–হুঁ। বলো। রাজা বলল।
–দিন আট-দশ আগে ওরা কারাকক্ষের জানালা দিয়ে বেরিয়ে পালিয়ে গেছে। এখন এরা বন্ধুদের খোঁজে আমার কাছে এসেছিল। আমি আপনার কাছে আনলাম। এখন ওদের কী শাস্তি দেবেন দিন।
–এদেরও ছমাস কারাবাস। রাজা বলল।
মাননীয় রাজা–এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি–আমার মনে হয়–এদের গুপ্তচরবৃত্তির জন্যেই আমরা যুদ্ধে হেরে গেছি। অধ্যক্ষ বলল।
–ঠিক — ঠিক। এদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলাম। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল –মাননীয় রাজা এত নিষ্ঠুর হবেন না। ভেবে দেখুন –আমরা বিদেশি ভাইকিং আপনাদের দেশে আমাদের কী স্বার্থ। গুপ্তচরবৃত্তির মতো ঘৃণ্য কাজ আমরা করি না।
না–না। রায় দেওয়া হয়ে গেছে। রাজা বলল।
এবার রানি মারিয়াকে জিজ্ঞেস করল–
–তোমার নাম কী?
–মারিয়া।
–তোমার স্বামী কোথায়?
মারিয়া ফ্রান্সিসকে আঙ্গুল তুলে দেখাল।
রানি হেসে উঠল বাঃ কী মজা। সারাজীবন একটা ঘরে শুধু তোমরা দু’জন এক সঙ্গে।
ফ্রান্সিস বলল–মাননীয়া রানি–মারিয়া আমাদের দেশের রাজকুমারী।
-বলো কি! রাজকুমারী? আঁ? কিন্তু চেহারা দেখে তো সেটা মহে হচ্ছে না।
আমরা দীর্ঘদিন নানা দ্বীপে দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। রোদ বৃষ্টিঝড় অসহ্য গরম আবার ঠাণ্ডা–এতসবের ধকল পুইয়ে শরীর ঠিক রাখা যায় না। চেহারায় তার প্রভাব পড়ে।
—তা ঠিক। যাকগে তোমাদের মতো গুপ্তচরদের এরকম শাস্তিই হওয়া উচিত। রাজা ঠিক শাস্তিই দিয়েছেন। রানি হেসে বলল।
রাগে ফ্রান্সিসের বুক ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। নাক দিয়ে জোরে শ্বাস পড়তে লাগল। মারিয়া ভয়ে বলে উঠল ফ্রান্সিস-শান্ত হও। ভাগ্যে যা আছে মেনে নাও। ফ্রান্সিস — শোনো—
ফ্রান্সিস রাজা রানিকে কোনোরকম সম্মান না জানিয়েই পেছন ফিরে সভাঘরের দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। কারা অধ্যক্ষের গলা শোনা গেল–দ্যাখ দ্যাখ–পালিয়ে না যায়। দুজন করারক্ষী ছুটে এলো। ফ্রান্সিস পেছন ফিরে দাঁড়াল। কারা অধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমার জন্যই আমাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল। শোনো–আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে খুন করবো।
অধ্যক্ষ বেশ ভয়ে পেল। বলল–এই তোরা একে তাড়াতাড়ি নিয়ে চল্। এর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মারিয়া এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। বলল–ফ্রান্সিস শান্ত হও।
সবাই কারাগারে এলো। ফ্রান্সিস আর মারিয়া যে ঘরে ছিল সেদিকে চলল। কারা অধ্যক্ষ এগিয়ে এলো। হেসে বলল–তোমাদের তো অনেকদিন থাকতে হবে। তাই চার নম্বর ঘরটাতে তোমাদের রাখবো। শুকনো ঘাসের পুরু বিছানা। ঘরটা রোদ পায় বলে একটু গরমও। তাছাড়া তোমরা আর যা চাইবে পাবে। মারিয়া গলা চড়িয়ে বলল থাক –আমাদের সুবিধে দেখতে হবে না। যে ঘরে আছি আমরা সেঘরেই থাকবো।
কিন্তু আপনাদের তো কষ্ট হবে। কত বছর থাকতে হবে। কারা অধ্যক্ষ হেসে বলল। কথাটা শেষ হতেই ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। তারপর ছুটে গিয়ে কারা অধ্যক্ষের গলার কাছে জামাটা চেপে ধরল। তারপর ফ্রান্সিস একহঁচকা টানে উঁচুতে তুলল। অধ্যক্ষ বলে উঠল– এ্যাই ধর একে। তলোয়ার চালা। দুজন কারারক্ষকতরবারি কোষমুক্ত করল। মারিয়া গিয়ে ফ্রান্সিসের হাত ধরল। বলল–ফ্রান্সিস শান্ত হও। এভাবে আমাদের বিপদ বাড়বে। রক্ষী দুজন তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। ও নিরস্ত্র। ও অধ্যক্ষকে এক হ্যাঁচকা টানে মাটিতে নামাল। মুঠো ছেড়ে দিল। কারা অধ্যক্ষ মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। বলল–তোরা সাবধান। এই বন্দী যেন কখনও বাইরে আসতে না পারে।
ফান্সিস আর মারিয়া কারাকক্ষে ঢুকল। মারিয়া ঘাসের বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস পায়চারি করতে লাগল। গরের তালাবন্ধ করল–বসো। ফ্রান্সিস চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়া আবার বললশান্ত হয়ে বসো। ফ্রান্সিস বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। দাঁত চাপাস্বরে বলল মারিয়া তুমি যদি না থাকতে আমি রাজা রানি আর ঐ কারার অধ্যক্ষকে মেরে ফেলতাম।
–আমি জানি আমার জন্যেই তোমাদের এত কষ্ট। মারিয়া ফুঁপিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। মারিয়ার কাঁধে দু’হাত রেখে বলল–
-মারিয়া–কেঁদোনা। এভাবে কথাটা বলা উচিত হয়নি। তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমি স্থির থাকতে পারি না। তুমি কেঁদো না। মারিয়া চোখ মুছল। আর কাদল না।
ফ্রান্সিস আর মারিয়ার দুপুরের খাওয়া শেষ হয়েছে তখনই কারার অধ্যক্ষ ঢুকল। কারারক্ষীরা তাকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। কারা অধ্যক্ষ মারিয়াকে বলল–আপনিই তো রাজকুমারী?
–হ্যাঁ। কিন্তু আমাকে ডাকছেন কেন? মারিয়া বলল।
–আমি না। রানিমা চিঠি দিয়ে তোক পাঠিয়েছেন। আপনাকে রানিমার কাছে যেতে হবে। উনি আপনাকে ডেকেছেন। কারা অধ্যক্ষ বলল।
–আমি যাব না। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল।
–তার মানে? রানিমা স্বয়ং লোক পাঠিয়েছেন আপনাকে তার কাছে নিয়ে যেতে আর আপনি বলছেন যাবো না?
কী কারণে মারিয়াকে ডেকে পঠিয়েছেন সেটা কি জানানো হয়েছে? ফ্রান্সিস বলল।
–না –সেসব আমি জানি না। রানিমাও ঐ ব্যাপারে কিছু লেখেন নি। অধ্যক্ষ বলল।
–তাহলে কারণটা আপনি জেনে আসুন তারপর কারণের গুরুত্ব বুঝে মারিয়া যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
-ওরে বাবা-রানিমার কাছে কে কারণ জানতে যাবে। কারা অধ্যক্ষ বলল।
–কেন? আপনি যাবেন? মারিয়া বলল।
