অল্পক্ষণের মধ্যেই গুহার মুখে এসে পৌঁছল। চাঁদের আলো তো গুহার ভেতরে ঢোকে নি। তাই অন্ধকার ভেতরটা। শাঙ্কো বলল– দাঁড়াও। আমি ঢুকছি।
শাঙ্কো বুকের পোশাকের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা তুলে নিল। ডানহাতে ছোরাটা ধরে আস্তে আস্তে অন্ধকার গুহাটায় ঢুকতে লাগল। একটু দূর পর্যন্ত মোটামুটি দেখা গেল। তাপরই একেবারে অন্ধকার। তার মধ্যে দিয়ে দুজনে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল।
গুহার মুখটাতে পাথরের টুকরো ছিল। ভেত্রটা মোটামুটি পরিষ্কার। আবার কিছুটা যেতেই শাঙ্কো বলল- ফ্রান্সিস এখানেই গুহা শেষ। ফ্রান্সিস হাত দিয়ে পাথুরে দেওয়ালটা পেল। দেওয়ালটায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কোষের পাথুরে দেওয়ালটা দেখল। না –দেওয়ালে মাত্র দুটো খোদল মতো। খোঁদলে হাত দিল। ফঁকা। কিছু নেই। ফ্রান্সিস বলল –শাঙ্কো –অন্ধকারে বিশেষ কিছু দেখা যাবেনা। কাল সকালে যদি সময় পাই আসবো। চলো।
দুজনে অন্ধকারে আস্তে আস্তে গুহার মুখে চলে এল। গুহার মুখ থেকে জোছনা পাওয়া গেল। নামতে লাগল দুজনে। টিলা থেকে নামল। বুনো চেস্টনাট গাছের জঙ্গলে ঢুকল।
জোছনা উজ্জ্বল। তাই সবকিছুই মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দুজনে মরা গাছটা খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল।
-শাঙ্কো– তুমি তো আগে এসেছিলে। বেলচা এনেছিলে?
–এনেছিলাম। কিন্তু রাজা অপৰ্তোর সৈন্যদের হাতে প্রায় ধরা পড়েছিলাম। তখন বেলচা এনেছিলাম। পালাবার আগে বেলচাটা ঐ কোষটায় ফেলে গেছি। দেখি খুঁজে। শাঙ্কো সেদিকেচলল। ঝোপে খুঁজতে খুঁজতে বেলচাটা পেল। তুলে আনল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এল। তারপর সেই বৃদ্ধ কবিরাজের কথা বলল। ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্য হল।
শাঙ্কো মরা গাছটার গোড়ায় বেলচা দিয়ে মাটি তুলতে লাগল। কিছুক্ষণ মাটি তোলার পর গাছের গোড়াটা বেরিয়ে এল। দুজনেই আশ্চর্য হল। দেখল শেকড়। ফ্রান্সিস বলল
–নকশাতেও শেকড় আঁকা আছে।
গাছটার গোড়া অনেকটা আলগা হল। দুজনে মিলে গাছটাতে কাত করল এপাশে। তারপর ওপাশে। গাছটা মাটি থেকে আলগা হয়ে গেল। এবার দুজনে মিলে গাছটাকে টানতে লাগল। আস্তে আস্তে গাছটা উঠে এল। গাছটা পাশে রেখে দিয়ে এবার যে গর্তটা হয়েছিল সেটা দেখতে লাগল ফ্রান্সিস। ও ভাবল- সোনার বারি কি এখানেই আছে? ফ্রান্সিস বলল শাঙ্কো– তোমার কী মনে হয়? সোনার তরবারি কি এখানেই আছে?
–ফ্রান্সিস– গর্তটা আরো নিচে বাড়ানো যাক। আরও নীচে কী আছে দেখা যাক।
–ঠিক বলেছো। চলো গর্তটা নিচের দিকে বাড়াই।
শাঙ্কো বেলচা দিয়ে মাটি তুলতে লাগল। একটু পরে ফ্রান্সিস বেলচা চালাতে লাগল।
হঠাৎ একটা মৃদু শব্দ হল — টং। ধাতব শব্দ। ফ্রান্সিস বলে উঠল — শাঙ্কো– নিশ্চয়ই তরবারিটা। আরো খুঁড়তে হবে। এবার শাঙ্কো বেলচাটা নিল। খুঁড়তে লাগল। একটা হাতল বেরিয়ে এল।
শাঙ্কো গর্তে নেমে হাতলটা ধরল। চাঁদের আলোয় দেখাই যাচ্ছে সোনার হাতল। শাঙ্কো হাতলটা ধরে টানতে লাগল। খাপের মধ্যে রাখা বোধহয়। শাঙ্কো ভাবল।
ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো আমাকেও টানতেদাও। দেখাই যাচ্ছে সোনারহাতল। ফ্রান্সিস নামল। হাতলটা ধরে প্রাণপণে টানতে লাগল। তলোয়ারটা যেন অনেকটা নড়ল। ফ্রান্সিস আবার দুটো হ্যাঁচকা টান দিল। তরবারি উঠে এল চাঁদের আলোতেই তলোয়ারটা ঝিকিয়ে উঠল। নিরেট সোনায় তৈরি তরবারি। ফ্রান্সিসমৃদুস্ফরে ধ্বনি দিল –হোহোহো। শাঙ্কোও চাপা গলায় ধ্বনি তুলল–ও– হো- হোহাত সাতেক লম্ফা তরবারিটা।
তরবারিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো–এবার খাপটা তুলতে হবে।
ফ্রান্সিস উঠে এল। শাঙ্কো নামল। মাটি সরাতেই দেখা দেখা খাপটা। শাঙ্কো খাপটা বার কয়েক এদিক ওদিক সরাতেই খাপটা বেশ আলগা হল। শাঙ্কো খাপ ধরে বারকয়েক হ্যাঁচকা টান দিতেই খাপটা উঠে এল।
চাঁদের আলোয় ওরা দেখল এক আশ্চর্য সুন্দর তলোয়ারের খাপ। সোনার ওপর কত মণিমাণিক্য বসানো। সুন্দর মিনেকরা। চাঁদের আলোয় সব মণিমাণিক্যগুলো এখানে ওখানে ঝিক দিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো এরকম গুপ্তধন আগেও উদ্ধার করেছে। এসব ওদের চোখ সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এরকম সূক্ষ্ম কারুকাজ করা তরবারির খাপ ওরা আগে কখনও দেখে নি।
ফ্রান্সিস বলল—শাঙ্কো পালাও। আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা চলবে না। জলদি। ভারি তরবারটা ফ্রান্সিস নিল। খাপটা শাঙ্কো কাঁদে নিল।
বুনো চেস্টনাট গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটে থেমে ওরা দুজনে বেরিয়ে এল জঙ্গল থেকে। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। আকাশ সাদাটে। সদর রাস্তায় ওঠার আগে পশ্চিমদিকে তাকিয়ে দেখল। না–কোনো সৈন্য নেই। দুজনে দ্রুত সদর রাস্তাটা পার হল। তারপর চলল নৌকোর খোঁজে। বালিয়াড়িতে তুলে রাখা নৌকাটার কাছে এল। প্রায় ছুটে আসতে হয়েছে। দুজনেই হাঁপাচ্ছে তখন।
দুজনে নৌকোয় উঠল। ফ্রান্সিস দাঁড় টানতে লাগল।
সূর্য উঠল। আলো ছড়িয়েপড়ল। যে তিন-চারজন ভাইকিং ডেকে দাঁড়িয়েছিল তারা ফ্রান্সিসদের দেখল। চেঁচিয়ে বলে উঠল—ফ্রান্সিস শাঙ্কো এসেছে। ডেক-এ হ্যারি আর মারিয়া এসে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো হালের কাছে এল। বন্ধুরা ওপর থেকে দড়ির মইটা ঝুলিয়ে দিল। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো ওপরে উঠে এল। বন্ধুদের চেঁচামেচি থেমে গেল। ওরা তখন নির্বাক। দেখলে লাগল তরবারিটা আর তার খাপ। রোদ লেগে তরবারির খাপে বসানো হীরে মুক্তো চুনিপান্না থেকে আশ্চর্য আলোর ঝলকানি দেখা গেল। সোনার তরবারি রোদে ঝলসে উঠল। কারও মুখে কথা নেই।
