সকালের খাবার খেয়ে মারিয়া একজন প্রহরীকে কারার অধ্যক্ষের কাছে পাঠাল। বলল-বলো তো–আমি রানির সঙ্গে কথা বলতে যাবো। প্রহরীটি চলে গেল।
একটু পরেই কারা অধ্যক্ষমশাই প্রায় ছুটতে ছুটতে এলো। বলল কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?
ব্যাপার তেমন কিছু নয়। আমি রানির সঙ্গে দেখা করবো। আপনি কোনো প্রহরীকে আমার সঙ্গে পাঠান। মারিয়া বলল।
নিশ্চয়ই নিই। কিন্তু আমার একটা কথা ছিল। কারাঅধ্যক্ষ বলল।
কী কথা। কারাঅধ্যক্ষ বলল। রানি যদি জানতে চান আমি কারাঅধ্যক্ষের কাজ কেমন করছি তাহলে অবশ্যই আমার কাজের প্রশংসা করবেন।
–আপনি মিছি মিছি ভয় পাচ্ছেন। মারিয়া বলল।
না–না। আমার কথা উঠলে অবশ্যই বলবেন। কারাঅধ্যক্ষ বলল।
–ঠিক আছে, বলবো। এখন কোনো প্রহরীকে পাঠান। মারিয়া বলল।
–আমি এক্ষুণি পাঠাচ্ছি। কারাঅধ্যক্ষ বলল। তারপর হাততালি দিয়ে একজন প্রহরীকে ডাকল। প্রহরীটি এলো।
–তুমি রাজবাড়ি যাও। অন্দরমহলে কোনো পরিচারিকাকে দিয়ে রানিকে বল যে বন্দিনী ভাইকিং রাজকুমারী রানির সঙ্গে দেখা করতে চান। যাও কারা অধ্যক্ষ বলল।
প্রহরীটি রাজবাড়ি গেল। ওখানকার এক প্রহরীকে বলল
–ভাই রানিকে একটা খবর পাঠাও।
–কী খবর?
–বল যে কয়েদঘরে বন্দিনী রাজকুমারী রানির সঙ্গে দেখা করতে চান।
–বেশ। প্রহরীটি চলে গেল।
কিছু পরে প্রহরটি ফিরে এলো। বলল রানিমা রাজকুমারীকে দেখা করবার অনুমতি দিয়েছেন।
তখন বেলা পড়ে এসেছে। একজন পরিচারিকা এলো। কারাঅধ্যক্ষ পরিচারিকাকে দেখে আসন থেকে লাফিয়ে উঠল। বলল–রানিমা কি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন?
না। রাজকুমারীকে নিয়ে যেতে বলেছেন।
–ও। তাহলে আমার কথা কিছু বলেনি। পরিচারিকাটি বলল–না।
–ও। কারাঅধ্যক্ষ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে এলো। একজন প্রহরীকে ইঙ্গিতে বোঝাল দরজা খুলে দাও।
প্রহরীটি দরজা খুলে দিল। মারিয়া দরজার কাছে এসে পিছু ফিরে ফ্রান্সিসকে বলল তুমি দুশ্চিন্তা করো না। আমি ভালোই থাকবো।
পরিচারিকার সঙ্গে মারিয়া কারাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো।
এবার ফ্রান্সিস পালাবার পরিকল্পনা করতে বসল। শুকনো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। রানি মারিয়াকে অন্তঃপুরে থাকতে বলবেন কিনা তার ঠিক নেই। দেখা যাক রানি কী করেন?মারিয়াকেমহলে থাকতে বলবেন না কয়েদঘরে ফেরৎ পাঠান। আজকের রাতটা থাক। কালকে রাতে খাওয়ার পর পালাবো।
রাতটা কাটল। ফ্রান্সিস ভালো করে বুঝতে পারেনি। অনেক চিন্তা মাথায়। হ্যারিরা কোথায় আছে? ওরা কি রাজা অপৰ্তোর রজ্যেই থেকে গেছে না এই ভিগোনগরে এসেছে। একটা স্বস্তি–হ্যারিরা কেউ এখানে কয়েদঘরে বন্দী হয়ে নেই। ওরা মুক্ত।
সন্ধের কিছু পরেই ফ্রান্সিস একজন প্রহরীকে ডাকল। বলল, আমাকে একটু তাড়াতাড়ি যেতে দেবে। প্রহরীটি একটু রসিকতা করে বলল–কেন? কেন নাচগানের আসরে যাবেন।
না আমি কয়েদঘরের বাইরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবেন এখান থেকে বেরুতে? প্রহরীটা বলল।
–অনায়াসে। আমার ছক ভাবা হয়ে গেছে। এখন কাজে নামা। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল, পালানো আর তার পরের কাজগুলো ভাবতে লাগল। সবচেয়ে মুশকিল হবে মারিয়াকে অন্দরমহল থেকে বাইরে নিয়ে আসা। তার জন্যে কী করতে হবে সেসব ভাবতে লাগল।
ঢং ঢং-প্রহরী দরজা খুলে খাবার আনল। দরজাটা আধ ভেজানো। ফ্রান্সিস আর চোখে দেখল–দুজন ঘরে ঢুকছে দুজন ঘরের বাইরে পাহারা দিচ্ছে।
হঠাৎফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়িয়েই মাটির ভাড় রাখা তরকারি ঝোলটা একজন প্রহরীর মুখে চোখে ছিটিয়ে দিল। প্রহরীটি মেঝেয় পড়ে গেল। এবার যে প্রহরীটা কাটা রুটি কাঠের খালায় নিয়ে আসছিল সেই থালাটা তুলে ফ্রান্সিস প্রহরীর চোখ মুখে চাপা দিল। প্রহরীটি বসে পড়ল। তার কোমরে গুঁজে রাখা তলোয়ারটা ফ্রান্সিস এক টানে তুলে নিল। ছুটল বাইরে দিকে। বাইরে এসে দেখল-আরো দুজন প্রহরী খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস ছুটে এসে একজন প্রহরীর খোলা তলোয়ারে এত জোরে তলোয়ার চালাল যে-তলোয়ার ছিটকে গেল।
ইতিমধ্যে ভেতরের প্রহরীর কয়েকজন ছুটে আসতে লাগল।
ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। এক ছুটে রাস্তায় ওপাশে গেল। তারপর এক লাফ দিয়ে নর্দমাটা পার হল। তারপর ঝোপ জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিস এত দ্রুত কাজ সারল প্রহরীরা বোকা বনে গেল। ওরা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগই পেল না। সেই নর্দমা লাফিয়ে পার হল কয়েকজন প্রহরী। জংলা ঝোঁপের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে কাটা গাছ সরিয়ে যেতে লাগল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে বিস্তীর্ণ এক ঘাসে-ঢাকা প্রান্তর দিয়ে ছুটল। লক্ষ্য-রাজবাড়ি। তলোয়ারটা ফেলে দিল না। কোমরে গুঁজে রাখল। আজকে চাঁদের আলো অনেকটা উজ্জ্বল। চারপাশে সবই ভালো দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস ছুটে চলল। একটু খুঁজতেই হল। পেয়ে গেল রাজবাড়ি।
রাজবাড়ির প্রধান প্রবেশদ্বারে এলো। দূর থেকে দেখল প্রবেশদ্বারের মাথায় অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। প্রায় আট-দশজন সশস্ত্র প্রহরী রাজবাড়ি পাহারা দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস বুঝল এখান দিয়ে রাজবাড়িতে ঢোকা অসম্ভব।
ফ্রান্সিস পেছন দিকে চলল। কয়েকটা ফুলবাগান আর ফোয়ারার পরে রাজবাড়ির দেওয়াল। দেওয়াল খুব উঁচু নয়। দেওয়ালে ওঠা যাবে। রাজবাড়িতে ঢোকাও যাবে।
