–না। আপনিই তো রাজদরবারে আমাদের গুপ্তচর বলাকে সমর্থন করেছিলেন। আপনি অনায়াসে পারতেন আমাদের যে অন্যায় শাস্তি রাজা দিয়েছিলেন সেটা মুকুব করাতে। মারিয়া বলল।
এবার মুকব করাবো। তবে দু’এক বছর না গেলে পারবো না। রানি বলল।
–ততদিন তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মারিয়া বলল।
–তা তো হবে। রানি বলল।
–আমার স্বামী ঐকয়েদঘরেই থাকবেন বলেছেন। তবে যাবজ্জীবন নয়। মারিয়া বলল।
–তাহলে কী করবে? রানি বলল।
–পালাবে। মারিয়া বলল।
–পালাবে? রানি বলল।
অনায়াসে। মারিয়া বলল।
–আমাদের কত কারারক্ষী আছে জানেন? কারা অধ্যক্ষও আছে। রানি বলল।
আপনাদের যত কারারক্ষীই থাকুক আমার স্বামীকে বন্দী করে রাখতে পারবে না। মারিয়া বলল।
–তাহলে তো আর দেরি করা কেন? কাল পরশুই পালিয়ে যাক। রানি বলল।
–সেটা অনায়াসেই পারতো তার বুদ্ধি দিয়ে। কিন্তু সমস্যা হলাম আমি। আমাকে রেখে পালিয়ে যেতে তো পারবে না। মারিয়া বলল।
যাক গে–ওসব কথা। তুমি কয়েদঘরেই থাকো। দরকার পড়লে তোমাকে ডাকবো। রানি বলল।
–বেশ। মারিয়া বলল।
রানি তখন একজন পরিচারিকাকে ডাকল। বলল–যা সদর দরজায় একজন প্রহরীকে গিয়ে বল, ও যেন একে কয়েদঘরের কারাঅধ্যক্ষের কাছে নিয়ে যায়। যা
পরিচারিকা চলে গেল।
রাজকন্যা বলে তোমার একটু গোপন গর্ব আছে। রানি বলল।
না আমি রাজকন্যা বলেন। ফ্রান্সিসের মত স্বামী পেয়েছি বলে আমি গর্বিত। মারিয়া বলল। পরিচারিকা এলো। বলল রানিমা প্রহরীকে বলেছি। এখন এই রাজকুমারীকে নিয়ে যেতে হবে।
-বেশ। নিয়ে যা। একটু থেমে রানি বলল–আমাকে সাজগোজ করানোর কাজটা এ বোধহয় অপমানজনক মনে হয়েছে তোমার। রানি বলল।
না। ইচ্ছে হলে আমি প্রায় সব কাজই নিজের কাজ বলে মনে করি। মারিয়া বলল।
—ঠিক আছে ঠিক আছে। ডাকলে এসো। রানি বলল।
–আমি এখন ঠিক করতে পারিনি–আসবো কি আসবো না। মারিয়া বলল।
ভেবে দেখো। রানি বলল।
মারিয়া পরিচারিকার সঙ্গে অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এলো। প্রহরীটিকে ডেকে পরিচারিকা চলে গেল। প্রহরী এগিয়ে এলো। বলল-চলুন।
তখন রাত হয়েছে। সদর রাস্তায় লোকজনের ভিড়। বেশঠাণ্ডাবাতাস বইছে। কয়েদঘরে সারাদিন গরমেরমধ্যে কাটিয়ে মারিয়ার বাতাসটাভালোলাগল। বাইরে আলো দোকানপাটও ভালো লাগল। আর কোনোদিন মুক্তি পাবে কিনা। মারিয়া আকাশের দিকে তাকাল। ভাঙা চাঁদ। লক্ষ্য তারার ভিড়। এত সুন্দর পৃথিবী আর এক অন্ধ কুঠুরিতে আমরা পড়ে আছি। অল্পক্ষণের জন্যে হলেও আমি তো বাইরে আসতে পারলাম। ফ্রান্সিস অন্ধ কূপেই রইল। এসব ভাবতে গিয়ে মারিয়ার চোখে জল এলো। মারিয়া হাত দিয়ে চোখ মুছল।
কয়েদখানায় পৌঁছে দিয়ে প্রহরীটি চলে গেল। মারিয়া ঢুকতেই কারাঅধ্যক্ষ তার ঘর থেকে ছুটে এলো। হেঁ হেঁ করে হেসে বলল-রাজকুমারী–রানিমা কী বললেন।
–তেমন কিছু নয়। মারিয়া বলল।
–তবু? কারাঅধ্যক্ষ বলল।
মারিয়া চুপ করে রইল।
–বলুন না। আমার বিরুদ্ধে কিছু বলেন নি তো? কারাঅধ্যক্ষ বলল।
–উনি কি আপনাকে চেনেন? মারিয়া বলল।
–না–তা চেনেন না। কারাঅধ্যক্ষ বলল।
—তা হলে আর আপনার ভয় কিসের। মারিয়া বলল।
-হ্যাঁ–তাই তো। অধ্যক্ষ হেসে বলল।
ঐ লোকটার সঙ্গে কথা বলতে মারিয়ার বিশ্রী লাগছিল। কয়েদঘরের দরজা খোলা হল। মারিয়া ঢুকল। ফ্রান্সিস শুয়েছিল। উঠে বসল। মারিয়া বসল।
–কী ব্যাপার বলো তো? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
মারিয়া আস্তে আস্তে সব কথা বলল। ফ্রান্সিস বলল–এতো অদ্ভুত ব্যাপার। সাজসজ্জা করাবার জন্যে তোমাকে যেতে বলেছে!
–আসলে এদেশীয় মেয়েরা তো সাজগোজের ব্যাপারটা বোঝে না। এমন করে রানির ভুরুতে কালো রং করেছে যেন দুটো মোটা জোঁক আটকে আছে। মারিয়া বলল।
–হুঁ। মজার ব্যাপার। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–আসলে রানি চান যুরোপের মেয়েরা যারা নতুন নতুন সাজসজ্জা করতে পারে তাদেরই সে চায়।
–তাহলে কী করবে? ফ্রান্সিস বলল।
–যেদিন নাচ বা গানের আসরে রানিকে যেতে হবে সেদিন লোক পাঠিয়ে আমাকে নিয়ে যাবেন। মারিয়া বলল।
–তুমি সেদিন যাবে? ফ্রান্সিস বলল।
হ্যাঁ। যাবো। রানি কথায় কথায় একটা কথা বলেছে যে দু’এক বছরের মধ্যে আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবে। মারিয়া বলল।
–আমরা তার অনেক আগেই পালাবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া একটা কথা ভাবছি।
–কী কথা? মারিয়া বলল।
তুমি রাজবাড়িতেই রানির মহলে থাকো। ফ্রান্সিস বলল।
–রানির মহলে থাকবো? এখানে থাকলে অসুবিধেটা কোথায়? মারিয়া বলল।
–মারিয়া–তোমার শরীরটা বড়ো খারাপ হয়ে গেছে। এসব কয়েদখানা তোমার থাকার জায়গা না। ফ্রান্সিস বলল।
না–আমি তোমার সঙ্গেই থাকবো। মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–অবুঝ হয়ো না মারিয়া। আমাদের তো আয়না দেখার সুযোগ নেই কাজেই তোমার শরীর কতটা খারাপ হয়েছে জানোনা। বুঝতেও পারছো না। ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি এখানে একা থাকবে? মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ একাই থাকবো। তাতে আমার পালাবার সুবিধে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তাহলে কালকেই রানিকে খবর পাঠাবো যে আমি দেখা করতে চাই। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। কালকেই দেখা করো। ফ্রান্সিস বলল।
গভীর রাত পর্যন্ত ফ্রান্সিস ঘুমোতে পারল না। বোধহয় মারিয়াও ঘুমোয় নি।
এক সময়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
