দেখা গেল আলফানসোদের প্রায় অর্ধেক জাহাজি দস্যুদলে ঢুকল।
দস্যুসর্দার বলল, “সামনে যে বন্দর পড়বে সেখানে এই জাহাজের সব মালপত্র বিক্রি করা হবে। অবশ্যই জলের দামে। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি অর্থের প্রয়োজন। তারপর অর্থ ভাগ বাটোয়ারা হবে। আমাদের সময় কম।”
এবার জলদস্যুসর্দার জলদস্যুদের দিকে তাকিয়ে বলল, “যাও, এই জাহাজে যা # পাও লুঠ করে আমাদের জাহাজে নিয়ে যাও।”
জলদস্যুরা আলফানসোদের জাহাজে তল্লাশি শুরু করল। পেল প্রচুর ভেড়ার। চামড়া, আয়না, আলকাতরা। সব মাথায় করে নিয়ে ওদের জলদস্যুদের জাহাজে নিয়ে গেল। যারা জলদস্যুদের দলে যাবে বলে হাত তুলেছিল তারা সবাই ওই জাহাজে চলে গেল। আলফানসোও গেল। জলদস্যুদের জাহাজ আস্তে আস্তে সরে গেল। তারপর সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল দক্ষিণমুখো।
লুঠ হয়ে যাওয়া জাহাজের ক্যাপ্টেন জাহাজ চালককেউত্তর দিকে জাহাজ চালাতে বলল।
জলদস্যুদের জাহাজে আলফানসোর নতুন জীবন শুরু হল। জলদস্যুদের খুব নিয়ম মেনে চলতে হয়। এদিক ওদিক হলে চাবুক মারা হয়। কখনও বা একেবারে মেরে ফেলা হয়। তাই সবাই সর্দারের হুকুম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। দিন আট দশের মধ্যেই আলফানসো সুস্থ হল। ওর চিকিৎসা করল জলদস্যুদলের বৈদ্য। কয়েকদিন পরে আলফানসোদের জাহাজ থেকে দেখা গেল একটা জাহাজ আসছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যাত্রিবাহী জাহাজ। জাহাজের মাথায় উড়ছে ফরাসি দেশের পতাকা। আলফানসোদের জাহাজ ছুটল ওই জাহাজের দিকে। ততক্ষণে আলফানসোদের জাহাজের মাথা থেকে নরওয়ে দেশের পতাকা নামিয়ে জলদস্যুদের মড়ার খুলি আর মানুষের হাড় আঁকা কালো পতাকা তুলে দেওয়া হল। যাত্রীবাহী জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে চিৎকার আর কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। নির্মম জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পেতে গেলে সব সোনাদানার, হীরে-জহরতের গয়নাগাঁটি ওদের দিয়ে দিতে হবে। না দিতে চাইলে তরোয়ালের ঘায়ে মরতে হবে।
তখন দুপুর। সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যাত্রীবাহী জাহাজটার চালক জাহাজের গতি বাড়িয়ে দিল। কিন্তু জলদস্যুদের জাহাজচালক অনেক অভিজ্ঞ ওস্তাদ। ও ওদের জাহাজটা বড় করে একটা পাক খাইয়ে যাত্রীবাহী জাহাজটার সামনে চলে এল। জাহাজটা নিয়ে এল যাত্রিবাহী জাহাজটার গায়ে। দলে দলে জলদস্যুরা খোলা তরোয়াল হাতে উঠে পড়তে লাগল যাত্রিবাহী জাহাজটাতে। শুরু হল তরোয়ালের লড়াই। যাত্রীবাহী জাহাজের প্রহরীরা যা লড়তে লাগল। যাত্রীরা তত দক্ষ নয় তরোয়াল চালনায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রিবাহী জাহাজের যাত্রীরা হার স্বীকার করল।
জলদস্যুরা আহত সঙ্গীদের নিজেদের জাহাজে নিয়ে গেল। উভয়পক্ষেরই যারা লড়াইতে মারা গেল তাদের সমুদ্রের জলে ফেলে দেওয়া হল।
এবার জীবিত যাত্রীদের ডেকে দাঁড় করানো হল। একপাশে মহিলা যাত্রীরা। অন্যদিকে পুরুষ যাত্রীরা।
সেই জাহাজে জলদস্যুসর্দার উঠে এল। হো হো করে কিছুক্ষণ হাসল। তারপর বলল, “এইসব লড়াইটড়াই বাঁচা-মরা আমার একেবারেই ভাল লাগে না।” আবার হাসল। বলল, “সবচেয়ে ভাল হয় তোমাদের কাছে মূল্যবান যা কিছু আছে আমাদের দিয়ে দাও। তাহলেই মরে যাওয়া বা ঘায়েল হয়ে যাওয়া কোনওটাই হয় না।”
“যদি আমরা সেসব না দিই?” একজন যাত্রী বলল। দস্যুসদার যাত্রীদের মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে বলল,–“কথাটা কে বলল, কে বলল?”
যাত্রীটি এগিয়ে এল। বলল–“আমি বলেছি।” দস্যুসর্দার হাসতে লাগল। হাসতে হাসতেই বলল,–“তোরা কে আছিস, এটাকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেল।” দুজন জলদস্যু ছুটে এল। যাত্রীকে চেপে ডেকে শুইয়ে দিল। তারপর একজন দু’পা আর একজন দু’হাত ধরে দোলাতে লাগল। তারপর রেলিঙ ডিঙিয়ে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলল।
যাত্রীরা আর কেউ কোনও কথা বলল না। সদার হেসে বলল–“আমি এরকমই। আমার কথা অমান্য করলে হয় তরোয়ালের ঘায়ে মৃত্যু, নয়তো সমুদ্রশয্যা। যাকগে, মহিলা যাত্রীদের বলছি আমার লোক তোমাদের কাছে একটা বড় রুমাল নিয়ে যাচ্ছে। সব গয়নাগাটি খুলে ওই রুমালে ফেলে দাও।”
মহিলাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস করল না। দু’জন জলদস্যু মহিলা যাত্রীদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর দুজনে একটা বড় নকশা আঁকা রুমাল মহিলা যাত্রীদের সামনে নিয়ে এল। মহিলারা বুঝল এই জলদস্যদের। সর্দার ওদের যে কোন সময়ে মেরে ফেলতে পারে। তারা কেউ কোন কথা বলল না। হাত গলা কানের মূল্যবান অলঙ্কার খুলে রুমালে ফেলে দিতে লাগল। সর্দার জোরে হেসে উঠে বলল, “দ্যাখো কেমন নিঃশব্দে সবকিছু ঘটে যাচ্ছে। আমি ঠিক এটাই চাই।” দস্যুসর্দার নিজের জাহাজে চলে গেল।
জলদস্যুরা পুরুষ যাত্রীদের কাছ থেকে গিনি আংটি সব নিল।
এবার জলদস্যুরা হানা দিল কেবিনঘরগুলোতে। যে যা পেল নিল। মূল্যবান সবই সর্দারের কাছে জমা দিতে হবে। কিন্তু শৌখিন পোশাক টোশাক সদার নেয় না। এগুলো দস্যুদলের প্রাপ্য।
বিকেল নাগাদ জলদস্যুদের জাহাজ ওই তল্লাট ছেড়ে চলে গেল। জাহাজের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আলফানসো সব দেখল। আলফানসো তখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। কাজেই সঙ্গীরা ওকে লড়াই করতে ডাকেনি।
আলফানসো সম্পূর্ণ সুস্থ হল। শুধু বাঁ হাতের জোরটা আগের মতো রইল না। মৃত্যুর কালো দরজা থেকে ফিরে এসেছে আলফানসো। এতেই খুশি ও।
