–আমি? মরে যাবো। মরে যাবো কি আমি মরে গেছি। কারা অধ্যক্ষ বলল।
–কী আর হবে–যান। কারা অধ্যক্ষ বলল।
কারা অধ্যক্ষ চিৎকার করে বলল–আমাকে বেত মারা হবে। তারপর চাকরি থেকে বরখাস্ত।
–তাহলে তো আপনার খুবই বিপদ দেখছি। ফ্রান্সিস বলল।
–বিপদ বলে বিপদ। আমি শেষ–খতম। কারা অধ্যক্ষ বলল।
ফ্রান্সিস আর মারিয়া পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। ব্যাপারটা ভালো জমেছে। গলা নামিয়ে ফ্রান্সিস বলল।
কারা অধ্যক্ষ এবারহাত জোড় করে মারিয়াকে বলল-রাজকুমারী শিগগিরি যান। এতে আপনাদের দুজনেরই উপকার হবে। কথাটা ফ্রান্সিসকে আগ্রহী করল। মনে মনে ভাবল– মারিয়া যাক। গিয়ে দেখুন রানি কী বলতে চান। হয়তো আমাদের মুক্তিও দিতে পারে।
ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া যাও-রানি কী বলে সেটা শুনে এসো।
–রানির চোখে আমি কুটিল দৃষ্টি দেখেছি। উনি ভালো মানুষ নন। মারিয়া বলল।
–সংসারে ক’জন আর ভালো মানুষ আছে। এই যে কারাঅধ্যক্ষজঘন্য প্রকৃতির মানুষ। এর সঙ্গেও তো আমাদের কথা বলতে হয়। যাও–জেনে এসো রানি কী বলতে চান? ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। মারিয়া উঠে দাঁড়াল। বলল–আমাকে কে নিয়ে যাবে?
–আমার কাজের ঘরে এক মহিলা বসে আছে সেই নিয়ে যাবে। চলুন।
দুজনে কারাকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো। অধ্যক্ষের কাজের ঘরে এলো। মারিয়া দেখল একজন বয়স্কা মহিলা। কারাঅধ্যক্ষ তার দিকে তাকিয়ে বলল- এই যে রাজকুমারী মারিয়া। এঁকে নিয়ে যাও।
মহিলাটি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। মারিয়া পেছনে পেছনে বেরিয়ে এলো।
সদর রাস্তায় এলো। মারিয়া চারদিকে চোখ মেলে লোকজন বাজার বাড়িঘর দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনে রাজবাড়িতে পৌঁছল। স্ত্রীলোকটি রাজবাড়ির পেছন দিকে এলো। টানা পাথরের দেয়াল। মহিলাটি পাথরের দেয়ালের মধ্যে একটা কাঠের দরজায় হাত দিয়ে টুক টুক্শব্দ করল। দরজা খুলে গেল। দেখা গেল একজন স্ত্রীলোক পেতলের বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা গেল অন্তঃপুরে পাহারা দেয়। মারিয়ারা ঢুকতেই স্ত্রীলোকটি দরজা বন্ধ করে দিল।
এক পরিচারিকার সঙ্গে মারিয়া চলল। পরপর কয়েকটি বাগান। কত ফুল ফুটে আছে। ফুলের গন্ধ নাকে লাগল। কে জানে কোন্ ফুলের গন্ধ। দুটো ফোয়ার আছে। তারপর একটা চারকোণা চত্বর। তারপরেই পাথরের দরজা। এখানে কেউ পাহারা দিচ্ছে না।
দুজনে ঢুকল। দুধারের দেয়ালে ছবি বসানো। মারিয়া বুঝল এসব অতীতের রাজা রানিদের ছবি। দুজনে এগিয়ে চলল। দুধারে ঘর। পাখির পালকের বিছানায় শুয়ে আছে বসে আছে কথাবার্তা বলছে রানির সহচারীরা। এখানে সুগন্ধি কিছু দেওয়া হয়েছে। সুন্দর গন্ধ। সকলেই মারিয়াকে ঔৎসুক্যের সঙ্গে দেখতে লাগল।
এবার ডানদিকে একেবারে আলাদা দুটো ঘর। এখানে মেঝে মোজেক করা। স্ত্রীলোকটি বলল-দাঁড়ান। রানিমা কোন্ ঘরে আছেন দেখে আসছি। স্ত্রীলোকটি চলে গেল। মারিয়া তাকিয়ে চারদিক দেখতে লাগল। মারিয়াদেরও দেশে প্রাসাদ আছে। কাজেই এরকম অন্দরমহলও আছে। সেটাও বা এর চেয়ে কম কি। হঠাৎ মারিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওদের প্রাসাদের কথা মনে পড়ল। ফ্রান্সিসদের সাজানো গোছানো বাড়ির কথা মনে পড়ল। চোখে জল এলো। মারিয়া সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে চোখ মুছল। এসব বেশি ভাবলে মন খারাপ হবে। ফ্রান্সিসও এটা পছন্দ করে না।
কিছু পরে পরিচারিকাটি ফিরে এলো। বলল–চলুন রানিমা সাজঘরে আছেন।
কিছুটা এগিয়েই ডানদিকে একটা ঘর। দরজায় মোটা কাপড়ের পর্দা। সুচিত্রিত।
পর্দা সরিয়ে ঢুকল। দেখল একটা বেশ বড়ো ঘর। একটা খাট রয়েছে মাঝখানে। রানি খাটে বসে আছে। পরিচারিকারা রানিকে সাজাচ্ছে। রানির পরনে ঢোলা হাতা সাধারণ পোশাক। মারিয়া মনে মনে হাসল। দামি ভালো কাপড়টা এখনও পরানো হয়নি। গয়নাগাটিও এখনও পরানো হয়নি।
রানি মারিয়াকে দেখে বলল–তুমি তো মারিয়া?
–হ্যাঁ। মারিয়া মাথা কাত করে বলল।
–এখানেই বসো। রানি বলল।
মারিয়া খাটে বসল। রানি বলল–ভালো হয়ে বসো। মারিয়া বলল–ঠিক আছে।
–আর বলো কেন। মাঝে মাঝেই মন্ত্রী সেনাপতি বড়ো বড়ো ব্যবসাদারের বাড়িতে নাচগানের আসর বসে। যেতে হয়। আচ্ছা–তোমরা তো শুনলাম পশ্চিম য়ুরোপের অধিবাসী। তোমরা তো ভালো সাজস জানো। রানি বলল।
–ঐ আর কি। মারিয়া হেসে বলল।
দ্যাখো তো আমার মুখের সাজ ঠিক আছে? রানি বলল।
মারিয়া রানির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর বলল–আপনার ভুরুর একটু মোটা হয়ে গেছে।
রানি সামনে বসা পরিচারিকাকে বলল–ভুরুটা ঠিক করে দে। পরিচারিকা ভুরুর ধারগুলো মুছে মুছে সরু করল। রানির সামনে আয়না ধরা হল। নিজের মুখ দেখে রানি মহা খুশি।
–মারিয়া তুমি এখানেই থাকো। আমাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেবে। রানি বলল।
–মাননীয়া রানি–তা হয় না। আমার স্বামী কয়েদ খাটছে। মারিয়া বলল।
–হুঁ। একটু সমস্যা। যাহোক আমি তোমার স্বামীর শাস্তিমুকুব করিয়ে দেবো। রানি বলল।
–না। আমি কয়েদঘরে থাকবো। মারিয়া বলল।
–মারিয়া কিছুতেই ভুলতে পারছে না। এই রানির রাজসভায় বলেছিল ঠিক শাস্তি হয়েছে। একটা বিতৃষ্ণায় মন ভরে উঠল। দয়ামায়া বলে কোনো বোধই এই রানির নেই। তাকে সাজগোজ করাতে আমি আসবো কেন। এই রানির সঙ্গে কী সম্পর্ক আমাদের?
–তাহলে তুমি এখানে থাকবে না? রানি একটু রেগেই বলল।
