তারপর কত জাহাজ লুঠ দেখল। শুধু দেখল না, সর্দারের হুকুমে তাতে অংশও নিতে হল। আত্মরক্ষার জন্যে নরহত্যাও করতে হল। লুঠের ভাগ পায়। খাদ্য পায়। কখনও কোন বন্দরে ওদের জাহাজ ভেড়ে। জাহাজের মাথায় সেই দেশেরই পতাকা ওড়ে। ওরা যে জলদস্যু, জাহাজটা যে জলদস্যুদের এটা অনেকেই বোঝে না। সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজ মনে করে। ওরা বন্দর শহরে নামে। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পেটভরে খায়, পোশাক কেনে, বন্দর শহরে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। মুক্ত জীবনের স্বাদ পায়। এভাবেই আলফানসোর দিন কাটছিল।
এক গভীর রাতে সমুদ্রে ঝড় উঠল। প্রচণ্ড জোরে ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল আলফানসোদের জাহাজের ওপর। রাতের আকাশ যেন ফালা ফালা হয়ে যেতে লাগল বিদ্যুৎ রেখায়। সেই সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি।
আলফানসোরা জাহাজের মাস্তুলের পালের দড়িদড়া টেনে ধরে জাহাজটা ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে লাগল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মাস্তুলটা প্রচণ্ড শব্দে ভেঙ্গে পড়ল। জাহাজটা মাঝামাঝি ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়ে গেল। আলফানসো বুঝল ভাঙা জাহাজে থাকলে জাহাজের নিচে চাপা পড়ে যাবে। তখনই বিদ্যুতের আলোয় একঝলক দেখল সমুদ্রতীরের গাছগাছালি। তাই ডুবন্ত জাহাজ থেকে ও উত্তাল সমুদ্রের বিরাট বিরাট ঢেউয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
আবার বিদ্যুৎ চমকালো। সাঁতরাতে সাঁতরাতে দেখল তীরে বনজঙ্গল। সেদিকে লক্ষ্য রেখে আলফানসো সাঁতরাতে লাগল। ওই বিরাট বিরাট ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতরানো অসম্ভব। ওরই মধ্যে আলফানসো শরীর ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করতে লাগল।
ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমল। বৃষ্টিও কমল। আলফানসো দেখল তীর খুব দুরে নয়। ও প্রাণপণে সাঁতার কেটে তীরের দিকে চলল। কিছুটা সাঁতরে যেতেই পায়ের নীচে বেলেমাটি ঠেকল। আলফানসো আনন্দে মাটিতে পা রেখে লাফিয়ে উঠল। চলল তীরের মাটির দিকে। তীরে উঠে মুখ হাঁ করে হাঁপাতে হাঁপাতে আলফানসো মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। আর হাঁটার শক্তি নেই। শুয়ে শুয়ে হাঁপাতে লাগল। দেখল ঝড় থেমেছে। বৃষ্টি আর নেই। আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে তারা জ্বলছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল।
পূব আকাশে লালচে রং ফুটে উঠল। সূর্য উঠল। ভোরের রোদে চারদিক দেখা যাচ্ছে। আলফানসো মাথা ঘুরিয়ে দেখল; ওর মাথার কাছে একজন জলদস্যু উবু হয়ে পড়ে আছে। আলফানসো বেশ কষ্টে উঠে এগিয়ে গেল। দস্যুবন্ধুকে ধরে তুলল। বন্ধুটি আলফানসোকে চোখ খুলে দেখল। তারপর হাসল। উঠে বসল।
আলফানসো বলল, “এখানে শুয়ে থেকে কী হবে?’চলো খাবার-টাবার পাওয়া যায় কিনা দেখি।” বন্ধুটি উঠে দাঁড়াল। চলল ঢালু তীরের মাটির দিকে। আলফানসো চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। অন্য কোনও জলদস্যুকে দেখতে পেল না। ওখানে উঠে দেখল জঙ্গল সামনে। জনবসতি দেখল না। হয়তো জঙ্গল পার হতে পারলে লোকালয় পাওয়া যাবে।
দু’জনে জঙ্গলে ঢুকল। খুব ঘন বন নয়। ছাড়া ছাড়া গাছপালা। তারই মধ্যে দিয়ে দু’জন চলল। কিছুদূর যাওয়ার পরই বনজঙ্গল শেষ। একটা জলা জায়গা। দূরে দেখা যাচ্ছে একটা টিলা। হয়তো ওখানে মানুষের বসতি আছে। এই ভেবে আলফানসো জলদস্যু বন্ধুকে বলল, “ওই টিলাটা লক্ষ্য করে চলো। দেখা যাক লোকজনের বসতি পাওয়া যায় কিনা।”
দু’জনে জলা জায়গাটায় নামল। জল তেমন বেশি নয়। নিচটা কেমন যেন পেছল পেছল। ওরা পা দিয়ে জল ঠেলে ঠেলে চলল।
হঠাৎ বন্ধুটি বলে উঠল, পায়ে কী যেন লেগেছে। আলফানসো নিচু হয়ে দেখল দুটো আঙ্গুলের মতো মোটা জোঁক। বন্ধুটির পা কামড়ে ধরে আছে। রক্ত বেরোচ্ছে। আলফানসো চিৎকার করে বলল, “পালাও।” দু’জনে ছুটে চলল জলাভূমিটা পার হতে। বন্ধুটি পারল না। প্রচুর রক্তক্ষরণের জন্যে বন্দুটির শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ও পিছল মাটিতে ছুটতে পারল না। পা পিছলে পড়ে গেল। আলফানসো তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। ও বুঝতেও পারে নি যে বন্ধুটি পা পিছলে পড়ে গেছে।
জলাভূমির পরেই পাথুরে ডাঙা। আলফানসো ডাঙায় উঠে নিশ্চিন্ত হল। ভয়ে ও তখন কাঁপছে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল বন্ধুটি জলায় পড়ে আছে। আলফানসো তখন মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে হঠাৎ ওর বাঁ পায়ের গোড়ালিটা সুড়সুড় করে উঠল। আলফানসো তাকিয়ে দেখল একটা একবিঘত লম্বা জোঁক গোড়ালিতে কামড় বসাবার চেষ্টা করছে। আলফানসো এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। বারকয়েক পা ছুঁড়ে জোঁকটাকে ফেলবার চেষ্টা করল। জোঁক লেগে রইল। তখনও কামড় বসাতে পারেনি। আলফানসো একটা পাথরের বড় টুকরো তুলে নিল মাটি থেকে। তারপর জোঁকটার মাথায় পাথরটা ঠুকতে লাগল। কয়েকবার ঠোকার পরও জোঁকটা খসে পড়ল না। আলফানসো আবার ঠুকতে লাগল। ওর গোড়ালির ওই জায়গাটা ঘেঁচে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। গোড়ালি ব্যথায় টনটন করতে লাগল। একটা জোরে ঘা মারতে জোঁকটা খসে পড়ল। আলফানসো সঙ্গে সঙ্গে এই জায়গা ছেড়ে দ্রুত ছুটল। আর এক মুহূর্তও এখানে নয়।
আলফানসো মাটিতে শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে বিশ্রাম করল কিছুক্ষণ।
তখন বেলা হয়েছে। আলফানসো উঠে দাঁড়াল। খাদ্য চাই, আশ্রয় চাই। ও টিলাটার দিকে চলল। টিলাটার কাছাকাছি পৌঁছে দেখল টিলাটার নিচে একটা বাড়ি। বাড়িটার থামগুলো কাঠের তৈরি। দেওয়ালগুলো চুনাপাথরের, চাল খড়ের। বাড়ির দেওয়ালে নানারকমের কারুকাজ–গাছ, ফুল, লতাপাতা আঁকা। বাড়ির লোকেরা আলফানসোকে কৌতূহলী চোখে দেখতে লাগল। একজনকে বাড়ির মালিক বলে আলফানসোর মনে হল। মালিক আলফানসোর দিকে এগিয়ে এল। তলতেক ভাষায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে? এখানে কী করে এলে?” আলফানসো সেই কথা কিছুই বুঝল না। ও স্পেনীয় ভাষায় বলল–“এই জায়গাটার নাম কী?” লোকটিও কিছুই বুঝল না। আলফানসো আকার ইঙ্গিতে বোঝাল জায়গাটার নাম কি? লোকটা আন্দাজে বুঝল। বলল, “তুলাম।” চারপাশের আরও কয়েকটা বাড়ি থেকে লোকজন বেরিয়ে এল। আলফানসোকে প্রায় ঘিরে ধরল। আলফানসো ভাবল বলে জাহাজডুবি হয়ে ও এখানে এসেছে। সঙ্গের বন্ধু জোঁকের কামড়ে মারা গেছে। আমার পোশাক এখনও ভিজে। খিদেও পেয়েছে। আলফানসো হাত পা নেড়ে মুখের চোখের ভঙ্গি করে এসব বোঝাতে চাইল। দেখল কিছু লোক মোটামুটি বুঝেছে। ওরা কয়েকজন। ছুটে নিজেদের বাড়িতে গেল। একটু পরেই ওরা গতরাতের বাড়তি খাবার নিয়ে এল চিনেমাটির পাত্রে। একজন একটা জলের পাত্রে ভরা জল নিয়ে এল। দু’জন ঝোলা জোব্বা নিয়ে এল। প্যান্টের মতো পোশাকও নিয়ে এল।
