আলফানসো এতক্ষণ পরে হাসল। লোকেরাও হাসল। ও আগে পোশাক পাল্টাল। ভেজা পোশাকে এতক্ষণ থাকতে হয়েছে। জলেভেজা শরীরে কাঁপুনি ধরল। ভেজা পোশাক এতক্ষণ পরে ছাড়তে পেরে আলফানসো যেন প্রাণ ফিরে পেল।
এবার খাওয়া। আলফানসো খাবারের বড় পাত্রটা নিল। তারপর খিদের জ্বালায় না থেমে একনাগাড়ে খেতে লাগল। একটুক্ষণের মধ্যেই সব খাবার শেষ। ওকে ঘিরে থাকা লোকজন খুশি হল। আলফানুসো হাসল। ইঙ্গিতে বোঝাল ও একটু শুয়ে বিশ্রাম নিতে। চায়। যার বাড়িতে আলফানসো প্রথম গিয়েছিল সেই লোকটি এগিয়ে এল। হাতের ইঙ্গি তে বাড়িতে ঢুকতে বলল। আলফানসো বাড়িটার ভেতরে একটা ঘরে ঢুকলো। ঘরটা বেশ বড়। একপাশে বিছানামতো পাতা। লোকটা ওই বিছানা দেখাল। আলফানসো হেসে লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিছানাটায় শুয়ে পড়ল। বাইরে লোকজন যে যার নিজের নিজের বাড়িতে চলে গেল। আলফানসো অল্পক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
কয়েকদিন তুলামে থেকে আলফানসো রওনা হলো চিচেন ইতজা নগরের দিকে। পথে এদেশের লোকদের খেতখামার দেখল। মেজ ম্যাওইর খেত, তুলোর খেতও আছে। পুরুষদের পোশাক জোব্বার মতো। কোমরে মোটা কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। মেয়েরা পরে নানা রঙিন সুতোয় কাজ করা পোশাক।
বেশ কয়েকদিন হেঁটে আলফানসো চিচেন ইতজা নগরে এসে পৌঁছল।
এই ঘটনার প্রায় পনেরো বছর পরের কাহিনী।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। বাতাস বেগবান। পালগুলো ফুলে উঠেছে। ঢেউ ভেঙে ফ্রান্সিসদের জাহাজ বেশ দ্রুতগতিতেই চলেছে। ভাইকিংরা শুয়ে, বসে, গল্প করে সময় কাটাচ্ছে।
সেদিন বিকেলের দিকে নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় নিজের জায়গায় বসেছিল। হঠাৎ দেখল দক্ষিণদিক থেকে গভীর কালো মেঘ মাঝ আকাশের দিকে উঠে আসছে। পেড্রো চিৎকার করে বলল, “ভাইসব, ফ্রান্সিসকে ডাকো। প্রচণ্ড ঝড় আসছে।” ভাইকিংরা সব উঠে দাঁড়াল। আকাশের দিকে তাকালো। সত্যিই আকাশ মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। তখনই পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত গেল। অন্ধকারে ঢেকে গেল সবকিছু। শাঙ্কো ছুটল ফ্রান্সিসকে ডাকতে।
ফ্রান্সিস ডেকে উঠে এল। আকাশের অবস্থা দেখেই বুঝল ঝড় আসছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল, “ভাইসব, ঝড় আসছে। সবাই তৈরি হও।” ভাইকিংরা পাল গুটিয়ে ফেলল। পালের দড়ি টেনে ধরে সবাই তৈরি হল। পেড্রো মাস্তুলের মাথা থেকে নেমে এল। মাস্তুলের গায়ে জড়ানো দড়িদড়া ধরল কিছু ভাইকিং।
সমুদ্রের বুক অন্ধকার করে প্রচণ্ড হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসদের জাহাজের ওপর। শুরু হল মেঘের গর্জন। বিদ্যুতের তীব্র আঁকাবাঁকা আলো আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি।
ভাইকিংরা ঝোড়ো বাতাসে কাত হয়ে যাওয়া জাহাজ দড়ি ধরে টেনে সোজা করতে লাগল। বিরাট বিরাট ঢেউ ডেকের ওপর আছড়ে পড়তে লাগল।
ভাইকিংরা আধঘণ্টা ধরে ঝড়ের সঙ্গে লড়ে জাহাজ ডুবতে দিল না।
হাওয়ার তীব্রতা কমে গেল। আকাশ পরিচ্ছন্ন হয়ে গেল। তারা উঠল।
যেন জলে স্নান করে উঠেছে ভাইকিংরা। ডেকের এখানে ওখানে ওরা শুয়ে রইল। তখনও হাঁপাচ্ছে সবাই।
গায়ে জলে ভেজা পোশাক নিয়ে ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল। বলল, “জাহাজ কোনদিকে চালাচ্ছ?”
“উত্তরমুখো চালাব ভেবেছিলাম কিন্তু ঝড়ের ধাক্কায় কোথায় ছিটকে এসেছে বুঝতে পারছি না।” ফ্লেজার বলল।
“তা হলে কি সমুদ্রে আমরা দিক হারালাম?” ফ্রান্সিস বলল।
“তাই তো মনে হচ্ছে। তাই ভাবছি হুইল আর ঘোরাবো না। জাহাজ যেদিকে যায় যাক।” ফ্লেজার বলল।
“অগত্যা। উপায় কী?” ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল, “আমাদের জাহাজের দিক ভুল হয়নি তো?”
“হ্যাঁ, তাই হয়েছে।” ফ্রান্সিস বলল। ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। ফ্রান্সিস বলল, “ধৈর্য হারিও না। আমরা ঝড়ে জলে তো ডুবে মরিনি। বেঁচে আছি। নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও গিয়ে জাহাজ তীরে ভিড়বে।”
জাহাজ চলল। পেড্রো মাস্তুলের মাথায় বসে চারদিকে নজর রাখতে লাগল। কিন্তু ডাঙার দেখা নেই। ভাইকিং বন্ধুদের মনে সেই আনন্দ উচ্ছ্বাস নেই। সকলেরই ভাবনা–এ আমরা কোথায় চলেছি? কোনওদিন কি কোনও সমুদ্রতীরে পৌঁছতে পারব? না কি ক্ষুধায় তৃষ্ণায় জাহাজেই মারা যাব? মারিয়া ফ্রান্সিসকে বলল, “সবাই কেমন মনমরা হয়ে গেছে। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাব কী করে?”
“নিশ্চয়ই উদ্ধার পাব। মনকে শক্ত করো। হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই।” ফ্রান্সিস বলল।
সবাই তো আর তোমার মতো নয়।” মারিয়া বলল।
সাতদিন কেটে গেল। ডাঙার দেখা নেই। ভাইকিংরা ভীষণ মুষড়ে পড়ল।
সেদিন খুব ভোরে নজরদার পেড্রো দূরে ডাঙামতো দেখল। কিন্তু পরক্ষণেই তা কুয়াশায় ঢেকে গেল। পেড্রো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কুয়াশা সরে যেতেই সকালের রোদে দেখল সমুদ্রতীরের বালিয়াড়ি, গাছপালা। পেড্রো গলা চড়িয়ে বলল, “ভাইসব, ডাঙা। ডাঙা দেখা যাচ্ছে।”
ভাইকিংরা ডেকে উঠে এল। রেলিং ধরে দাঁড়াল। দেখল সমুদ্রতীরে গাছগাছালি। সবাই ধ্বনি তুলল, ও-হো-হো। ফ্রান্সিস, মারিয়া, হ্যারিও ডেকে উঠে এল। সমুদ্রতীর দেখল। হ্যারি বলল, “ফ্রান্সিস, এখন কী করবে?”
“তাই ভাবছি।” ফ্রান্সিস বলল।
“তা হলে আজ রাতেই নৌকোয় চড়ে তীরভূমিতে চলল। দেখা যাক লোকজনের দেখা পাই কি না। জিজ্ঞেস করে তা হলে জানা যাবে কোথায় এলাম।” হ্যারি বলল।
