“বেশ চলো।” ফ্রান্সিস বলল।
সেদিন রাতে ফ্রান্সিস, শাঙ্কো আর হ্যারি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল।
রাত গম্ভীর হতে ওরা তৈরি হয়ে জাহাজের হালের কাছে এল। ফ্রান্সিস, হ্যারি কোনও অস্ত্র নেয়নি। শুধু শাঙ্কো নিয়েছে জামার তলায় রাখা ছোরাটা।
হালে বাঁধা দড়িদড়া ধরে তিনজন ওদের একটা ছোট নৌকোয় নেমে দাঁড়াল। তারপর ফ্রান্সিস নেমে আসতে ওরা নৌকোয় বসল। ফ্রান্সিস দড়িটা হাতে নিল। তারপর নৌকো খুলে দাঁড় বাইতে লাগল। নৌকো চলল তীরভূমির দিকে। চারদিক নিকষ কালো। কোথাও জ্যোৎস্নার চিহ্নমাত্র নেই। শুধু আকাশেজ্বলছে লক্ষ লক্ষ তারা। ওই তারাগুলির ক্ষীণ আলোয় যা কিছু দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের জল ছুঁয়ে হাওয়া বইছে। তাতেই যা একটু ঠাণ্ডা লাগছে। সমুদ্র শান্ত। নৌকো চলল।
নৌকো তীরের কাছাকাছি এল। অন্ধকারে ফ্রান্সিস তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল তীরভূমির দিকে। ঢালে বালিয়াড়ি। কিন্তু যতটা সম্ভব দেখতে পাচ্ছে তাতে কোথাও কোনও বাড়িঘর দেখতে পেল না।
একটা ধাক্কা খেয়ে নৌকোটা তীরে লাগল।
তিনজনে নেমে এল। শাঙ্কো নৌকোটা তীরে অনেকটা তুলে রাখল যাতে জোয়ারে ভেসে না যায়।
বালিয়াড়ি পেরিয়ে তীরে উঠে দেখল একটা রাস্তা চলে গেছে। ফ্রান্সিস বলল, “হ্যারি, মনে হচ্ছে এখানে লোকজনের যাতায়াত আছে।”
“হ্যাঁ, সেটা বোঝা যাচ্ছে। মনে হয় ধারেকাছে জনবসতি আছে। চলো, দেখা যাক।” হ্যারি বলল।
অন্ধকারে আন্দাজেই ওরা চলল এই রাস্তা ধরে। সমুদ্রের জোরালো হাওয়ায় রাস্তার ধুলো উড়ছে। ওরা তার মধ্যে দিয়েই চলল।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর প্রথমেই একটা পাথরের বাড়ি দেখল। তারপরেই দেখল সারি সারি ঘরদোর। সবই অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, “চলো, সামনের ওই বাড়িটায় যাই। একটা বড় বাড়ির সামনে এসে ওরা দাঁড়ালো। কাঠের মোটা থাম চুনাপাথর আর চালে শুকনো ঘাস দিয়ে বাড়িটা তৈরি।
ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে দরজায় আঙুল দিয়ে ঠকঠক শব্দ করল। ভেতরে কোনও সাড়া নেই। আবার ফ্রান্সিস ঠকঠক করল। ভেতর থেকে কারও কথা শোনা গেল। কথাটা ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না। ওরা দাঁড়িয়ে রইল।
দরজা খোলার শব্দ হল। এক বৃদ্ধ মোমবাতি হাতে দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিসদের দেখে বেশ অবাকই হলেন। এই বিদেশি পোশাকপরা লোকগুলো এখানে এল কী করে? বৃদ্ধ বলল, “তোমরা কী চাও?” ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝল না।
হ্যারি বুকে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে বলল, “আমরা ভাইকিং।” বৃদ্ধটি শুধুভাইকিং শব্দটা বুঝলেন। তখনই ঘরের ভেতর থেকে এক যুবক এসে ওদের সামনে দাঁড়াল। ভাইকিং কথাটা সে শুনল। বুঝল এইনবাগতরা ভাইকিং। গায়ে তো বিদেশী পোশাক। তবুযুবকটির সন্দেহ গেল না। এত রাতে এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে কী জন্য? এরা নিশ্চয়ই মায়াপানদের পাঠানো গুপ্তচর। যুবকটি আর দাঁড়াল না। আস্তে-আস্তে রাস্তায় নামল। চলল পুবমুখো। একটু যেতেই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল। এবার হ্যারি মাটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বোঝাল জায়গার নাম কি? বৃদ্ধটি ইঙ্গিত বুঝলেন। বললেন, “তুলাম, তুলাম।” বুকে হাত দিয়ে বললেন, “য়ুকাতান, য়ুকাতান।” তার মানে এরা য়ুকাতান জাতি। বৃদ্ধটি এবার দু’হাত আড়াআড়ি রেখে বোঝালেন, যুদ্ধ, লড়াই। হ্যারি বুঝল সেটা। ফ্রান্সিসকে বলল, “ফ্রান্সিস এরা হচ্ছে য়ুকাতান জাতি। এদের লড়াই চলছে মায়াপান উপজাতিদের সঙ্গে।”
বৃদ্ধটি আর কোনও কথা না বলে ঘরে ঢুকে গেলেন। ফ্রান্সিস হঠাৎ বুঝতে পারল, সামনে বিপদ। যুবকটি আস্তে-আস্তে বেরিয়ে গেল ঠিকই। কিন্তু ওদের চোখের আড়ালে যুবকটি নিশ্চয়ই ছুটে গেছে য়ুকাতান যোদ্ধাদের খবর দিতে যে, আমরা মায়াপানদের গুপ্তচর। ফ্রান্সিস বলে উঠল, “হ্যারি, শাঙ্কো, জাহাজের দিকে ছোটো।”
তিনজনেই লাফিয়ে রাস্তায় নামল। তারপর সমুদ্রতীরের দিকে ছুটল।
তখন অন্ধকার কেটে গেছে। পূব আকাশ কুয়াশা ঢাকা। লাল রঙের আভা। তিনজন ছুটছে তখন। হঠাৎ শুনল ঘোড়ার পায়ের শব্দ। পেছনে তাকিয়ে দেখল–দুটো ঘোড়া ছুটিয়ে দু’জন যোদ্ধা আসছে। হাতে বর্শা। গায়ে মোটা কাপড়ের পোশাক। পোশাকে লাল-নীল রঙের সুতোর কাজ করা।
ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ছুটে লাভ নেই। উলটে আমাদের ওপর লোকেদের সন্দেহ বাড়বে। হয়তো বর্শা ছুঁড়ে আমাদের হত্যা করতে পারে।”
তিনজনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। অশ্বারোহী দু’জন সৈন্য ফ্রান্সিসদের কাছে এসে থামল। যোদ্ধা দু’জন নামল। বর্শা হাতে এগিয়ে এল। ওদের নিজেদের ভাষায় কী জিজ্ঞেস করল। ভাইকিং কথাটা শুনে ফ্রান্সিস বুঝল। ও মাথা ওঠানামা করলো। যোদ্ধা দুজন আরও কিছু জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিস তার কিছুই বুঝল না।
এবার একজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের পুবদিকে আঙুল তুলে দেখাল। ইঙ্গিতে বলল, ওইদিকে ওদের পেছন পেছন যেতে। ফ্রান্সিস কিছুই না বোঝার ভান করল। এক যোদ্ধা তার হাতের বর্শার ফলাটা দিয়ে ফ্রান্সিসকে খোঁচা দিল। ফ্রান্সিস বুঝল-বর্শার ফলাটা ওর পিঠ কেটে দিয়েছে। নিশ্চয়ই রক্ত বেরোচ্ছে। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস বেশি চটে গেলে হয়তো বর্শা বুকে ঢুকিয়ে দেবে। তার চাইতে ওরা যেভাবে চাইছে আমরা সেইভাবেই চলব।” যোদ্ধাদের ইঙ্গিতে ফ্রান্সিস পুবমুখো হাঁটতে শুরু করলো। ওর পেছনে পেছনে হ্যারি আর শাঙ্কোও চলল।
