আলফানসো বুড়িমাকে বলল, “ওরা সকাল-সকাল চিচেন ইতজায় যাবে।”
বুড়িমা সকালের মধ্যেই রুটি সবজির ঝোল বেঁধে দিলেন। এদিকে আলফানসোকে বুড়িমা কিছুতেই যেতে দেবে না। বুড়িমা কোন কথাই শুনবেন না। ফ্রান্সিস অনেক কথাটথা বলে চেষ্টা করল বুড়িমাকে শান্ত করতে। কিন্তু বুড়িমা নাছোড়বান্দা। সেই থেকে আলফানসোর হাত ধরে রইলেন। এইবার হ্যারি এগিয়ে এল। বলল, “বুড়িমা, আলফানসো আমাদের সঙ্গে না গেলে একটা খুব দরকারি কাজ হবে না। আপনি ওকে আটকালে ওর খুব ক্ষতি হবে।” বুড়িমা একটু শান্ত হলেন। আলফানসোর হাত ছেড়ে দিলেন। হ্যারি বলল, “আপনি কিছু ভাববেন না। দিন চারেকের মধ্যেই আলফানসোকে নিয়ে আপনার কাছে আসবো।” বুড়িমা আর কোন কথা বললেন না। আলফানসো তলতেক ভাষায় অনুবাদ করে বুড়িমাকে বুঝিয়ে বলল। বুড়িমা আর কিছু বললেন না। তবে বারবার চোখ মুছতে লাগলেন।
রওনা হতে একটু বেলাই হল। ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো একটা শস্যটানা গাড়ি পাওয়া যাবে?”
“খোঁজ করতে হবে।” আলফানসো কয়েকটা বাড়ির দিকে গেল। এক কৃষকের বাড়ির বাইরে একটা ঘোড়ায় টানা শস্যটানার গাড়ি পেল। কৃষকের সঙ্গে কথাটথা বলে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, “আমি তাকে অর্থ দিয়ে এসেছি। লোকটি একজন গাড়োয়ান দেবে বলেছে।” কিছু পরে একটা শস্যটানা গাড়ি চালিয়ে এক রোগাটে চেহারার গাড়োয়ান এল। ফ্রান্সিস বলল, “রোগাপটকা গাড়োয়ান কি চিচেন ইতজা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবে?”
“যাকগে, যা পাওয়া গেছে।” ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসরা গাড়িতে উঠল। গাড়ি ছেড়ে দিল। গাড়িটায় কিছু গমগাছের শুকনো পাতা ছড়ানো ছিল। ফ্রান্সিসরা তার ওপরই বসল।
গাড়ি চলল। একটা ঘোড়া আর কত জোরে গাড়ি টানবে? তাই টিকির-টিকির করে গাড়ি চলল।
দুপুর নাগাদ একটা বর্ধিষ্ণু গ্রামে এসে ওরা পৌঁছল। খিদেয় জলতেষ্টায় বেশ কাতর ফ্রান্সিসরা তখন। গাড়ি থেকে নেমে গ্রামের মধ্যে ঢুকল ওরা। এক বর্ধিষ্ণু কৃষকের বাড়ি পেল ওরা। ফ্রান্সিসদের কথা তো এখানে কেউ বুঝবে না। তাই আলফানসো এগিয়ে গেল কৃষকের দিকে। ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে কী যেন বলল। কৃষকটি হেসে ফ্রান্সিসদের হাতছানি দিয়ে ডাকল। বাড়ির বাইরের ঘরটায় কৃষকের পিছু পিছু ওরা ঢুকল। চুন-বালি মিশিয়ে কাঠের কাঠামোয় বাড়িটা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সিসরা ঘরে ঢুকল। কাঠের পাটাতন পেতে চৌকি মতো করা। তাতেই বসল ওরা। কৃষকের একজন কাজের লোক দরজায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো লোকটিকে খাবার জল আনতে বলো।”
একটু পরেই একটা বড় চিনেমাটির পাত্রে জল আনল লোকটি। ফ্রান্সিসরা চিনেমাটির বড় গ্লাসে জল খেল। এতক্ষণে তৃষ্ণা মিটল। কৃষক এসে আলফানসোর সঙ্গে কী সব কথাবার্তা বলতে লাগল।
কিছু পরে সেই কাজের লোকটি এসে কৃষককে কী বলল। কৃষক আলফানসোকে– কী বলল। আলফানসো ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনারা ভেতর বাড়িতে খাবেন, না এই ঘরে খাবেন?”
“এখানেই খাব। আর বলল যে, খাবারটা তাড়াতাড়ি দেওয়া হোক।” কৃষক আলফানসোর কাছে ফ্রান্সিসদের কথা বুঝে নিয়ে হেসে কী বলল। আলফানসো বলল, “তাড়াতাড়ি সব ব্যবস্থা হচ্ছে।”
কিছু পরে ফ্রান্সিসদের চিনেমাটির থালায় খেতে দেওয়া হল। কাটা রুটি, নানা আনাজ দিয়ে তৈরি তরকারি আর মাংস। খিদের জ্বালায় ফ্রান্সিসরা হাপুস হুপুস খেতে লাগল।
খাওয়াদাওয়া শেষ হল। এবার চিচেন ইতজা যাওয়া। সবাই ঘোড়ায়-টানা গাড়িটায় উঠল। গাড়োয়ান গাড়ি ছাড়ল। মাটির ওপর ছোট ছোট পাথর ফেলে রাস্তা তৈরি হয়েছে। ঝাঁকুনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত। একসময় হ্যারি বলল, “এর চাইতে হেঁটে গেলে ভাল হত।” প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে গাড়ি চলল।
সন্ধ্যা নাগাদ ওরা চিচেন ইতজা পৌঁছল। চিচেন ইতজা বেশ বড় নগর। রাস্তায় মানুষের ভিড়। দোকানপাটে কাঁচে ঢাকা আলো জ্বলছে। নগরটা বেশ সরগরম।
গাড়ি থেকে নেমে কেউ আর হাঁটতে পারছে না তখন। ঘাড়ে, কোমরে, পায়ে আড়ষ্ট ভাব। ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো তোমার জানা শোনা কোনও সরাইখানা আছে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, চলুন নিয়ে যাচ্ছি।” আলফানসো বলল।
বড় রাস্তাটা ধরে চলল ওরা। কিছু দূর যেতে ডানদিকে সরাইখানাটা পাওয়া গেল। সরাইখানায় বেশ ভিড়। মালিক সামনে একটা কাঠের বাক্স রেখে বসে আছেন। আলফানসো গিয়ে মালিকের সামনে দাঁড়াল। মালিক হেসে বলে উঠলেন।আলফানসোও হাসল।দু’জনে কিছুক্ষণ হেসে হেসে নানা কথা বলল। ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। এবার আলফানসো ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে কী বলল। মালিক কী বললেন। মাথা নাড়লেন। আলফানসো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, “মালিক বলছে কালকে রাতে এখানে নাকিনাচ-গানের আসর বসবে। দূর দূর জায়গা থেকে মানুষজন এসেছে। সব সরাইখানা ভর্তি। তবে এই মালিকের ভাইয়ের একটা ছোট সরাইখানা আছে। ওটা একটু দূরে। ওখানে জায়গা পাওয়া যাবে।”
“তা হলে ওখানেই চলো।” ফ্রান্সিস বলল।
ওরা আলফানসোর নির্দেশমতো চলল। রাস্তায় বেশ ভিড়। সেই ভিড় ছাড়িয়ে একটা ছোট গলিতে ঢুকল ওরা। কিছুটা যেতেই পেল সেই সরাইখানাটা। ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো, ওই মালিকের ভাইকে জিজ্ঞেস করো তো কিসের উৎসব কালকে?”
আলফানসো সরাইখানায় কাঠের আসনে বসা ভাইকে দেখল। আলফানসো মালিকের ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলল। ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল “ভাই বলছে চারজনের জায়গা হবে। কালকে পূর্ণিমা। বছরের এই দিনে এখানে নগরের একটু বাইরে কোপান নামের মাঠে এই উৎসব হয়। নাচ, গান, খানা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।”
