ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল, “এটা মিথ্যে। আমরা কারও গুপ্তচর নই।” রাজা তুতজের কথা এবার অমাত্য স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করে দিতে লাগল।
রাজা তুতজ বলল, বলছিলে তোমরা গুপ্তধন উদ্ধার করেছ। পারবে রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন ভাণ্ডার উদ্ধার করতে?”
ফ্রান্সিস বলল, “সেই গুপ্তধন কোথায় আছে বলুন। আমরা যা দেখতে চাই, যেখানে যেতে চাই তার অনুমতি দিন আমরা রাজা হুনাকমিনের গুপ্তধন উদ্ধার করব।”
“বৃথা চেষ্টা। পারবে না। অবশ্য মায়াপানদের দেশের চিচেন ইতজাতেও রাজা হুনাকমিনের ধনসম্পদ লুকানো আছে।” রাজা তুতজ বলল।
“এখানকার গুপ্তধনই আমরা খুঁজব। এখানে কোথায় আছে সেটা?” ফ্রান্সিস বলল।
“সঠিক কেউ বলতে পারবে না। তবে এখানকার মন্দিরে কোথাও আছে– এটাই আমাদের বিশ্বাস।” রাজা তুতজ বলল।
“ঠিক আছে। আমাদের মুক্তি দিন। আমরা গুপ্তধন খুঁজব।”
“বেশ, তোমাদের মুক্তি দেওয়া হল। সেনাপতি তোমাদের কাল সৈন্যাবাসে থাকতে দেবেন।” রাজা তুতজ বললেন।
এবার রাজা তুতজ হেসে উঠল। ফ্রান্সিস এবার লক্ষ্য করল রাজা তুতজের। কুতকুতে চোখ। চোখের চাউনিটাও অত্যন্ত ক্ষুরধার। চোখমুখ দেখে বোঝা দায় লোকটা মনে মনে ঠিক কী চাইছে? রাজা তুতজ হাসি থামিয়ে বলল, “তোমরা ফিরে এসে বল–গুপ্তধনের কোনও হদিস পেলে কি না।”
“নিশ্চয়ই বলব।” ফ্রান্সিস বলল। “তবে মন্দিরের গর্ভগৃহটা বড় ছোট। একটু বড় হলে ভাল হত।”
ফ্রান্সিস কোনও কথা বলল না, রাজা তুতজ আবার হেসে উঠল।
ফ্রান্সিস বুঝল না রাজা তুতজ বারবার হেসে উঠছে কেন? লোকটার কি অন্য মতলব আছে?
ফ্রান্সিসরা সভাগৃহের বাইরে এল। একজন সৈন্য এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের ইশারায় পেছনে পেছনে হাঁটতে বলল। ফ্রান্সিসরা সৈন্যটার পেছনে পেছনে চলল। বিস্তৃত প্রান্তর পার হয়ে লম্বা ঘরগুলোর সামনে এল। সৈন্যটি একটা ঘরের দরজা খুলে ওদের ঢুকতে বলল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। ঘরটার মেঝেয় ঘাসপাতা দড়ি দিয়ে বাঁধা বিছানা। তাতে সুতোর কাজ করা চাদর পাতা। সৈন্যটি ইঙ্গিতে বিছানাটা দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিসরা বিছানায় বসল। আরও দু’জন সৈন্যকে দেখল শুয়ে আছে। ফ্রান্সিসও শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে ভাবতে লাগল–ব্যাপারটা কি এত সহজ? মন্দিরের গর্ভগৃহে গুপ্তধন আছে এটা যদি সকলের জানাই থাকবে তা হলে এতদিনেও তা উদ্ধার করা হল না কেন? এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও গোপনীয় কিছু আছে। যাক গে, কালকে গর্ভগৃহ দেখলেই বোঝা যাবে কোনও কিছু ওদের কাছে গোপন করা হয়েছে কি না। ওদিকে আর এক চিন্তা মারিয়া আর বন্ধুরা। ওরা বোধ হয় চিন্তায় পড়েছে–ফ্রান্সিসদের ফিরে আসতে দেরি হচ্ছে কেন?
পরদিন সকালের খাবার ওরা খেয়ে উঠেছে তখন। দু’জন সৈন্য বর্শা হাতে ওদের কাছে এল। তলতেক ভাষায় কী বলল। হ্যারি বারবার বলল, “মন্দির, মন্দির। সৈন্যটি মাথা ওঠানামা করল। তারপর ঘরের বাইরে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস, হ্যারি আর শাঙ্কো ঘরের বাইরে এল।
দু’জন সৈন্য হাতে বর্শা নিয়ে প্রান্তরে নামল। ওদের একজনের হাতে একটা নেভানো মশাল।
ফ্রান্সিসরা ওদের পেছনে পেছনে চলল। ফ্রান্সিস তখনও ভেবে চলেছে এসবের পেছনে রাজা তুতজের কোনও অসৎ ইচ্ছা আছে কি না। ওদের বিপদে ফেলাই রাজা তুতজের ইচ্ছে কি না।
কিছু দূরে একটা টিলা দেখা গেল, তারই নীচে মন্দিরটা। তিনকোনা মন্দির। মন্দিরের সামনে থাক থাক সিঁড়ি উঠে গেছে। দু’পাশে পাথরের দেওয়াল। মন্দিরটা পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা।
সবাই সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল। সৈন্য দু’জন সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসদের আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। দু’পাশের চুনাপাথরের দেওয়ালে পাথর কুঁদে পাখি ফুল লতাপাতার নকশা। সব রঙিন। এই পিরামিড-মন্দিরে অতীতের মৃত রাজাদের সমাধি দেওয়া হয়। এখানে সেই মৃত রাজাদের পুজো হয়।
সৈন্য দু’জন এবার সিঁড়ি দিয়ে নীচের দিকে নামতে লাগল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। একটু নামতেই অন্ধকারের মধ্যে ওরা এসে পড়ল। সৈন্যটা চকমকি ঠুকে মশাল জ্বালল। মশালের কঁপা কাঁপা আলোয় সিঁড়ি দেখা যেতে লাগল।
সবাই নেমে চলল। বেশ কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ি শেষ হল। সামনে পাথরের দরজা খোলা। সকলে দরজা পার হল। আবার ছোট ছোট সিঁড়ি। আরও নীচে নামল সবাই। একটা চৌকোনো ঘরে এসে সিঁড়িটা শেষ হল। ফ্রান্সিসরা অসহ্য গরমে ঘামতে লাগল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি জামা খুলে ফেলল। শাঙ্কো জামা খুলল না। জামা খুললে ছোরাটা লুকিয়ে রাখা যাবে না।
চৌকোনো ঘরটা দেখিয়ে সৈন্যদের একজন ইঙ্গিত করল ঘরটায় নামতে। ঘরটার মেঝেয় বাসি ফুলপাতা ছড়ানো। ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখল। কোথাও কোনও ফাঁকফোকর নেই। মেঝেটা তেলতেলে। মশালের আলোয় পড়ে চকচক করছে। ফ্রান্সিস এর কোনও কারণ বুঝল না।
হ্যারি মেঝেয় নামেনি। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিস হঠাৎ ওপরের দিকে তাকাল। মশালের আলোয় দেখা যাচ্ছে পাথরের ছাদ। চোখ নামাতে গিয়ে দেখল মশাল হাতে সৈন্যটি হাসছে। ফ্রান্সিস ভাবল, সৈন্যটি হাসছে কেন?
তখনই ওই সৈন্যটি হাতের মশাল ঘরটার মেঝেয় ছুঁড়ে দিল। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ধোঁয়া উঠল। আগুন ছড়াতে লাগল। ফ্রান্সিস ততক্ষণে চিৎকার করে বলল, “শাঙ্কো, উঠে পড়ো সিঁড়িতে।” সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিতেই ধোঁয়া কেটে গিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেয়। সৈন্য দু’জন এবার হ্যারিকে বর্শা দিয়ে খোঁচা দিয়ে ইঙ্গিত করল আগুন-জ্বলা মেঝেতে নামতে। ফ্রান্সিস এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উঠে সেই সৈন্যটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সৈন্যটি বর্শা ছোঁড়ার অবকাশ পেল না।ফ্রান্সিস ওকে এক জোর ধাক্কা দিল। সৈন্যটি সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে মেঝের আগুনে পড়ে গেল। আর্তনাদ করে উঠল। অন্য সৈন্যটি শাঙ্কোর দিকে বর্শা ছুঁড়ল। শাঙ্কো জামার তলা থেকে ছোরাটা বার করে সৈন্যটির বুক লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। শূন্যে পাক খেয়ে ছোরাটা সৈন্যটির বুকে বিঁধে গেল। সৈন্যটি দু’হাতে ছোরাটা টেনে বার করল। ছোরাটা সিঁড়ির ওপর রেখে সৈন্যটি সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়ল। শাঙ্কো এক ছুটে গিয়ে ছোরাটা তুলে নিল।
