শুধু ফ্রান্সিস বলল, “তারপর?” আর সবাই চুপ করে রইল।
কিছুক্ষণ পরে আলফানসো বলতে লাগল, “পরে দেখি আগের মতোই চৌকোনো একটা ঘর। তবে খুব ছোট। মেঝেয় রাখা একটা কফিন মতো। কফিনের ঢাকনা আর খুললাম না। বুঝলাম ওই কফিনে রয়েছে মিশরের মমির মতো কোনও রাজার মমি। হতে পারে সেই রাজা হুনাকমিন। মশালটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে দেখলাম। এবড়োখেবড়ো পাথুরে দেওয়াল। চুনাপাথর মেশানো। এখানেই কি রাজা হুনাকমিন তার ধনসম্পদ সব গুপ্তভাবে রেখে গেছেন? বারকয়েক চারদিক দেখে নিয়ে সিঁড়ির কাছে এলাম। একটু অপেক্ষা করলাম। তারপর আস্তে-আস্তে ওপরে উঠতে লাগলাম। নয় দেবতার ঘরটাও খুব ভাল করে দেখলাম। সেই চুনাপাথর মেশান এবড়োখেবড়ো দেওয়াল। বুঝলাম এখানে রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন নেই। মানুষের হাতে তৈরি এই গুহায় সকলেই আসতে পারে। কাজেই দীর্ঘকাল ধরে মানুষ এখানে পুজো দিতে এসেছে। রাজা হুনাককেও শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে। এখানকার গোপনীয়তা কিছু নেই। এখানে রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন থাকলে বহু আগেই তা আবিষ্কার হয়ে যেত। তাই আমার কেমন বিশ্বাস হল রাজা হুনাকমিনের ধনসম্পদ অন্য কোথাও গোপনে রাখা হয়েছে। এই গর্ভগৃহে নয়। এখনও মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্য কোথাও যা দেখবার তা দেখলাম। তারপর আমি আস্তে-আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম।” আলফানসো থামল।
সকলেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস, কী ভাবছ?” ফ্রান্সিস হেসে বলল, “রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন উদ্ধার।”
“আপনি পারবেন?” আলফানসো একটু অবাক হয়ে বলল।
“সেটা ঠিক এক্ষুনি বলতে পারছি না। চিচেন ইতজায় যাই, সব দেখি, শুনি, জানি, তখনই বলতে পারব এটা সম্ভব কি না। অর্থাৎ রাজা হুনাকমিনের গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করা যাবে কি না।”
অসম্ভব। পারবেন না।” আলফানসো বলল।
“বললাম তো, সব আগে দেখিটেখি, তারপর বলা যাবে অসম্ভব না সম্ভব।” ফ্রান্সিস বলল।
“বেশ, চলুন, সব জানুন, দেখুন।” আলফানসো বলল।
তখন সন্ধে হয়ে গেছে। আলফানসোর বুড়িমা একটা কাঠের বড় রেকাবি নিয়ে ঘরে ঢুকল। রেকাবিতে রাখা বড় বড় মাংসের পিঠে। ফ্রান্সিসরা খুব খুশি। পিঠে তুলে নিয়ে খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ হলে ফ্রান্সিস বলল, “চলো, কোবা নগরটা কেমন দেখে আসি। আলফানসোই আমাদের দেখাবে সব।”
ওরা তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চলল নগর দেখতে। ছোট নগর। লোকজনের খুব ভিড় নেই।
আলফানসো বলল, “চলো, আগে মন্দিরটা দেখি।”
আলফানসোর নির্দেশমতো চলল ওরা। বড় সড়কের ধারেই দেখল মন্দিরটা। খুবই ছোট মন্দির। দুটো সিঁড়ি সোজা ওপর দিকে উঠে গেছে। মাথায় একটা ছোট ঘরমতো।
ফ্রান্সিসরা ঘুরে ঘুরে দেখল। তখন তো রাত। মশালের আলোয় যতটুকু দেখবার দেখল।
ওরা যখন ফিরে আসছে, তখন একটা ঘটনা ঘটল। আলফানসো একটু পিছিয়ে পড়েছিল। দুটো লোক ওর দু’পাশে এসে দাঁড়াল। আলফানসোও দাঁড়িয়ে পড়ল। অল্প আলোয় আলফানসো দেখেই চিনল, সাইল, সঙ্গের লোকটা একটা গুণ্ডা। অর্থ পেলে সব করতে রাজি। আলফানসো বলল, “কী চাও তোমরা?”
সাইল একটু হেসে বলল, “চিচেন ইতজার এক সরাইখানায় একটা বয়স্ক লোক এসেছিল। তোমাকে একটা নকশা দিয়েছিল।”
“নকশা-টকশা কিছুনা, চিচেন ইতজার মন্দিরের হাতে আঁকা ছবি।” আমি বললাম।
“ঠিক আছে। যদি ওটা নকশা না হয় তা হলে আমাকে দিয়ে দাও।” সাইল বলল।
“দিতে তো পারতাম। কিন্তু আমার কাছে তো ওটা নেই।” আলফানসো বলল।
“কোথায় আছে নকশাটা?” সাইল বলল।
“সেই সরাইখানার মালিকের কাছে রেখে এসেছি। কী আর হবে ওই ছবি দিয়ে।” আলফানসো বলল।
“তুমি মিথ্যে কথা বলছ। ওই সরাইখানায় আমরা গিয়েছিলাম।” সরাইখানার মালিক বলল, “আমি ওই ছবির ব্যাপারে কিছুই জানি না।”
“ও মিথ্যে বলেছে।” আলফানসো বলল।
“বেশ, কাল সকালে চিচেন ইতজা চলো। সেইসরাইখানায় আমরা কালকে যাব। তুমিই মিথ্যে বলছ না সরাইখানার মালিক মিথ্যে বলেছে সেটা বোঝা যাবে।” সাইল বলল।
“চলো, দেখা যাক।” আলফানসো বলল।
“এখন নয়, কাল সকালে যাব আমরা।” সাইল বলল।
“আচ্ছা, আমি এখন তা হলে আমার আস্তানায় যাই।” আলফানসো বলল।
“না, তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে।” গুণ্ডাটা বলল
“কোথায়?” আলফানসো বলল।
“গেলেই দেখতে পাবে। তুমি আজ রাতের মতো আমাদের বন্দি হিসেবে থাকবে। কালকে আমাদের সঙ্গে চিচেন ইতজায় যাবে।”
গুণ্ডাটা শেষে বলল, “আমাদের কথামতো না চললে শেষ করে দেব।”
“বেশ আমি যাব।” আলফানসো বলল।
সাইল আর গুণ্ডাটার সঙ্গে আলফানসো চলল।
ওদিকে বেশ কিছুটা গিয়ে শাঙ্কো বলে উঠল, “আলফানসো কোথায়?”
ফ্রান্সিস আর হ্যারি এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। আলফানসো নেই। ওরা রাস্তায় এদিকে ওদিকে ঘুরে এল। না। আলফানসো নেই।
ফ্রান্সিস বলল, “আলফানসো অনেকদিন এ-দেশে আছে। এই কোবা নগরও ওর খুবই পরিচিত। আমরা হারিয়ে গেলে বিপদ ছিল।”
“আমার মনে হয় আলফানসো বুড়িমার আস্তানায় চলে গেছে। চলো, আমরাও ওখানে যাই।” হ্যারি বলল।
চারদিকে তাকাতে-তাকাতে ফ্রান্সিস বলল, “বুড়িমার বাড়িটা যে কোথায় আমি কিছুতেই মনে করতে পারছি না।”
হ্যারি বলল, “আমার মনে আছে। সামনের মোড়টার বাঁদিকের রাস্তাটা ধরে যেতে হবে। দেখতে থাকো কোনও বড় একটা ডুমুর গাছ পাও কি না। ওই ডুমুর গাছের গায়েই বুড়িমার বাড়ি।”
