“দেখা যাক।” এই বলে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। একটু গিয়েই মাঠ পেলাম। ঝাঁকড়া মাথা বিরাট গাছ। পেছনের বাড়িটায় গিয়ে টোকা দিলাম। ভেতরে কোনও শব্দ নেই। আবার জোরে টোকা দিলাম। ভেতর থেকে কেউ বলল, “কে?”
“খুব বিপদে পড়ে এসেছি। বৈদ্যমশাইকে একটু আসতে বলুন।”
“একটু পরেই দরজা খুলে গেল। এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। মুখে দাড়ি গোঁফ। বললাম, “বড় রাস্তায় যে সরাইখানাটা আছে আপনাকে দয়া করে সেখানে একবার যেতে হবে।”
“কিন্তু এত রাতে–মানে–“
“দয়া করে চলুন। লোকটির বাঁ পা বোধহয় ভেঙে গেছে। শরীরের অনেক জায়গায় আঘাত।” আমি বললাম।
“হু। আসছি।” বৈদ্য বললেন।
ওষুধের থলেটা নিয়ে বৈদ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে এলেন। আমার সঙ্গে চললেন।
“আমরা সরাইখানায় ঢুকলাম। বৈদ্য ভীষণ আহত লোকটির কাছে বসলেন। পায়ের দিকের পোশাকটা কিছুটা তুললেন। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল, পাটা মুচড়ে গেছে। তখনও রক্ত পড়ছে, তবে অল্প। বৈদ্য লোকটির পরনের ঢোলা হাতা জামা তুলে দেখলেন। লোকটির গোঙানি তখনও থামেনি। বৈদ্য ওর চোখ বুক কোমর দেখলেন। আমাকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। মৃদু স্বরে বললেন, “বোধ হয়। কোনও উঁচু জায়গা থেকে পড়ে গেছে। একটা পা ভেঙে গেছে। অন্য পা-টা মচকে গেছে। দাঁড়াতে পারবে না। মাথার পেছনেও ভীষণ লেগেছে। কী চিকিৎসা করব বলুন। এ বাঁচবে না।” আমি বললাম, তবু আপনি যতটা করার করুন।
“বেশ।” বৈদ্য কাপড়ের পোঁটলা থেকে ওষুধ বের করলেন। দুটো ছোট বোয়ামও বের করলেন। বোয়াম থেকে কী একটা কালো রঙের জিনিস তুলে দু’হাতের তেলো দিয়ে চেপে চেপে দুটো বড়ি করলেন। আমার হাতে দিলেন। বললেন, “দুটোই খাইয়ে দিন।” লোকটির দুই চোয়াল চেপে ধরে বললাম, “ওষুধটা খেয়ে নিন। লোকটি খেল। বৈদ্য একটা কাপড়ের টুকরো চাইলেন। সরাইখানার মালিক এনে দিলেন। বৈদ্য আহত লোকটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত রক্ত মুছে দিলেন। তারপর বললেন, অল্প জল দিন। মালিক কাঠের গ্লাসে জল নিয়ে এলেন। বৈদ্য ঝোলা থেকে একমুঠো হলুদের গুঁড়ো বার করলেন। একটু একটু করে মিশিয়ে একটা লেই করলেন। ভাঙা কাটা জায়গাগুলোতে আস্তে আস্তে লাগিয়ে দিলেন। লোকটি এবার নড়েচড়ে উঠল। একটু পরেই তার গোঙানি বন্ধ হল। বৈদ্য আরও ওষুধ আমাকে দিলেন। পরে খাওয়াতে হবে। লাগাতে হবে।
“বৈদ্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি কোমরের ফেট্টি থেকে কিছু অর্থ বের করে বৈদ্যকে দিলাম। বৈদ্য চলে গেলেন। আমি লোকটার পাশে বসে রইলাম। বৈদ্য বলে গেছেন বাঁচার কোনও আশা নেই। তবু মরার সময় যাতে যন্ত্রণা না ভোগ করতে হয় তার জন্যই বৈদ্যকে ডেকে এনেছিলাম।
সাইল এতক্ষণে উঠে আমার কাছে এল। বলল, মিছিমিছি এত কিছু করছেন কেন? এ তো বাঁচবে না।
“তবু চেষ্টা করা। দেখি।”
“বাইরে পাখির ডাক শুনলাম। ভোর হয়েছে। আমি বসে বসেই একটু ঘুমিয়ে নিলাম। ঘুম ভেঙে দেখি লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। স্থির দৃষ্টিতে। একটু চমকে উঠলাম। বললাম, এখন কেমন আছেন?
“লোকটি ভাঙা গলায় বলল, একটু ভাল। তারপর ভাঙা ভাঙা বলতে লাগল, আপনি আমার জন্য এত করছেন। বাধা দিয়ে বললাম, “এটুকু মানুষ হিসেবে আমার করা উচিত। নইলে, একটা জানোয়ারের সঙ্গে আমার তফাৎ কোথায়? লোকটি আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করল।
“লোকটিকে সকালের খাবার খাওয়ালাম। ওষুধও খাওয়ালাম। দুপুরেও খাওয়ালাম।
“সন্ধের দিকে মনে হল লোকটি গায়ে একটু জোর পেয়েছে। পাশ ফিরে শুল।
“পরের দিন দুপুরে লোকটির জ্বর এল। সাইলকে বললাম, সাইল, তুমি এর পাশে বোসো। আমি বৈদ্যর কাছে যাচ্ছি।
বৈদ্যকে পেলাম না। কোনও রোগীর বাড়িতে গেছেন।
“সন্ধের দিকে জ্বর বাড়ল। আমি সাইলকে বসিয়ে রেখে বৈদ্যর কাছে গেলাম। জ্বর শুনে বৈদ্য বললেন, লক্ষণটা ভাল নয়। তবু আমার সাধ্যমতো করছি। একটা ওষুধ তৈরি করে দিলেন। তিনটি বড়ি।
ফিরে এসে লোকটিকে একটা বড়ি খাওয়ালাম।
সন্ধের পর জ্বর বোধ হয় একটু কমল।”
“আমি আবার কোমরে ফেট্টি থেকে চেপে চেপে একটু কাপড় ছিঁড়ে জলে ভিজিয়ে কপালে দিতে লাগলাম। লোকটির বোধ হয় ভাল লাগল। চুপ করে শুয়ে রইল।
“গভীর রাত তখন। সাইলকে বললাম, তুমি ভাই লোকটির কপালে আমার এই জলেভেজা ন্যাকড়াটা চেপে-চেপে লাগাও। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। দু’রাত টানা ঘুমোতে পারিনি।
“সাইল লোকটির কাছে বসল। কপালে জলপট্টি দিতে লাগল। আমি একপাশে শুয়ে কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
“যখন ঘুম ভাঙল তখন শেষ রাত। দেখলাম সাইলও লোকটির পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি সাইলকে আস্তে ধাক্কা দিয়ে ওর ঘুম ভাঙালাম। পরে ভেবে দেখেছি সাইলের ঘুম না ভাঙানোই উচিত ছিল। সাইল উঠে বসল।
“তখনই দেখি লোকটা কী যেন বলছে। আমি লোকটার মুখের কাছে কান পাতলাম। লোকটা বলছে, ভাই তুমি কে জানি না। কিন্তু আমাকে সুস্থ করে তুলতে যা কষ্ট স্বীকার করেছ তার জন্য আমি তোমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ রইলাম।”
ওসব নিয়ে ভাববেন না। আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন এটাই আমি চাই। লোকটি একটু দম নিল। তারপর আস্তে আস্তে বলতে লাগল, আমি তোমাকে রাজা হুনাকমিনের গোপন ধনভাণ্ডারের হদিস দেব।
ঠিক বুঝলাম না। আমি বললাম।
বলছি সব, তা হলেই বুঝতে পারবে। একটু দম নিয়ে লোকটি বলতে লাগল রাজা হুনাকমিনের আমলের কথা। আমার প্রপিতামহ রাজা হুনাকমিনের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। মৃত্যুর আগে রাজা আমার প্রপিতামহকে একটা নকশা দিয়ে যান। আমাদের পারিবারিক গয়নাগাঁটি যে বাক্সটায় থাকত প্রপিতামহ সেই বাক্সে নকশাটা রেখে দিয়েছিলেন। আমার পূর্বপুরুষের হাতে হয়তো নকশাটা পড়েছিল কিন্তু তারা এটার গুরুত্ব দেননি। ধরে নিয়েছিলেন এটা উদ্ভট কিছু। লোকটি থামল।
