কিছু পরে মারিয়া ধ্বনি তুলল –ও — হো –হো। এবার ভাইকিংরা সংবিৎ ফিরে পেল। চিৎকার ধ্বনি তুলল –ও –হো –হো। ভাইকিংরা কেউ হেঁড়ে গলায় গান ধরল। কেউ নাচতে লাগল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল –ভাইসব–পরে আনন্দ করবো। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব — জাহাজ ছাড়ো। রাজা অপৰ্তো রাজা ওভিড্ডোর তরবারি আমরা পেয়েছি এটা জানলে আমরা ভীষণ বিপদে পড়ব। সবাই লেগে পড়ো। হাওয়ার তেমন জোর নেই। কিছু বন্ধু দাঁড় ঘরে যাও। দাঁড় টানো। সব পাল খুলে দাও।
ভাইকিংরা নিজেদের কাজে নামল। দ্রুত নোঙর তোলা হল। পাল খুলে দেওয়া হল। জলে উঠল ছছ দাঁড়ের শব্দ।
জাহাজ শান্ত সমুদ্রে ছোটো ছোটো ঢেউ চলল পূর্ণ বেগে।
চিচেন ইতজায় ফ্রান্সিস
একটা নিঃসঙ্গ জাহাজ চলেছে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে। জাহাজটা স্পেনীয় জলদস্যুদলের জাহাজ।
সূর্য অস্ত গেছে বেশ কিছুক্ষণ। এখন অন্ধকার রাত্রি। আকাশে উজ্জ্বল তারার ভিড়। অমাবস্যার কাছাকাছি। কাজেই অন্ধকার চারদিক।
জলদস্যুদের মধ্যে আলস্য। আলফানসো এই জলদস্যুদের দলে ভিড়তে বাধ্য হয়েছে। আলফানসো একটা পোর্তুগিজ জাহাজে চড়ে যাচ্ছিল দক্ষিণদিকের কোনও দেশের দিকে। ওর যাওয়াটা উদ্দেশ্যহীন। দেশে থাকতে ও ছিল খুবই গরিব চর্মকার। হাড়ভাঙা খাটুনি। কিন্তু রোজগারে সংসার চলে না। তাই আলফানসো অনেক ভেবে ঠিক করল সুদূর দক্ষিণ দিকে এমন কিছু দেশ আছে যেখানে সোনা দিয়ে তৈরি সাঁকো আছে। সে দেশের সর্বত্র সোনার ছড়াছড়ি। লোকমুখে শোনা এই স্বর্ণসাম্রাজ্যের কাহিনী কতটা সত্য ও জানে না। কিন্তু এই সোনার হাতছানিতে ও দেশ ঘরবাড়ি ছেড়ে দক্ষিণমুখো যাচ্ছে এমন একটা জাহাজে উঠে বসল। যে করেই হোক সেই স্বর্ণসাম্রাজ্যে পৌঁছতে হবে।
আলফানসো জাহাজের ডেকে শুয়ে ছিল। অন্ধকার নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে ও নিজের ভবিষ্যতের কথাই ভাবছিল।
হঠাৎ কানে এল মাস্তুলের ওপর বসে থাকা নজরদারের চিৎকার, “সাবধান জলদস্যুদের জাহাজ, সাবধান, সবাই তৈরি হও।”
জাহাজে সাড়া পড়ে গেল। সবাই ছুটল নীচের অস্ত্রঘরের দিকে। তরোয়াল হাতে ওরা দল বেঁধে ডেকে উঠে এল। জলদস্যুদের জাহাজটা তখনই আলফানসোদের জাহাজের গায়ে এসে ধাক্কা দিল। খোলা তরোয়াল হাতে চিৎকার করতে করতে জলদস্যুরা আলফানুসোদের জাহাজের ডেকে উঠে আসতে লাগল। শুরু হল তরোয়ালের লড়াই। জলদস্যুরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। ওদের মনে দয়ামায়ার স্থান নেই। নির্মম নৃশংস ওরা।
তরোয়ালের ঠোকাঠুকির শব্দ, আহতদের আর্তনাদ গোঙানির শব্দে জাহাজ ভরে উঠল।
আলফানসোও তরোয়াল নিয়ে লড়াই করছিল এক জলদস্যুর সঙ্গে। হঠাৎ ওই জলদস্যু ওর তরোয়ালে নিজের তরোয়ালটার এত জোরে ঘা মারল যে আলফানসোর। তরোয়ালটা হাত থেকে ছিটকে গেল। অন্ধকারেও আলফানসো দেখল জলদস্যুটা দাঁত বের করে হাসছে। নিরস্ত্র আলফানসোর মাথা লক্ষ্য করে তরোয়ালটা চালাল জলদস্যুটা। আলফানসো দ্রুত মাথা নিচু করল। তরোয়ালের কোপ পড়ল বাঁ কাঁধে। আলফানসো বাঁ কাঁধে ডান হাত চাপা দিয়ে বসে পড়ল। জলদস্যুটা অবশ্য ততক্ষণে আলফানসোদের এক নাবিকের তরোয়ালের ঘায়ে ডেকে ছিটকে পড়েছে। আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না।
আলফানসো আস্তে-আস্তে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে নিজেদের কেবিনঘরে ফিরে এল। ততক্ষণে লড়াই থেমে গেছে। দু’পক্ষেরই আহতদের আর্তনাদে গোঙানিতে চারদিক ভরে উঠেছে।
আলফানসোদের জাহাজের যাত্রী নাবিকরা লড়াইয়ে হেরে গেল।
জলদস্যুরা আহত যাত্রীদের নাবিকদের রেলিঙের ওপর দিয়ে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। ওরা নিজেদের দলের মৃত লোকদেরও জলে ছুঁড়ে ফেলল।
পূবদিকের আকাশে কমলা রঙ ছড়াল। কিছুক্ষণ পরেই সূর্য উঠল। ভোরের নিস্তেজ রোদ ছড়ালো সমুদ্রের জলে জাহাজে।
এবার জলদস্যুদের দলপতি আলফানসোদের জাহাজে উঠে এল। মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ। বেশ তেল চকে। মোম দিয়ে গোঁফের ডগা উঁচলো করা। গায়ে দামি কাপড়ের জোব্বামতো। কোমরে চামড়ার মোটা বল্টের মতো একটা জিনিস। তাতে তরোয়াল ঝুলছে। তরোয়ালের বাঁট হাতির দাঁতের।
এসেই হুকুম দিল, “এই জাহাজে যারা বেঁচে আছে তাদের আমার কাছে নিয়ে এসো।” জলদস্যুরা খুঁজে খুঁজে জীবিত ও আহত মিলিয়ে প্রায় তিরিশজনকে দস্যুদলপতির সামনে নিয়ে এল। তার মধ্যে আলফানুসোও ছিল। জলদস্যুপতি বলল, “তোমাদের আর হত্যা করা হবে না। আহতদের চিকিৎসা করে সুস্থ করা হবে। আমার দলে এখন বড় লোকাভাব। তোমরা আমার দলে আসবে। আমার আদেশমতো চলবে। ডাকাতি করে লুঠপাট করে যা পাব তার ভাগ লেমরাও পাবে।”
এসময় আলফানসোদের জাহাজের ক্যাপ্টেন এগিয়ে এল। বলল, “আমরা যদি তোমার দলে যোগ না দিই?”
“তাহলে সবাইকে মরতে হবে।” জলদস্যুসর্দার বলল।
“আমরা মরব তবু জলদস্যুতা করব না।” ক্যাপ্টেন বলল।
দস্যুসর্দার হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “মিছিমিছি কেন মরতে যাবে। তার চাইতে আমার দলে এলে সবকিছু পাবে আবার নগদ অর্থও পাবে।”
“না, আমরা তোমার দলে যাব না।” ক্যাপ্টেন বলল।
“তাহলে তো তোমাদের এখন মেরে ফেলতে হয়। খুব বাজে কাজ। আমি এসব নরহত্যা-ত্যা একেবারেই পছন্দ করি না। কিন্তু উপায় নেই। কখনও লোকের ঔদ্ধত্য দেখলে হত্যা করতেই হয়।” একটু থেমে দস্যুসর্দার বলল, “এবার তোমরা কে কে আমার দলে আসতে চাও হাত তুলে দাঁড়াও।” অনেকেই হাত তুলে জলদস্যুদের সর্দারের দিকে এগিয়ে গেল। তাদের মধ্যে আহত আলফানসোও আছে। ও বেশ ভেবেই দস্যুদলে যোগ দিতে রাজি হল। বাড়ি ফিরলে তো সেই অভাব, অনটন, উপবাস। তার চেয়ে জলদস্যুদের দলে যাওয়া অনেক ভাল। খেতে পরতে পাবে। লুটের মালের বিক্রির ভাগের অর্থ ঋবে। বেশ সুখেই দিন কাটবে।
