এবার শব্দটা অনেক কাছে। ফ্রান্সিস হঠাৎ পেছনদিকে ঘুরে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল, “কে আমাদের অনুসরণ করছ! সাহস থাকে আমাদের সামনে এসো।”
পেছনের অন্ধকার থেকে কার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আমি আলফানসো, স্পেনীয়, আমি আপনাদের কোনও ক্ষতি করব না। আপনাদের বন্ধুত্ব চাই।”
“সামনে এসো।” ফ্রান্সিস বলল। পেছনের অন্ধকার গাছগাছালির আড়াল থেকে আলফানসো বেরিয়ে এল! ফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে মোটামুটি দেখা গেল মুখে গোঁফদাড়ি ভর্তি এক বয়স্ক লোক। মাথার কাঁচাপাকা চুল বড় বড়, এলোমেলো, ঘাড় ছাপিয়ে নেমে এসেছে।
নাম তো শুনলাম আলফানসো। আমাদের অনুসরণ করছ কেন?” ফ্রান্সিস বলল।
আলফানসো বলল, “সে অনেক কাহিনী আমার জীবনের। আপনারা যখন ছুটে এসে বনে ঢুকলেন তখন থেকেই আপনাদের পেছন পেছন আসছি। আপনারা স্পেনীয় ভাষায় কথা বলছিলেন। শুনে এত ভাল লাগল। আঃ, কতদিন মাতৃভাষা শুনিনি–বলিওনি। আপনাদের পরিচয় জানতে ইচ্ছে করছে।”
হ্যারি বলল, “আমরা জাতিতে ভাইকিং। তবে নিজেদের মাতৃভাষা ছাড়া আমরা পোর্তুগিজ স্পেনীয় ভাষা জানি।” তারপর হ্যারি আস্তে-আস্তে নিজেদের দেশে দ্বীপে ঘুরে বেড়ানো গুপ্তধন আবিষ্কার সংক্ষেপে বলে গেল। আলফানসো বলে উঠল, আপনারা রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন উদ্ধার করতে পারবেন?”
সব না জেনে, না বুঝে বলি কী করে?” ফ্রান্সিস বলল।
“আমরা এই বনের উত্তরপ্রান্তে এসে গেছি। আর কিছুক্ষণ হাঁটলে বনের শেষে এক বড় প্রান্তরে গিয়ে পৌঁছব। আগে সেখানে চলুন। ওখানে খাবার জোগাড় করব। খেয়েটেয়ে সব বলব।”
ফ্রান্সিসরা আর কিছু বলল না। নীরবে হাঁটতে লাগল।
সত্যিই আধঘণ্টার মধ্যে ওরা বনের শেষে এসে উপস্থিত হল।
অস্পষ্ট জ্যোৎস্নায় ঘাসে ঢাকা প্রায় অন্ধকার প্রান্তরটা দেখা গেল। আলফানসো বলল, “চলুন, আমার এক পরিচিত বুড়িমার বাড়ি আছে। সেখানে আশ্রয়, খাওয়া দুটোই জুটবে।”
ওরা প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে উত্তরমুখো চলল। ততক্ষণে আকাশের অন্ধকার কেটে গেছে। পুবদিকের আকাশ লালচে হয়েছে। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
একটু পরেই সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস সেদিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। মনে মনে ভাবল, কী সুন্দর সূর্যোদয়। সমুদ্রে সূর্যোদয় তো কত দেখেছে। এক উন্মুখ প্রান্তরের পরে এরকম সূর্যোদয় কোনওদিন দেখেনি। মারিয়া এই দৃশ্য দেখলে খুশিতে নেচে উঠত। মারিয়া আর বন্ধুরা জাহাজে রয়েছে। একথা ভাবতেই ফ্রান্সিসের মন খারাপ হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রান্সিস হাঁটতে লাগল। ওসব ভাবতে গেলে মন দুর্বল হয়ে পড়বে।
ঘাসে ঢাকা প্রান্তর শেষ হল। কিছু ঘরবাড়ি দেখা গেল। সকালের উজ্জ্বল রোদ পড়েছে বাড়িঘরে। গাছগাছালিতে বিস্তৃত প্রান্তরে বাড়িগুলি চুনাপাথর আর কাঠে তৈরি। একটা ছোট রাস্তায় ওরা ঢুকল। কয়েকটা বাড়ির পরে একটা বেশ পুরনো বাড়ির সামনে এল ওরা। আলফানসো বাড়িটার দরজায় কয়েকবার ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে কে যেন সাড়া দিল। কী বলল, ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। বাড়ির দরজা খুলে গেল। দেখা গেল এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। তিনি এগিয়ে এসে আলফানসোকে জড়িয়ে ধরলেন। আলফানসো কী বলে উঠল, বৃদ্ধা ফোকলা দাঁতে হাসলেন। কী যেন বললেন, আলফানসো ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে কী বলল। বৃদ্ধা চোখমুখ কুঁচকে হেসে উঠলেন। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ভেতরে আসতে ইঙ্গিত করলেন। সবাই বাড়িটাতে ঢুকল। সামনের ঘরটাতে ঢোকবার জন্য বৃদ্ধা ইঙ্গিত করলেন। সবাই ঘরটায় ঢুকল। দেখল মেঝের শুকনো ঘাস বুনে বুনে বিছানামতো করা হয়েছে, সেটা পাতা। ঢাকা কাপড়টায় নানা রঙের লতাপাতা সেলাই করে তোলা। সবাই বসল। আলফানসো বলল, “মজার ব্যাপার শুনুন। এই বৃদ্ধার একটি ছেলে যৌবনে মারা গিয়েছিল। আমার নাক চোখ মুখ ঠিক তার মৃত ছেলের মতো, বৃদ্ধা বলেছিল। তাই আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালবাসে। শুধু থাকা-খাওয়া নয় আমাকে অর্থ সাহায্যও করে। এদিকে কোনও কারণে এলে এই বৃদ্ধা মার কাছে আমাকে আসতেই হয়। বৃদ্ধা মা আমাকে কত যত্ন আত্তি করে। নিজের ছেলের মতো ভালবাসে।”
গতকাল খাওয়া জোটেনি। জলও খেতে পারেনি। রাত কেটেছে নিদ্রাহীন। ফ্রান্সিসরা বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। হ্যারি বরাবরই দুর্বল। ও এত ধকল সইতে পারল না। না খেয়েই অসহ্য ক্লান্তিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস, শাঙ্কো হ্যারিকে আর ডাকল না। ঘুমোক।
একটু বেলায় বৃদ্ধা এলেন। আলফানসোকে ডাকলেন। ওদের চিনেমাটির থালায় গোল চাকা চাকা রুটি, শাকসবজির ঝোল খেতে দিলেন। শাঙ্কো হ্যারিকে ডাকল, “হ্যারি, ওঠো খেয়ে নাও।” হ্যারি উঠে বসল।
ওরা চারজন খেয়ে নিল। খাওয়া দাওয়া সেরে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চোখ বুজল। নানা ভাবনা মাথায়। জাহাজে মারিয়া কেমন আছে, বন্ধুরা কেমন আছে। আমরা তো পালাতে গিয়ে এখানে এসে পড়লাম!
বিকেল নাগাদ সকলের ঘুম ভাঙল। ফ্রান্সিস শুয়ে থেকেই আলফানসোকে বলল, “তুমি তো স্পেন দেশের লোক। তুমি এখানে এলে কী করে?”
তখন আলফানসো ওর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলল। তারপর বলতে লাগল, “আমি তুলাম নগরে এসে পৌঁছেছিলাম। সেখানে বেশ কিছুদিন ছিলাম। তার মধ্যে তলতেক ভাষাটা শিখে নিয়েছিলাম। আমার ঢোলা জামাটার হাঁটু অবধি ঝুল ছিল। কোমরের তলায় তরোয়ালটা ঝুলিয়ে রাখতাম। জাহাজে কালো রং করা হয়। এক ধরনের ফল জলে সেদ্ধ করে এই রং পাওয়া যায়। আমি সেটা দিয়েই তরোয়ালটা রং করলাম। এখানকার লোকেরা জীবনে কখনও তরোয়াল দেখেনি। আমিও রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ তরোয়ালটার ওপর ঝুঁকে মাথা নোয়াতাম। বিড়বিড় করে কিছু বলতাম। আবার হাঁটতে থাকতাম। লোকেরা ধরে নিল তরোয়ালটা কোনও দেবমূর্তি। একটা পবিত্র জিনিস।
