দেওয়ালে একটা কাঠের দরজা। তার মানে এদিক দিয়ে রাজবাড়ির অন্দরমহলে যাওয়া যায়। ফ্রান্সিস বুঝল দেওয়াল টপকে ভেতরে যেতে হবে। তারপরমারিয়াকে খোঁজা।
ফ্রান্সিস দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। কাঠের দরজার গায়ে চ্যাপ্টা লোহার দণ্ড। ফ্রান্সিস দরজার ওপরের দিকে তাকাল সহজেই ওঠা যাবে।
এবার ফ্রান্সিস লোহার চ্যাপ্টা দণ্ডগুলোর ওপর পা রেখে রেখে দরজার মাথায় উঠে এলো। তারপর দরজার ওপাশে লোহার চ্যাপ্টা দণ্ডগুলোর ওপর পা রেখে রেখে নীচে চলে এলো। একটু হাঁপচ্ছিল ফ্রান্সিস। দরজাটায় ভিতর থেকে তালা লাগানো। চাবিটা তালাটার ফুটোয় লাগানো। ফ্রান্সিস তালাটা খুলে ফেলল।
এবার চলল অন্দরমহলের দিকে। দেখল প্রথম দরজাটা কাঠের। ফ্রান্সিস দরজাটা ধরে আস্তে টানল কয়েকবার। এবার ভেতর থেকে তালা লাগানো।
ফ্রান্সিস এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে দেখল বেশ কটা জানালা আছে। একটা জানালার কাছে এলো। জানালায় লোহার কাজ করা। জানালাটা কাঠের। ফ্রান্সিস জানালাটা ধরে আস্তে চাপ দিয়ে নিজের দিকে টানল। জানালার পাল্লা খুলে গেল। আর কোনো বাধা নেই। ফ্রান্সিস জানালার ভোলা পাল্লা ধরে এক লাফে জানালাটায় উঠল। তারপর পা বাড়িয়ে নিঃশব্দে ঘরটায় নামল। মোমের আলোয় দেখল–রাজবাড়ির পরিচারিকারা ঘুমিয়ে আছে।
যাতে কোনো শব্দ না হয় ওদের ঘুম না ভাঙে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঘরটা পার হল। দরজার কাছে এলো। পরিচারিকাদের সঙ্গে এখানে মারিয়া থাকবে না, নিশ্চয়ই মারিয়াকে আলাদা ঘর দেওয়া হয়েছে।
দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখল বাঁদিকে টানা বারান্দার মতো চলে গেছে। দুদিকে পরপর ঘর।
ফ্রান্সিস পরের ঘরটায় ঢুকল আরো কয়েকজন পরিচাকি ঘুমিয়ে আছে। মারিয়া এখানে নেই।
এবার অন্য ঘরটায় ঢুকল। পরিপাটি সাজানো গোছানো ঘর। মাঝখানে একটা অবশ্য বড়ো খাট। দেখল রানি ঘুমিয়ে আছে। বাতাসে সুগন্ধ। একটা কাঁচটকা মৃদু আলো। ঘরটা শুধু রানিরই।
পরের ঘরটা দেখল–বেশ সাজানো গোছানো। কাঁচে ঢাকা আলো জ্বলছে। রানির সহচরীদের সঙ্গে মারিয়া ঘুমিয়ে আছে।
ফ্রান্সিস এতক্ষণে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে পা ফেলে মারিয়ার কাছে এলো। আস্তে কাঁধে ধাক্কা দিল। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। অল্প আলোয় ফ্রান্সিসকে দেখল। দ্রুত উঠে বসল। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে দরজাটা দেখাল। মারিয়া উঠে দাঁড়াল। পোশাক গুছিয়ে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। দুজনে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
এবার মারিয়াই পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।
রাজবাড়ির পেছনের দরাজাটার কাছে এলো। দরজায় তালা ঝুলছে। মারিয়া তাড়াতাড়ি পাশে রাখা একটা কাঠের বাক্সে হাতে ঢুকিয়ে খুঁজে বলল–চাবিটা নেই। কয়েকদিন আগেদুজন পরিচারিকা রাতে এই দরজা খুলে পালিয়েছে। তাই এত কড়াকড়ি।
–ঠিক আছে। দেওয়াল ডিঙিয়ে যাব। এসো।
ফ্রান্সিস নিচু হয়ে দুটো হাত বাড়িয়ে বলল হাত দুটোয় দু’পা রাখো। মারিয়া কোনোরকমে দুটো হাতে পা রাখল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে তুলতে লাগল। বলল-দরজাটায় ভর রাখো।
একটু পরেই মারিয়া দরজার ওপরে উঠে এলো। এবার ফ্রান্সিস দরজায় পা রেখে দরজার ওপরে উঠল। তারপরে অনুজ্জ্বল জোৎস্নায় দেখল দরজার গায়ে চ্যাপ্টা লোহা লাগানো। ফ্রান্সিস বলল–ওগুলোর ওপর পা দিয়ে নেমে আসবে। আমি দাঁড়াচ্ছি।
ফ্রান্সিস নামল। এবার দু হাত বাড়িয়ে বলল-নেমে এসো। মারিয়া পা রেখে নামল কিছুটা। তারপরেই নামতে গিয়ে পা পিছলে গেল। মারিয়া পড়ে যাচ্ছিল। ফ্রান্সিস নীচে থেকে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। মারিয়া আস্তে অস্তে নেমে এলো।
দুজনে নেমেই ছুটল। রাজার বাড়ির এলাকা থেকে সদর রাস্তায় এসে উঠল।
এবার ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। দুজনেই হাঁপাচ্ছেতখন। ফ্রান্সিস বলল–এখন দৌড়ে • যাওয়া ঠিক নয়। একে তো আমরা বিদেশি তার ওপর দৌড়ে যাচ্ছি দেখলে যে কারো সন্দেহ হবে। আমরা বিপদে পড়বো। অর্থাৎ আবার কয়েদঘর।
এবার দুজনে হটাতে লাগল জাহাজঘাটার দিকে।
একটু পরে পুব আকাশে থালার মতো কমলা রঙের সূর্য উঠল। চারদিকে আলো ছড়াল।
ফ্রান্সিস দূর থেকে দেখল কয়েদখানার দুই রক্ষী আসছে। ও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। চাপাস্বরে বলল–তুমি আমার কাছে থেকে সরে যাও। দুই রক্ষী।
মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল। কিন্তু ফ্রান্সিসরা ধরা পড়ে গেল। সৈন্য দুজন ছুটতে ছুটতে এলো৷ ফ্রান্সিস বুঝতে পারলো পালানো যাবেনা। ও দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজে পালাতে পারতো। তাহলে মারিয়াকে ধরতো ওরা। তাহলে ফ্রান্সিস দারুণ সমস্যায় পড়তো।
রক্ষী দুজন ফ্রান্সিস আর মারিয়ার কাছে এলো। একজন রক্ষী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–তোমরা দুজন কয়েদ খাটছিলে।
–হ্যাঁ। তাতে কী হল? ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা পালিয়েছিলে। রক্ষী বলল।
–আমি পালাই নি। রানি আমাকেঅন্দরমহলে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। মারিয়া বলল।
–বেশ। কিন্তু তুমি? রক্ষী ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল।
–হ্যাঁ আমি পালিয়েছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন পালিয়েছিলে? রক্ষী বলল।
–সে তুমি বুঝবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–যাগ গে–তোমরা দুজনেই কয়েদখানায় চলো। একজন রক্ষী বলল।
–আমরা যাবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–তহালে তলোয়ারের ঘা খেয়ে মরবে। অন্য রক্ষীটি বলল।
