রাত হল। আমি একজন পাহারাদারকে ডাকলাম। ও এল। বললাম, “আজ একটু রাতে খাব আমরা।”
“কেন?” পাহারাদার বলল।
“আমাদের খিদে নেই।” কথাটা বলে আমি বন্দিদের দিকে তাকালাম, ওরাও বলে উঠল, “আমরাও পরে খাব।
“বেশ।” পাহারাদার চলে গেল।
রাত বাড়ল।
“এবার পাহারাদাররা খাবার নিয়ে এল। দরজা খোলা হল। দু’জন বড় কাঠের পাত্রে সবজি, ঝোল নিয়ে এল। অন্যজনের হাতে রুটি রাখা কাঠের বড় রেকাবি। দরজার কাছ থেকে একজন পাহারাদার এগিয়ে এল। বর্শাটা পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম। সবজি ঝোলের বড় কাঠের পাত্রটা তুলে নিয়ে দরজায় দাঁড়ানো একজন পাহারাদারের মাথায় ঢেলে দিলাম। পাহারাদার দুহাতে চোখ কচলাতে কচলাতে মেঝেয় বসে পড়ল। অন্য পাহারাদার কিছু বোঝার আগেই আমি খোলা দরজা দিয়ে দ্রুত ছুটে বাইরে চলে এলাম। অন্ধকারে দৌড় দিলাম প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে। পেছনে শুনলাম পাহারাদারদের চাচামেচি। আমি ততক্ষণে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অন্য বন্দিরাও ততক্ষণে পালিয়ে গেছে।
আলফানসো থামল। তারপর আবার বলতে লাগল, “বুড়িমার এই বাড়িতে কয়েকদিন আত্মগোপন করে রইলাম। তারপর একদিন ভোরে ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চললাম চিচেন ইতজার উদ্দেশ্যে। বড় সড়ক এড়িয়ে জংলা জায়গা দিয়ে চললাম। দিনটা সেদিন একটু মেঘলা ছিল। কাজেই হাঁটতে কষ্ট হয়নি।
“সন্ধের সময় চিচেন ইতজা পৌঁছলাম। শরীর ক্ষুধাতৃষ্ণা আর ক্লান্তিতে যেন ভেঙে পড়ছে। দুপুরে একটা গ্রামের বাড়িতে চারটে মাংসের বড়া খেয়েছিলাম। তাতে খিদে মেটেনি, বরং বেড়ে গেছে।
“খুঁজতে খুঁজতে একটা ছোট সরাইখানা পেলাম। এখন এখানেই আশ্রয় নিতে হবে। সরাইখানার মালিক আমাকে দেখে হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। বেশ কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে বলল, “কী খাবেন বলুন?”
“মাংস রুটি। এক্ষুনি চাই।” আমি বললাম।
“এক্ষুণি দেওয়া হবে। আপনি পেছনের ঘরে একটু বিশ্রাম নিন।” আমি পেছনের ঘরে ঢুকলাম। দেখি একটা মোটা মোমবাতি জ্বলছে। মেঝেয় কাঠের পাটাতনে বসলাম। বসে থাকতে পারলাম না। শুয়ে পড়লাম। সরাইখানার একটি অল্পবয়সী ছেলে একটা কাঠের পাত্রে জল নিয়ে এল। আমাকে দিল। আমি উঠে বসে সেই কাঠের পাত্রের সব জল খেয়ে ফেললাম। মুখ-গলার শুকনো ভাবটা কাটলো। তখন বুঝলাম আমার কী জলতেষ্টা না পেয়েছিল! পাত্রটা ফিরিয়ে দিলাম। ছেলেটি চলে গেল। আমি আবার শুয়ে পড়লাম।
“কিছুক্ষণ পরে ছেলেটি আমাকে গরম গরম রুটি আর মাংস দিয়ে গেল। আমি উঠে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। পর পর আরও একপাত্র মাংস রুটি নিয়ে জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লাম।
“ভোরবেলা ঘুম ভাঙল। পাখির ডাক শুনলাম। উঠে বসলাম। শরীরের আর ক্লান্তভাব নেই।” আলফানসো থামল।
“তারপর?”
“তারপর আমি ওই সরাইখানাতেই রইলাম। বেশ কিছুদিন। ঘুরে ঘুরে নগরটা দেখলাম। বেশ সাজানো-গোছানো শহর। অনেক ফুলের বাগান। রাস্তায় লোকজনের বেশ ভিড়। দোকানে দোকানে কাঁচ ঢাকা আলো। পথে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে করে চিচেন ইতজা মন্দিরের সামনে এলাম। মন্দিরের চারপাশে জলে ঘেরা। একেবারে সামনেই সিঁড়ি। সোজা উঠে গেছে মন্দিরের প্রায় মাথা পর্যন্ত। একটা সাঁকো মতো পার হয়ে মন্দিরের চত্বরে উঠতে হয়। সাঁকো পার হয়ে মন্দিরের চত্বরে এলাম। তারপর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলাম। মন্দিরের প্রায় মাথার কাছাকাছি এসে সিঁড়িটা নীচে নেমে গেছে। মন্দিরের মাথায় একটা বড় একটা ছোট ঘরমতো। চারদিকে তাকিয়ে দেখে বুঝলাম ওই দুটো ছোট ঘরে ওঠার মতো সিঁড়ি নেই। ওখানে কেউ উঠতে পারবে না। তা হলে কি ওখানে ওঠা যায় না? এবার ঢাল সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলাম, চুনাপাথরে তৈরি দেওয়ালে ফুল, পাখি কুঁদে কুঁদে তোলা। নীচে নেমেই যাচ্ছি যেন এই সিঁড়ির শেষ নেই। ততক্ষণে চারদিকে অন্ধকার জমা হয়ে গেছে। কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। সিঁড়িগুলোতে আন্দাজে পা ফেলতে হচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। মশালের আলো ছাড়া এখানে কিছুই দেখা যাবে না, আমি ফিরে দাঁড়ালাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলাম। কালকে আবার আসব। একটা মশাল ভাল করে তেলে ভিজিয়ে আনতে হবে।”
“তা হলে পরদিনও গিয়েছিলে?” ফ্রান্সিস বলল।
“হ্যাঁ, মশাল নিয়ে। আস্তে-আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাম। একটু পরেই সব অন্ধকার। মশাল জ্বালালাম। তিনদিকে পাথুরে দেওয়াল মতো। সিঁড়ি দেখতে দেখতে নামতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে দেখলাম সিঁড়ি শেষ। একটা চৌকোনো ঘর। এবড়োখেবড়ো পাথরের দেওয়াল। চৌকোনো ঘরটার চারদিকে দেখলাম চুনাপাথরের আর বালির নয়টি পুরুষ মূর্তি। বুঝলাম মায়া ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত রাত্রির নয় দেবতার মূর্তি। ঘরের মাঝখানে ফুল, লতাপাতার স্তূপ। বোধ হয় এ দেশবাসিরা দেবতাদের পুজো করেছে?” আলফানসো থামল।
“তুমি ওইটুকুই দেখেছিলে?” হ্যারি বলল।
“শুধু ওইটুকুই নয়। ওই ছোট ঘরটার নীচেই রয়েছে আবার সিঁড়ি। ফুল, পাতা সরাতেই দেখলাম সেই সিঁড়ি। মশাল হাতে নামতে লাগলাম। মশালের আলো খুব কাঁপছেনা। বুঝলাম এখানে বেশি বাতাস ঢুকছে না। ফুল, পাতা, সরিয়ে দিয়ে সিঁড়িতে পা রাখলাম। এবারের সিঁড়িগুলো তত বড় নয়। বেশ দেখেশুনে নামতে হচ্ছিল। নামতে লাগলাম। খুব সাবধানে নামতে হচ্ছিল বলে চলার গতি কমে গিয়েছিল।” আলফানসো থামল।
