ডুমুর গাছ তো অনেক জায়গাতেই থাকতে পারে।” শাঙ্কো বলল।
“তা পারে। কিন্তু এতদূর ঘুরে এলাম, একটাও ডুমুর গাছ দেখিনি।” হ্যারি বলল।
“ঠিক আছে। ওই রাস্তা ধরেই চলো। দেখা যাক, ডুমুর গাছপাই কিনা।”ফ্রান্সিস বলল।
ওরা বাঁ দিকের রাস্তাটাই ধরল। বেশ কিছুটা যেতেই বাঁ দিকে একটা বড় ডুমুর গাছ দেখা গেল। হ্যারি হেসে বলল, “দ্যাখো, ডুমুর গাছটার গায়েই বুড়িমার বাড়ি।”
শাঙ্কো গিয়ে দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে গেল। বুড়িমা দাঁড়িয়ে আছেন। বুড়িমা ফোকলা মুখে হেসে বললেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য বেঁধেছি। তোমরা বাইরে কোথাও খাবে না।”
তলতেক ভাষা। ফ্রান্সিস ঠিক বুঝল না। হ্যারি কিছুটা আন্দাজ করে মাথা নাড়ল। বুড়িমা এটাকে সম্মতি ধরে নিয়ে হাসতে লাগলেন।
ফ্রান্সিসরা এসে বিছানায় বসল। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল, “বিপদ আসছে। আলফানসো আমাদের সঙ্গে নেই। বুড়িমা ফ্রান্সিসদের সবাইকে দেখতে দেখতে বললেন, “আমার ছেলে কই?”
হ্যারি হাতের ইঙ্গিতে বোঝাল আলফানসো আসছে। বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না। চলে গেলেন।
রাত হল। খাওয়ার সময় হল। আলফানসো তখনও ফিরল না। আলফানসোর বুড়িমা ঘর-বার করতে লাগলেন।
হ্যারি হাতের, চোখের ইঙ্গিতে বোঝাতে লাগল আলফানসো আসবে। বুড়িমা ইঙ্গিতটা বুঝলেন। কিন্তু আর একটু রাত বাড়তেই বুড়িমার কান্না শুরু হল।
ফ্রান্সিস বলল, “এখন তো সরাইখানাও ভোলা পাব না। আজকে রাতের মতো খাওয়া জুটবে না, শুয়ে পড়ো।” বুড়িমার ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না চলতেই লাগল।
ফ্রান্সিসরা ঘুমোবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু বুড়ির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার একঘেয়ে শব্দ আর খালি পেট। ঘুম আর আসবে না।
ওদিকে সাইল আর গুণ্ডাটা আলফানসোকে একটা বাড়িতে নিয়ে এল। পাথর আর কাঠের ভাঙাচোরা বাড়ি। বাইরের ঘরটায় ওরা ঢুকল। শুকনো ঘাসে তৈরি বিছানা। ওরা বসল বিছানায়।
সাইল বলল, “আলফানসো, আমি সবই দেখেছি। সেই নকশাটা পেয়ে তুমি খুশিতে আত্মহারা। আমি ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। বুড়োর সব কথা শুনিনি। কিন্তু যেটুকু শুনেছি তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটা কোনও গুপ্তধনের নকশা।”
“ঠিক আছে। তুমি তো বললে বিশ্বাস করবে না। ছবি আঁকা কাগজটা দেখে কিছু বুঝলে কি না সেটা ভেবে দ্যাখো৷ ওটা চিচেন ইতজার ছবি ছাড়া কিছুই না।”
গুণ্ডাটা উঠে দাঁড়াল। বলল, “সাইল, চল, খেয়ে আসি। ভীষণ খিদে পেয়েছে।” তিনজনে ঘরে তালা দিয়ে খেতে বেরোল।
রাস্তায় যেতে যেতে আলফানসো একটা উপায় ভাবল। সেইমতো করলও। ও একপাশে ছিল। অন্যপাশে গুণ্ডাটা আর সাইল। আলফানসো হঠাৎ বসে পড়ল। গুণ্ডাটা আর সাইল নিচু হয়ে দেখতে গেল কী হয়েছে। আলফানসো সঙ্গে-সঙ্গে দু’জনকে জোরে ধাক্কা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দু’জনে দু’পাশে ছিটকে পড়ল। আলফানসো দ্রুতবেগে ডান দিকের অন্ধকার গলিটায় ঢুকে পড়ল। সাইল আর গুণ্ডাটার “ধর, ধর” চিৎকার শুনতে পেল। আলফানসো এবার অন্য একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। পেছনে আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। ও ছুটল বুড়িমার বাড়ির দিকে।
ফ্রান্সিসের বারেবারে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। হঠাৎ শুনল দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ। ফ্রান্সিস দ্রুত বিছানায় উঠে বসল। আস্তে-আস্তে দরজার কাছে গেল। মৃদুস্বরে বলল, “কে?”
“আমি, আমি আলফানসো।”
ফ্রান্সিস দরজা খুলে দিল। আলফানসো ঘরে ঢুকল। ও হাঁফাচ্ছে। দরজা খোলার শব্দে হারি আর শাঙ্কোর ঘুমও ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস আলফানসোকে বলল, “ভাই, তুমি আগে তোমার বুড়িমার কাছে যাও। তোমার বুড়িমা এখনও বোধহয় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।”
আলফানসো বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ফ্রান্সিস বলল, “যাক, বাঁচা গেল। বুড়িমা এবার কান্না বন্ধ করবেন।”
একটু পরেই বুড়িমা ফ্রান্সিসদের ঘরে এলেন। একগাল হেসে বললেন, “তোমরা এখন ঘুমিয়ে পড়বে না। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো তোমার কী হয়েছিল?”
“সব ঘটনা না বললে ঠিক বুঝবে না।” আলফানসো বলল।
“আমারও মনে একটা খটকা আছে। তুমি সব কথা আমাদের বলোনি।”
আলফানসো বলল, “এবার সব বলছি। বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি সে সময় চিচেন ইতজায় একটা সরাইখানায় ছিলাম। সেই সময় সাইল নামে একটা লোকও আমার ঠিক পাশেই ঘুমোত। আমাদের দুজনের মিলটা ভাল হল। সাইলেরও ত্রিসংসারে কেউ নেই। আমারও সেই অবস্থা।” আলফানসো থামল।
“তারপর?” হ্যারি বলল।
“একদিন গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ শুনলাম। সরাইখানার মালিক দরজা খুলে দিল। অন্ধকারে কিছুই দেখেছিলাম না। শুধু গোঙানির শব্দ। সরাইখানার মালিক মোটা মোমবাতিটা জ্বালল। দেখি একজন বয়স্ক লোক। বুক দিয়ে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে মেঝের ওপর দিয়ে আসছে। সারা গায়ে মাথায় ধুলো জমে আছে। পোশাকে রক্তের দাগ। অবাক হয়ে ভাবলাম এই বয়সে লোকটা মারপিট করতে গেছে নাকি।
“মোমের আলোয় দেখলাম, লোকটার বাঁ পা রক্তমাখা। লোকটার গোঙানি চলল। ভাবলাম এর এক্ষুণি চিকিৎসার প্রয়োজন। সরাইখানার মালিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। সাইলও ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। আমি সরাইখানার মালিককে বললাম, “আমি এই জায়গাটা ভাল চিনি না। ধারে কাছে কোথায় একজন বৈদ্যকে পাব?”
“রাস্তায় নেমে ডান দিকে দেখবেন একটা মাঠমতো। ওই মাঠের শেষেই একটা বিরাট গাছ। গাছটার ধারেই একটা বাড়ি। ওখানেই একজন বৈদ্য থাকেন। এই শেষ রাত। আসবে কি?” মালিক বলল।
