— কারা অধ্যক্ষ বলল-খবরটা পেয়ে খুব খুশি হয়েছে মনে হচ্ছে।
–ওরা আমাদের বন্ধু। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার বন্ধুরা পালিয়েছে–তোমরা পালাওনি?
–কথাটার মানে? ফ্রান্সিস বলল।
কারা অধ্যক্ষ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে ডাকল–রক্ষীরা কে আছিস? দুজন কারারক্ষী ছুটে এলো। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–মারিয়া, চালে ভুল হয়ে গেছে। কারা অধ্যক্ষ বলল কিছুদিন আগে কয়েকজন ভাইকিং এখান থেকে পালিয়েছিল–মনে আছে?
–হ্যাঁ কারারক্ষী একজন বলল। ফ্রান্সিস আর মারিয়াকে দেখিয়ে কারা অধ্যক্ষ বলল–এই দু’জন তাদেরই বন্ধু। এদের কয়েদঘরে ঢোকা।
কথাটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–এসবের মানে কী? আমাদের বন্দী করবেন কেন?
বন্ধুদের হয়ে তোমরা কয়েদ খাটবে।
–আমারা রাজি বন্ধুদের হয়ে কয়েদ খাটতে। কিন্তু সেটা কতদিন?
–সেটা বলবেন রাজা ভিলিয়ান। তবে যুদ্ধে হেরে গিয়ে রাজামশাইয়ের মন মেজাজ ভালো নেই। কতদিনের সাজা দেবে কে জানে। কারা অধ্যক্ষ বলল। আসনে বসল।
কারারক্ষী দুজন এগিয়ে এলো। মারিয়া বলল-ফ্রান্সিস–তাহলে আবার কারাবাস।
–উপায় নেই। তবে বন্ধুদের হয়ে কারাবাস করছি–এটাই আমার সান্ত্বনা। চলো আমরা যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস ও মারিয়া কারারক্ষীদের পেছনে পেছনে চলল।
একটা ঘরের সামনে এলো সবাই। একজন কারারক্ষী চাবির তোড়া থেকে চাবি বের করল। দরজা খুলল। ফ্রান্সিস ও মারিয়া ঢুকল। ঘর অন্ধকার। কারারক্ষী একজন চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালাল। কারারক্ষী দুজনে চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিস ঘরের মোটা নকশা আঁকা চাদরটার ওপরে শুয়ে পড়ল। মারিয়াও বসল। দেখতে লাগল চারিদিক। শক্ত পাথরের দেওয়াল। ওপর দিকে দুটো জানালা মতো। গরাদ নেই।
মারিয়া বলল তুমি তো বন্দী মেনে নিলে। এখন কতদিন এখানে পচতে হবে কে জানে!
কালকে তো রাজসভায় নিয়ে যাবে। দেখা যাকরাজা ভিলিয়ান কী বলে। ফ্রান্সিস বলল।
–যদি অনেকদিনের জন্যে বন্দী করে রাখে তবে কী করবে? মারিয়া বলল।
–তবে পালাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–পারবে? মারিয়া বলল।
–পারতে হবে। সমস্যা একটাই–তোমাকে কী করে সঙ্গে নেব। ফ্রান্সিস বলল।
আমার জন্যে ভেবো না। তুমি মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেও এটাই আমি চাই, মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল–এটা একটা কথা হল? এই বিদেশ বিভূঁইয়ে তোমাকে একলা রেখে পালিয়ে যাবো? এসব কখনো ভাববে না। আমার ভালো লাগে না। মারিয়া বলল–তুমি রাগ করো না। এসব তোমাকে আর বলবো না।
ফ্রান্সিস কিছু বলল না। চোখ বুজে শুয়ে রইল।
রাতে দুজন কারারক্ষী খাবার দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল- পেট পুরে খাও। ভালো না লাগলেও খাও। এই কথাটা ফ্রান্সিস বন্দীদশার সময় সবাইকে বলে। পাখির মাংস আর আনাজের ঝোল।
খাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস আবার শুয়ে পড়ল। মারিয়াও কিছুক্ষণ বসে থেকে শুয়ে পড়ল।
গভীর রাত তখন। ফ্রান্সিসের ঘুম আসে নি। নানা চিন্তা মাথায়। মৃদুস্বরে ডাকল– মারিয়া? মারিয়া বলল-বলো।
–সে কি? তুমি এখনও ঘুমোও নি? ফ্রান্সিস বলল।
–তুমি ঘুমোও নি আর আমি নাক ডাকিয়ে ঘুমোবো। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে আমি ঘুমাচ্ছি। এবার তুমিও ঘুমোও। ফ্রান্সিস বলল।
একসময় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালের খাওয়াটা শেষ হতেই দুজন কারারক্ষী এলো। বলল–
–চলো-রাজসভায় যেতে হবে।
ফ্রান্সিস আর মারিয়া উঠে দাঁড়াল। ঘরের বাইরে এলো। দেখল কারা অধ্যক্ষদাঁড়িয়ে আছে। কারা অধ্যক্ষ ফ্রান্সিসদের দেখে হাঁটতে লাগল। সদর দরজার বাইরে এলো সবাই। কারা অধ্যক্ষও ফ্রান্সিসদের সঙ্গে হেঁটে চলল। সঙ্গে সঙ্গে দুজন কারারক্ষী।
পথে অনেকেই দেখল দুজন বন্দীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বন্দীরা কোন দেশের তা কেউ বুঝল না। যদিও বন্দী দুজন এ দেশীয় পোশাক তবুমুখে দেখে গায়ের রং দেখে বোঝা যাচ্ছে ওরা দুজন বিদেশি।
সবাই হাঁটতে হাঁটতে একটা লম্বাটে বেশ বড়ো পাথরের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। দেখল–প্রবেশ পথে পাথরের তোরণ। হাতে কুঁদেকুঁদে মশাল লাত পাতা পাল তোলা। দুজন রক্ষী দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে লোহার বর্শা। ফ্রান্সিস বুঝল–এটাই রাজবাড়ি। রক্ষীরা কারা অধ্যক্ষকে মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানাল।
সবাই রাজসভাঘরে ঢুকল। এর মধ্যেই রাজসভায় বেশ ভিড়। লম্বাটে ঘরটার মাঝামাঝি রাজসভা। রাজা ভিলিয়ান তখনও আসেনি। ফ্রান্সিস দেখলদুটো সিংহাসন। ও ঠিক বুঝলো না আর একটি ছোটো সিংহাসন কার জন্যে। অল্প কিছু পরে রাজা ভিলিয়ান ঢুকল। পেছনে রানি। বড়ো সিংহাসনটায় রাজা বসল। ছোটোটায় রানি বসল। উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়িয়ে রাজারানিকে সম্মান জানাল।
রাজার মুখ বিমর্ষ। বোঝাই গেল যুদ্ধ পারজয়টা রাজা মেনে নিতে পারে নি। রানির কিন্ত হাসিমুখ। চারদিকে তাকিয়ে তকিয়ে দেখছে। ছেলেমানুষের মতো হাসছে।
দুটো বিচারের পর কারা অধ্যক্ষ মাথা নুইয়ে রাজারানিকে সম্মান জানিয়ে বলল– মহামান্য রাজা আমার একটা নিবেদন ছিল।
-বলো। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে দেখিয়ে অধ্যক্ষ বলিল–এরা দুজন জাতিতে ভাইকিং। দিন সাত আট আগে এর বেশ কয়েকজন বন্ধুকে বন্দী করা হয়েছিল। আপনি তাদের গুপ্তচর সন্দেহে ছয়মাস করাবাসের হুকুম দিয়েছিলেন।
