ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল, “হ্যারি, শাঙ্কো, ওপরের দিকে চলো, জলদি।”
তিনজনে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। কিছুটা উঠেই দেখল সব অন্ধকার। মেঝেয় জ্বালা আগুনের আলো এতদূর এসে পৌঁছয়নি। অন্ধকারেই ওরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। অন্ধকারে হ্যারি কয়েকবার পা ফসকে সিঁড়ির ওপর পড়ে গেল। ফ্রান্সিস অন্ধকারেই হারিকে তুলে দাঁড় করাল। তারপর আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।
ওরা যখন মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল তখন বিকেল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল, হ্যারি, শাঙ্কো ওই জঙ্গলটার দিকে ছোটো।”
বেশ কিছুদূরে একটা জঙ্গল শুরু হয়েছে। তিনজনে সেদিকে ছুটল। কিছুটা গিয়ে ফ্রান্সিস বলল, “এখানে আমাদের থাকা চলবে না। একটা সৈন্যকে মেরেছি, আর একটাকে আহত করেছি। রাজা তুতজ আমাদের ধরতে পারলে মেরে ফেলবে। কাছেই ওই বনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢুকে পড়তে হবে। তারপর দেখা যাক বনের শেষে কী আছে।”
তিনজনে ছুটছে। মুখ হাঁ করে নিশ্বাস নিচ্ছে। হ্যারির শরীর বরাবরই দুর্বল। ও বেশ পিছিয়ে পড়ছে। ফ্রান্সিস একটু পিছিয়ে পড়ে হ্যারিকে উৎসাহ দিচ্ছে। কখনও # গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ছুটছে।
ওরা জঙ্গলটায় ঢুকে পড়ল। কয়েকটা গাছগাছালি পার হয়ে হ্যারি দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা গাছের কাণ্ডে ভর রেখে দাঁড়াল। ভীষণ হাঁফাতে লাগল। ফ্রান্সিস, শাঙ্কো হ্যারির কাছে এল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছুটা সবুজ ঘাসের জমির ওপর বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। হ্যারি আর শাঙ্কো সেখানে বসে পড়ল। তিনজনেই হাঁপাতে লাগল।
ফ্রান্সিস বলল, “শাঙ্কো, বনের আড়াল থেকে দেখে এসো তো রাজা তুতজের সৈন্য আমাদের খোঁজে এদিকে আসছে কিনা।” শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। আস্তে-আস্তে বনের শেষ দুটো গাছের আড়ালে দাঁড়াল। দেখল দূরে লোকজন নিজেদের কাজ করছে। ছোট ছোট দোকানে কেনাকাটা করছে। ধারেকাছে কোথাও কোনও সৈন্য নেই।
শাঙ্কো ফিরে আসবে বলে পা বাড়িয়েছে তখনই দেখল চার-পাঁচজন সৈন্য বর্শা হাতে জঙ্গ লের দিকে ছুটে আসছে। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় কর্ণার ধারালো মুখগুলো কচক করছে।
শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দাঁড়াল। ছুটে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল, “ফ্রান্সিস, চার-পাঁচজন সৈন্য ছুটে আসছে এই বনের দিকে।”
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। বলল, “বনটা বোধহয় গভীর বন। গাছের গুঁড়ির জটলার মধ্যে দিয়ে ছুটতে হবে। কাজেই জোরে ছুটতে পারব না। কিন্তু এখানে থাকা নিরাপদ নয়। ছোটো।”
তিনজনে আবার ছুটতে লাগল। কিছুটা যেতেই গভীর বন শুরু হল। গাছের গুঁড়িতে শেকড়বাকড়ের মধ্যে দিয়ে ছোটা অসম্ভব। তবু যতটা দ্রুত সম্ভব ওরা চলল। অন্ধকার বনের তলে কোথাও কোথাও রোদের টুকরো দেখা যাচ্ছে। সারাদিন স্নান খাওয়া নেই, তারপর অতটা ছুটে আসা। ওরা ভীষণ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল। বিশেষ করে হ্যারি আর চলতেই পারছিল না।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “আর যাব না এখন। আমরা এখন সৈন্যদের নাগালের বাইরে।”
ওরা ওখানেই বসে পড়ল। হাঁফাতে লাগল। ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল ওরা। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। এ-গাছের মাথা ও-গাছের মাথা দেখতে লাগল। প্রায় অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্যেই ও দেখল, ডানদিককার গাছটার মাথায় বেশ কিছু হলুদ রঙের পাকা ফল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল। সেই গাছটার কাণ্ড বেয়ে বেয়ে গাছটায় উঠল। ডালপালার মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে গাছটার মাথায় উঠে গেল। ডালপালার মধ্যে দিয়ে বেশ কিছু পাকা ফল ঝুলছে। শাঙ্কো কোমর থেকে ছোরাটা বার করল। তারপর ডালটার গোড়াটায় ছোরার কয়েকটা ঘা মারল। ডাল কেটে গেল। এদিকে ওদিকে আরও পাকা ফল। কী গাছ কী ফল কিছুই বুঝল না। ওখানে বসেই একটা পাকা ফলে কামড় বসাল। আশ্চর্য! কী মিষ্টি!কী স্বাদ! শাঙ্কো ফলটা খেতে খেতে অন্য ফলগুলো নিয়ে নেমে এল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি ফল ছিঁড়ে নিয়ে খেতে লাগল। খুব সুস্বাদু ফল। শাঙ্কো বলল, “গাছে উঠছি। আরও কিছুফল নিয়ে আসছি।”শাঙ্কো আবার গাছে উঠল।কয়েকটা ফলসহ গাছের ডাল কেটে নিয়ে নীচে নেমে এল। সবাই ফল খেতে লাগল। খিদেটা কিছুটা মিটল।
এবারে বন থেকে বেরোন। ফ্রান্সিস বলল, “চলো, আমরা উত্তরদিকে লক্ষ্য করে যেতে থাকি। দেখা যাক বনের বাইরে যেতে পারি কি না।”
আবার অন্ধকারে চলা শুরু হল। জল তেষ্টায় ওরা তখন কাহিল। কিছু দূর যেতেই একটা ডোবামতো পেল। অন্ধকারে বোঝাই গেল না–ওই ডোবার জল কেমন। তখন আর সেসব ভাববার সময় নেই। ইচ্ছেও নেই। তিনজনেই আঁজলাভরে জল তুলে খেতে লাগল। শুকনো জিভে মুখে যেন এতক্ষণে সাড় এল। ফ্রান্সিস উবু হয়ে বসে মাথাটা জলে ডোবাল, জল খেল। তারপর ঘাড়ে মাথায় জল ছেটালো। হ্যারি আর শাঙ্কোও তাই করল। এতক্ষণে শরীরটা যেন ঠাণ্ডা হল।
তারপর আবার চলা।
অন্ধকারে সাবধানে গাছের শেকড়বাকড়ে পা ফেলতে হচ্ছে। কাজেই চলার গতি কমে আসছে।
হঠাৎ ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছনে শুকনো ডালপালা ভাঙার শব্দ। ফ্রান্সিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে শব্দটা থেমে গেল। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস শব্দটা আমিও শুনেছি। নিশ্চয়ই কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।” ফ্রান্সিসরা আবার হাঁটতে লাগল। পেছনে আবার শব্দ। শুকনো ডালপাতা ভাঙার শব্দ। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কো ছোরাটা কোমর থেকে খুলে হাতে নিল। আবার চলল ওরা। আবার শব্দ।
