“দিন আমার ভালই কাটছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ভাল রইল না। রাজা তুতজ আমাকে রাজসভায় ডেকে পাঠাল।
“গেলাম রাজসভায়। রাজা তুতজ খুব হেসেটেসে বলল, তোমরা বিদেশী। আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। আমি চুপ করে রইলাম আরও কী বলে শোনার জন্য। রাজা তুতজ বলল রাজা হুনাকমিনের নাম শুনেছ?”
“শুনেছি। এখানে এসে।” আমি বললাম।
“এখানকার মন্দিরের গর্ভগৃহে তার ধনসম্পত্তি গোপনে রাখা আছে এটা শুনেছ?” রাজা তুতজ বলল।
“শুনেছি, তবে পরিষ্কার বুঝিনি।” আমি বললাম।
“এখন সব বুঝবে ওই গর্ভগৃহে গুপ্তধন খুঁজতে গেলে।” রাজা তুতজ বলল।
“কিন্তু মাননীয় রাজা, একটা কথা বুঝতে পারছি না। যদি আপনারা জানেনই যে ওই গর্ভগৃহে গুপ্তধন আছে তবে তার খোঁজ করেননি কেন?”
“আমার লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে কিন্তু পায়নি।”
“তবে আমি কী করে পারব?” আমি বললাম।
“বললাম তো, তোমরা বিদেশী, খুব বুদ্ধি তোমাদের। রাজা তুতুতজ বলল।
“বেশ দেখি গর্ভগৃহে নেমে।” আমি বললাম।
“পরের দিন নামলাম গর্ভগৃহে।”
ফ্রান্সিস হেসে বলল, “তারপর গর্ভগৃহের মেঝেয় সঙ্গের পাহারাদার মশাল ছুঁড়ে ফেলল। আগুন জ্বলে উঠল।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমাদেরও নামতে বলেছিল?” আলফানসো বলল।
“হ্যাঁ, পাহারাদার সৈন্য দু’জনকে কাবু করে আমরা পালিয়ে এসেছি।”ফ্রান্সিস বলল।
“ঠিক, ঠিক। আমিও তাই করে এখানে পালিয়ে এসেছি।” আলফানসো বলল।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সত্যিই কি অতীতের বীর রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন ওখানে আছে?”
“না। তুলামের মন্দিরে নেই। আছে চিচেন ইতজার মন্দিরে।” আলফানসো বলল।
“সেটা তুমি কী করে বুঝলে?” ফ্রান্সিস বলল।
একটু চুপ করে থেকে আলফানসো বলল, “তোমাদের এসব বলে কী হবে। তোমরা কি পারবে হুনাকমিনের গুপ্তভাণ্ডার খুঁজে বের করতে?” ফ্রান্সিস হাসল। বলল, “তুমি আগে সমস্ত ব্যাপারটা বলল। সব দেখি, শুনি, তবেই বুঝতে পারব সেই গুপ্তধন উদ্ধার করা যাবে কি না।”
“সব বলছি। কিন্তু তার আগে আমাকে কথা দাও যে হুনাকমিনের গুপ্তধন উদ্ধার হলে আমাকে ভাগ দিতে হবে।” আলফানসো বলল।
“আগে উদ্ধার তো হোক।” হ্যারি বলল।
“না। আমি তার আগেই বাটোয়ারা চাই। আমি অর্ধেক নেব।” আলফানসো বলল।
“অর্ধেক কেন? সবটাই নিও।” ফ্রান্সিস বলল।
আলফানসো লাফিয়ে উঠলো, “আঁ! ঠিক তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। এবার তুমি এই ব্যাপারে যা যা জানো বলো।” ফ্রান্সিস বলল।
“তোমাদের তো বলেছি আমি জলদস্যুদের জাহাজে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারপর এই দেশে আসা। এই দেশে এসে আমি কী করলাম সেটা বলি। কীভাবে নকশাটা পেলাম সে কথাও বলি।” একটু থেমে আলফানসো বলতে লাগল, “এখানে তুলাম বন্দরশহরে এলাম। বেশ মনোযোগ দিয়ে এখানকার তলতেক ভাষা আরও ভাল করে শিখলাম। তারপরে রাজা তুতজ আমাকে লোভ দেখিয়ে গর্ভগৃহে পাঠাল। আমি পালালাম। চললাম চিচেন ইতজার দিকে। যাওয়ার পথে এই কোবানগরে এলাম। বুড়িমাকে পেলাম। বেশ আদরযত্নে মাস কয়েক রইলাম।”
আলফানসো একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এখানকার ইতিহাস জানলাম। এই দেশটার পুবদিকে বাস করে মায়াপানরা। পশ্চিমদিকে চিচেন ইতজা। রাজা হুনাকমিনের সঙ্গে মায়পানদের যুদ্ধ হয়েছিল। মায়পানরা হেরে যায়। হুনাকমিন চিচেন ইতজার মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। কী সুন্দর মন্দির। ওখানে গেলে দেখতে পাবেন।” আলফানসো থামল।
“আলফানসো কোনও একটা গোপন কিছু তুমি জান। সেটা বলো।” হ্যারি বলল।
“হ্যাঁ, এবার সেটাই বলব। এই কোবা থেকে আমাকে পালাতে হল। এখানকার গোষ্ঠীপতি আমাকে ডেকে পাঠাল। গোষ্ঠীপতি জিজ্ঞেস করল, “শুনেছি তুমি বিদেশী। এখানে এসেছ কেন?”
“ভাগ্যক্রমে। জলদস্যুদের জাহাজ থেকে পালিয়ে আমি এখানে এসেছি। আবার ভাগ্যক্রমে এখানে আহার, বাসস্থান পেয়েছি। আমি বললাম।
“উঁহু, তুমি মিথ্যে কথা বলছ। তুমি চিচেন ইতজার রাজা পাকানের গুপ্তচর।” গোষ্ঠীপতি বলল।
“আমি তলতেক ভাষাটা মোটামুটি শিখেছি। তাই আপনাকে বলছি, আপনিই ভেবে দেখুন, গুপ্তচরবৃত্তি আমি কেন করতে যাব। আমি বিদেশী। আপনাদের এই * দেশে হঠাৎই এসেছি।” আমি বললাম।
“বাজে কথা বলছ।” গোষ্ঠীপতি দু’জন পাহারাদারকে ইঙ্গিতে ডাকল। ওরা আমার দু’হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে চলল। বুঝলাম, হাজার চেষ্টা করেও গোষ্ঠীপতির সন্দেহ আমি দূর করতে পারব না। তাই দুর্ভাগ্য মেনে নিলাম।
“পাহারাদার দু’জন আমাকে একটা তালা লাগানো ঘরের সামনে নিয়ে এল। তালা খুলে আমাকে ওরা ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দিল।
আমার বন্দীজীবন শুরু হল। আমি পালাবার ছক কষতে লাগলাম। ও-ঘরে আরও দু-তিনজন বন্দী ছিল। জঘন্য খাবার খেতে দিত। বমি উঠে আসে। মনে পড়ল বুড়িমার কথা। কী সুস্বাদু খাবার খেতে পেয়েছি। শুকনো ঘাসের নরম বিছানায় শুয়েছি। ঘুমিয়েছি।” আলফানসো থামল।
ফ্রান্সিস বলল, “তারপর? তুমি পালাতে পারলে?”
“হ্যাঁ। আমি লক্ষ্য করলাম যে দু’জন পাহারাদার খাবার নিয়ে আসে। হাতে বর্শা থাকে না, ওদের পেছনে থাকে দু’জন। দু’জনের হাতেই কাঠের বর্শা। লোহার ছুঁচলো মুখ। আমি অন্য বন্দিদের বললাম, শোনো, আমি পাহারাদারদের বলব যে আজ একটু রাতে আমরা খাব।” বন্দিদের একজন বলল, কেন?
“আমি পালাবার ছক কষে ফেলেছি। আমরা সবাই পালাব।” আমি বললাম।
