আপনার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। এখন কথা বলবেন না। আমি বললাম।
উপায় নেই, এখনই বলতে হবে। মৃত্যু আমার শিয়রে। একটু থেমে দম নিয়ে লোকটি বলতে লাগল, একদিন মা ওই বাক্সটা খুলে কী গয়নাটয়না বোধহয় খুঁজছিলেন। তখন আমি ওখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখনই আমার নজরে পড়ল নকশাটা। বেশ কৌতূহল হল। কী ওটা? আমি মাকে বলে নকশাটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম। আশ্চর্য! চিচেন ইতজার একপাশের ছবি। আমি মার কাছে নকশাটা চাইলাম।
“তুই এটা নিয়ে কী করবি? মা বললেন।”
“আমার কাছে রেখে দেব। আমি বললাম।”
“কেন? মা বললেন।”
“জিনিসটা কী পড়ে দেখব। আমি বললাম।”
“এর আগেও তোর বাবা ঠাকুর্দারা এই নকশাটা দেখেছিলেন। তারা কিছুই বুঝতে না পেরে রেখে দিয়েছিলেন। এখন তুই কি বুঝবি এসব?” মা বললেন।
“দেখি না চেষ্টা করে।” আমি বললাম।
“তা হলে নে তোর কাছে রাখ।” মা বললেন। লোকটি থামল। বেশ হাঁফাচ্ছে তখন। তারপর থেকে নকশাটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমি বুঝেছিলাম এই নকশাটা কোনও গুপ্তধনের নকশা। সেই গুপ্তধন রাখা আছে চিচেন ইতজায়। এটাও বুঝলাম এই গুপ্তধন রাজা হুনাকমিনের।
“তারপর?” ফ্রান্সিস বলল।
“আমি নকশাটা মিলিয়ে-মিলিয়ে চিচেন ইতজা মন্দিরের মধ্যে নানাভাবে খুঁজতে লাগলাম।” বয়স্ক লোকটি বলল।
“বুঝতে পারলেন কিছু?” আমি বললাম।
“হ্যাঁ এটুকু বুঝলাম। চিচেন ইতজার ডানদিনের অংশটা আঁকা হয়েছে এখানে। চিচেন ইতজার দুটো গর্ভগৃহই তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। কোথাও নকশার মিল পেলাম না।”
“লোকটি থামল। লোকটি মুখ হাঁ করে জল খেতে চাইল। আমি ঘরের কোণার দিকে রাখা মাটির জালা থেকে কাঠের গ্লাসে জল এনে দিলাম। লোকটি জল খেল।
“তারপর?” আমি বললাম।
“একটি যুবককে সঙ্গে নিয়ে কাজে নামলাম। কিন্তু যুবকটি আমার সঙ্গে প্রতারণা করল। আমাকে ফেলে দিল। তাই আমার এই দশা। আমি তবু জলের কাছে পড়লাম। সেই যুবকটি ছিটকে পড়ল একেবারে পাথুরে চত্বরে। সঙ্গে-সঙ্গে মারা গেল।” একটু থেমে বলল, “আমি প্রায় হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে এখানে এলাম।”
“নকশাটা কোথায়?” আমি জানতে চাইলাম।
“লোকটি কোনও কথা না বলে কোমরের ফেট্টির দিকে হাত বাড়াল। ফেট্টিটা খুলতে চাইল।
“কিন্তু দুর্বল আঙুলে পারল না খুলতে। আমিই ফেট্টি থেকে টেনে টেনে নকশাটা বের করলাম। লোকটি ক্লান্তস্বরে বলল, “তোমাকেই দিলাম। দ্যাখো চেষ্টা করে যদি রাজা হুনাকমিনের গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পারো।” একটু থেমে বয়স্ক লোকটি বলতে লাগল, “নকশাটা আমি আমার ফেট্টি জড়িয়ে রাখলাম। এতক্ষণে আমি দেখলাম সাইল আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ও সব দেখেছে, শুনেছে। গুপ্তধনের লোভে ও এখন আমাকে খুন পর্যন্ত করতে পারে। আমি সাবধান হলাম। সাইলকে কখনও দৃষ্টির বাইরে যেতে দিলাম না।
“বাইরে সূর্য উঠল। পাখপাখালির ডাক শোনা গেল। ভোর হয়েছে। লোকটি কাঁপা কাঁপা হাতে আমার হাত দু’হাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে-করতে মারা গেল। আমি কেঁদে ফেললাম।”
আলফানসো থামল। সকলেই চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো, তোমার নকশাটা একটু দেখতে পারি?”
“তা দেখাচ্ছি। তবে তোমরা তিনজন। জোর করে আমার নকশাটা নিয়ে নিতে। পারো।”
ফ্রান্সিস বলল, “আমাদের কি এতটা খারাপ লোক বলে মনে হয়?”
“না, না।” আলফানসো বলল, “আমার কোমরের ফেট্টিতে সেলাই করে রেখেছি। সাবধানে খুলতে হবে।”
শাঙ্কো ওর ছোরাটা বের করল। আলফানসো চমকে উঠল। ফ্রান্সিস হেসে বলল, “আমাদের এখনও বিশ্বাস করতে পারছ না?”
আলফানসো আর কিছু বলল না। শাঙ্কো আলফানুসোর কোমরের ফেট্টিটা একটু আলগা করল। দেখল নকশাটা কাপড়ের সঙ্গে সেলাই করা। ও ছোরার মুখ দিয়ে সেলাই করা সুতোটা আস্তে-আস্তে কাটতে লাগল। শাঙ্কো সন্তর্পণে নকশাটা বের করল। ভাঁজ খুলে আস্তে আস্তে মেঝেয় মেলে ধরল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি এগিয়ে এল। নকশাটা দেখল। নকশাটা এরকম
ফ্রান্সিস আর হ্যারি বেশ কিছুক্ষণ ধরে নকশাটা দেখল। তারপর ফ্রান্সিস বলল, “আচ্ছা আলফানসো, তুমি তো চিচেন ইতজার দুটো গর্ভগৃহ দেখেছ?”
“হ্যাঁ, একটাতে রয়েছে নয়টি দেবমূর্তি। অন্যটায় রাজা হুনাকমিনের কাঠের কফিনের মতো।”
“তা হলে আরও একবার আমরা দেখব। কোন সূত্র পাই কিনা দেখি।” ফ্রান্সিস বলল।
“বেশ।” আলফানসো বলল।
“সেই লোকটি তোমাকে বলেছিল যে আমরা উঠছিলাম। উঠছিলাম মানে কোথায় উঠছিল?” ফ্রান্সিস বলল।
“হয়তো সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিল।” আলফানসো বলল।
“সিঁড়ি দিয়ে উঠে মাথার দুটো ঘরে যাওয়া যায় না। নকশাটা দ্যাখো”
আলফানসো নকশাটা ভাল করে দেখল। ঠিক। সিঁড়িটা অনেকটা উঠে নেমে গেছে। গর্ভগৃহের দিকে। সিঁড়ির মাথা থেকে ঘর দুটো বেশ দূরে।
“তা হলে ওরা সিঁড়ি কোথায় পেল?” আলফানসো বলল।
ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।” হ্যারি বলল।
“যাকগে, আগে চিচেন ইতজা মন্দিরটা দেখি।” ফ্রান্সিস বলল।
“তা হলে ওই দুটো ছোট ঘরেই কি গুপ্তধন রাখা হয়েছে?” আলফানসো বলল।
“এখনই সেটা বলা যাচ্ছে না। গিয়ে আগে ভাল করে সব দেখি।” ফ্রান্সিস বলল।
“তা হলে কি কালকেই চিচেন ইতজা যাবে?” হ্যারি বলল।
“ আর দেরি করা চলবে না। বন্ধুরা আমাদের জন্য চিন্তায় পড়বে।” ফ্রান্সিস বলল।
