ওরা তিনজন রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। তখন সকাল। দু’পাশের বাড়িঘর থেকে লোকজন কাজে বেরিয়ে পড়েছে। তারা অবাক হয়ে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। বাজারের কাছে ভিড় বাড়ল। যোদ্ধ দু’জন ঘোড়া থেকে নামল। এই ভিড়ের মধ্যে বন্দিরা পালিয়ে যেতে পারে। ঘোড়ার সামনের দিকে ফ্রান্সিসদের আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঘোড়াদুটোর সামনে এলো। যোদ্ধাদের একজন হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা হাঁটতে লাগল। সামনে একজন যোদ্ধা লাগাম ধরে একটা ঘোড়াকে নিয়ে চলল। পেছনে আর একজন ঘোড়ার লাগাম ধরে চলল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সকলে একটা লম্বাটে ঘরের কাছে এল। সামনে বিরাট প্রান্তর। সবুজ ঘাসে ঢাকা। লম্বাটে ঘর দেখে ফ্রান্সিস বুঝল কয়েদঘর। আবার বন্দিদশা।
লম্বাটে ঘরটার কাছে এসে দাঁড়াল সবাই। ফ্রান্সিস দেখল, ঘরের দরজাটা লোহার। দরজায় বড় তালা ঝুলছে। দরজার বাইরে বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে দু’জন পাহারাদার। কোমরে তরোয়াল। তাদেরই একজনকে একজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে কী বলল। পাহারাদার তালা খুলল লম্বা চাবি দিয়ে।
ফ্রান্সিসদের প্রায় টেনে ঘরে ঢোকানো হল। যোদ্ধাদের একজন পাহারাদারদের কী বলল। তারপর ঘোড়া চালিয়ে চলে গেল।
লম্বাটে ঘরটার একদিকে এই কয়েদঘর। ফ্রান্সিসদের ঢোকানো হল। ফ্রান্সিসরা দেখল চার পাঁচজন বন্দি রয়েছে। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ বসে আছে। দু’জন শুয়ে আছে। মেঝেটা পাথরের, তার ওপর শুকনো ঘাসপাতা ছড়ানো। এটাই বিছানা।
আগে যে বন্দিরা জেগে ছিল তারা বেশ অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দিকে চেয়ে রইল। ফ্রান্সিসরা বসে পড়ল।
শাঙ্কো শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, “ফ্রান্সিস, মাত্র দু’জন যোদ্ধা ছিল– লড়াইয়ে নামলেও ওরা হেরে যেত।”
“তা হয়তো যেত। কিন্তু তারপর? বাইরে তাকিয়ে দ্যাখো প্রান্তরের শেষে লম্বা ঘরগুলো। ওটা সৈন্যনিবাস। তাদের কাছে নিশ্চয়ই খবর পৌঁছত। আমরা সমুদ্রতীরে পৌঁছে জাহাজ চালাবার আগেই ওরা ঘোড়ায় চেপে সমুদ্রতীরে পৌঁছত। আমাদের জাহাজ দখল করত। এক অসম লড়াইয়ে আমাদের প্রাণ দিতে হত। তার চেয়ে এটাই ভাল হল। এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবই। কিন্তু তার জন্য সময় ও সুযোগের প্রতীক্ষা করতে হবে। হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। ফ্রান্সিসের ওপর শাঙ্কোর অগাধ বিশ্বাস। ফ্রান্সিস একটা উপায় বের করবেই।
দুপুরে কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। দু-তিনজন সৈন্য ঢুকল। একজনের হাতে কাঠের বেশ বড় রেকাবি। অন্যজনের হাতে একটা বেশ বড় হাঁড়ি। আর একজনের হাতে গোল গোল পাতা। সে পাতাগুলো ফ্রান্সিসদের সামনে পেতে দিতে লাগল। পাতায় দেওয়া হল নানা সবজি, আলুর ঝোল। আর গোল গোল করে কাটা কাটা রুটি। সবাই খেতে লাগল। দু’জন প্রহরী দরজায় দাঁড়িয়ে রইল।
ফ্রান্সিসদের খাওয়া শেষ হল। সবাই ঘরের কোণায় রাখা মাটির জালা থেকে জল তুলে খেল।
ফ্রান্সিস শুকনো ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। হ্যারি, শাঙ্কো বসে রইল। ফ্রান্সিস চোখে আড়াআড়িভাবে হাত রেখে শুয়ে রইল। ও গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল, কীভাবে এই কয়েদঘর থেকে পালাবে। কিন্তু কোনও পরিকল্পনাই কাজে লাগবে বলে ওর মনে হল না। ও অন্য উপায় ভাবতে লাগল।
রাত কাটল। মুক্তির কোনও আশা দেখছে না ফ্রান্সিস। সকালের খাবার নিয়ে সৈন্যরা কয়েদঘরে ঢুকল। বন্দিদের খাওয়া চলছে, তখন গোঁফদাড়িওয়ালা একজন ঢুকল। সৈন্যরা, প্রহরীরা মাথা ঝুঁকিয়ে সেই লোকটিকে সম্মান জানাল। বোঝা গেল ওই লোকটি সেনাপতি।
সেনাপতি তলতেক ভাষায় কী সব বলে গেল, ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। শুধু একটা কথা বুঝল, রাজা তুতজ! ওই দেশীয় বন্দিরা জলটল খেয়ে দরজার কাছে সারি দিয়ে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসরাও গিয়ে সারিতে দাঁড়াল। সেনাপতি দেখল কিন্তু কোনও কথা বলল না।
ঘর থেকে বন্দিরা বেরিয়ে এল। ফ্রান্সিসরাও ওদের পেছনে পেছনে বেরিয়ে এল। সবাই সারি দিয়ে হেঁটে চলল একটা বেশ বড় পাথর বাঁধান বাড়ির দিকে। পেছনে সেনাপতি। সঙ্গে চার-পাঁচজন সৈন্য। সবাই সেই বাড়িটায় ঢুকল। ঘরটা অন্ধকার অন্ধকার। ফ্রান্সিস কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধকার ভাবটা অল্পক্ষণের মধ্যেই চোখে সয়ে গেল। ফ্রান্সিস দেখল একটা পাথরের সিংহাসনে রাজা তুতজ বসে আছে। সিংহাসনের গায়ে নানা জায়গায় মণিমাণিক্য গাঁথা। রাজার দু’পাশে দুটো কাঠের আসনে বসে আছে দুই বৃদ্ধ। বোঝা গেল মন্ত্রী ও অমাত্য।
রাজা তুতজ বয়স্ক লোক। ঢোলা হাতা জামা পরে আছে। পোশাকে সুতোর কারুকাজ। মাথায় কাপড়ের টুপিমতো। পাকানো গোঁফ।
সেনাপতি মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে তলতেক ভাষায় একনাগাড়ে কী বলে গেল। রাজা তুতজ ফ্রান্সিসদের দিকে তাকাল। কিছু বলল। ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। এবার আসনে বসা অমাত্যটি ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল, “তোমরা কে? এখানে এসেছ কেন?”
ফ্রান্সিস আশ্বস্ত হল, যাক, ভাঙা ভাঙা বললেও একজন স্পেনীয় ভাষা জানা লোক পাওয়া গেছে।
আমরা জাতিতে ভাইকিং। বিভিন্ন দেশে, দ্বীপে আমরা ঘুরে বেড়াই আমাদের জাহাজ নিয়ে। গুপ্তধনের কথা শুনলে তা উদ্ধার করি। সেই গুপ্তধনের মালিককে তা দিয়ে দিই। একটা স্বর্ণমুদ্রাও আমরা নিই না।” হ্যারি বলল।
অমাত্য হ্যারির কথাগুলি রাজা তুতজকে বলল। রাজা আবার কী বলল। সেটা অমাত্য বলল–“দেশের পশ্চিমদিকে মায়পানদের রাজ্য-শত্রু- তোমরা গুপ্তচর।”
