রথম আমি অন্যরকম ভাবছি। গুপ্তধনের হদিস খুঁজতে তো কয়েকদিন যাবে। তার মধ্যে উদ্ধার করা গুপ্তধন রাজাকে না দিয়ে কাকে দেওয়া যায় সেটা ভেবে দেখব।”
“এ তো চুরি হয়ে গেল ফ্রান্সিস।” হ্যারি বলল।
“না। যার খুবই প্রয়োজন তাকে দেব। তা হলে তো চুরির দায় নিতে হবে না।”
“দেখো ভেবে কী করবে।” হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস বলল, “হ্যারি শাঙ্কো চলো চিচেন ইতজা মন্দিরটা দেখে আসি।”
“এই অন্ধকারে?” শাঙ্কো বলল।
“আরে বাবা প্রাথমিক ভাবে তো কিছু দেখা যাবে। কালকে সকালে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাব।” ফ্রান্সিস বলল।
“–বেশ চলো।” শাঙ্কো বলল।
আলফানসো মালিককে গিয়ে বলে এল, “আমরা একটু শহর দেখতে বেরোচ্ছি। ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। খাবার রাখবেন।”
চারজনে সরাইখানা থেকে বেরোল। বাইরে এসে দেখল, ভিড় অনেকটা কমেছে। চারজন চলল চিচেন ইতজা মন্দিরের দিকে। যেতে যেতে আলফানসো বলল, “পূর্ণিমা রাতের উৎসবে যোগ দিতে দূরের নগর গ্রাম থেকে অনেক লোক এখানে আসে। সেইজন্যই এত ভিড়।”
চারজনে ইতজা মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল। পূর্ণিমার আগের রাত। কাজেই উজ্জ্বল জ্যোৎস্নায় চারদিক মোটামুটি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। উঁচু মন্দিরটায় জ্যোৎস্না পড়েছে। চূড়ো, সিঁড়ি, ঘরটা দেখা যাচ্ছে। ঢোকার মুখে দুটো পাশাপাশি ঘর। ঘর দুটোর সামনে দাঁড়িয়ে লোহার ফলা লাগানো বর্শা হাতে দু’জন প্রহরী। ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো, আমার সঙ্গে এসো।”আলফানসো এগিয়ে এল। আলফানসো মারফৎ ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল, “এটাই কি চিচেন ইতজার মন্দির?”
হা। দেখেই তো বোঝা উচিত। এতবড় মন্দির এখানে কোথাও নেই।” প্রহরী বলল।
“ও। তা আমরা একটু ঘুরে দেখতে পারি?” ফ্রান্সিস বলল।
“না। রাতে কারও ঢোকার হুকুম নেই।” প্রহরী বলল।
“একটু দেখেই চলে আসতাম।” ফ্রান্সিস বলল।
“না।” প্রহরীর মুখে দাড়িগোঁফ। গোঁফ মুচড়ে বলল, “কাল সকালে এসো।”
“বেশ তাই আসব। তবে একটা কথা বলি, লোকে বলে এই মন্দিরে নাকি রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন আছে।”
“লোকে তো কত কথাই বলে।” প্রহরী বলল।
“আগে কি সেই গুপ্তধন খোঁজা হয়নি।” ফ্রান্সিস বলল।
“হয়েছে। আগের দু’জন রাজার মন্ত্রী আর সেনাপতি রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন খুঁজেছিলেন।”
“পায়নি।” ফ্রান্সিস বলল।
“না, না।” প্রহরী মাথা এপাশ ওপাশ করে বলল।
“তারা কোথায় খুঁজেছিলেন?”
“এই মন্দিরেই খুঁজেছিলেন। এতসব জানতে চাইছেন কেন?” প্রহরী বলল।
“আমরা বিদেশী।” ফ্রান্সিস বলল।
“সে তো চেহারা আর পোশাকই বলছে।” প্রহরী বলল।
“দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই আমরা। এমনই সব গুপ্তধন-টুপ্তধনের কথা শুনলে খুঁজিটুজি।” ফ্রান্সিস বলল।
তা হলে তো রাজার অনুমতি নিতে হবে।” প্রহরী বলল।
“সেসব আমরা করব।” ফ্রান্সিস বলল।
“রাজার অনুমতি নিয়ে এসো। যদি অনুমতি পাও তখন জানতে পারবে আগে কারা কীভাবে গুপ্তধন খুঁজেছিলেন।” প্রহরী বলল।
“তা তো বটেই। আচ্ছা ভাই, তোমাদের অনেক ধন্যবাদ।” ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা সরাইখানায় ফিরে এল। ফ্রান্সিস শুকনো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। হ্যারি, শাঙ্কো আর আলফানসো বসল। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস, আমরা বিদেশী, গুপ্তধন খুঁজে বের করি–এসব ওই প্রহরীদের বলা ঠিক হয়নি।”
ফ্রান্সিস বলল, “হ্যারি, আমি প্রথম থেকেই ভেবে রেখেছি যে, রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন খুঁজে পেলে এখানকার রাজাকে জানাব না। সেই গুপ্তধন আমরা কিছু নেব। বাকিটা কী করব, এখনও ভেবে ঠিক করতে পারিনি। কাজেই প্রহরীরা আমাদের সম্বন্ধে কী ভাবল না ভাবল এ ব্যাপারে আমি বেপরোয়া। কারণ ওই প্রহরীদেরই বন্দি করে আমরা গুপ্তধন খুঁজব। কাজেই ভুল আমি করিনি। বরং একটা কাজের কথা আমরা জানলাম ইতিপূর্বে অতীতের এক রাজা ও এক মন্ত্রী গুপ্তধন খুঁজেছিলেন। তারাও ভেবেছিলেন গুপ্তধন এই মন্দিরেই আছে। কীভাবে তারা গুপ্তধন খুঁজেছিলেন এটা জানা গেল না। তবু কয়েকবার খোঁজা হয়েছে। তার মানে গুপ্তধন সহজে পাওয়া যাবে না। নানাভাবে চেষ্টা করতে হবে। প্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে এইটুকু লাভ হল আমাদের।”
“তা হলে এবার গুপ্তধন পেলে তা চুরি করবে?” হ্যারি বলল।
“হ্যাঁ। মণিমাণিক্য সোনাদানা যা পাব সব বিক্রি করব। আর একটু আগেই তো বললাম সেই অর্থ আমরা কীভাবে ভাগ করব।”
“অর্ধেক গুপ্তধন নিয়ে কী করবে তুমি?”
“আমাদের আর্থিক সমস্যা মেটাবো। তারপর দেশে ফিরে গিয়ে আমাদের রাজাকে দেব।”
“ঠিক আছে।” হ্যারি বলল। আড়মোড়া ভেঙে শাঙ্কো বলল, “ফ্রান্সিস, ভীষণ খিদে পেয়েছে। ঘুমও পেয়েছে। চল খাওয়াটা সেরে আসি।”
