ফ্রান্সিস এবার অন্য সৈন্যটির দিকে তাকাল। ক্রদ্ধস্বরে বলল–পারবে আমার সঙ্গে লড়তে। সৈন্যটি ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। ফ্রান্সিস বলল– তোমরা দুজন সৈন্যকে আহত দেখেও জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আমার হাতে একজন মারা যায়। তুমিও রেহাই পাবে না। সৈন্যটি তলোয়ার ডেক-এর ওপর ফেলে দিয়ে সিঁড়িঘরের দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস ওর চেয়ে দ্রুত দৌড়ে এসে সৈন্যটির সামনে এসে দাঁড়াল। মৃত্যুভয়ে সৈন্যটির তখন মুখ সাদা হেয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–আমি নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করি না। তুমি যাও তলোয়ার হাতে নাও। সৈন্যটি আস্তে আস্তে গিয়ে তলোয়ার তুলে হাতে নিল। ফ্রান্সিস সৈন্যটির সামনে এলো। বলল–এবার আমার সঙ্গে লড়ো।
ফ্রান্সিস তলোয়ার তুলে এগিয়ে এলো। তলোয়ার চালাল। সৈন্যটি মার ঠেকাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সৈন্যটির দম ফুরিয়ে গেল। ও কোনোরকম ফ্রান্সিসের মার ঠেকাতে লাগল। ফ্রান্সিস প্রচণ্ড জোরে তলোয়ার চালাল। সৈন্যটি যে মার ঠেকাতে পারল না। ওর হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। ও চিৎ হয়ে ডেক-এর ওপর পড়ে গেল। মুখ হাঁকরোঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মারাত্মক আহত দুজন সৈন্যকে দেখে তোমাদের মায়া হল না। বিনা দোষে ওদের জলে ছুঁড়ে ফেললে। ঠিক ঐভাবে আমিও তোমাদের দুজনকে জলে ছুঁড়ে ফেলবো।
কথাটা বলে ফ্রান্সিস সৈন্যটির বুকে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিল। সৈন্যটি মাথা এপাশ ওপাশ করতে লাগল। ফ্রান্সিস তলোয়ার বের করে নিয়ে কোমরে গুঁজল। তারপর সৈন্যটিকে কাঁদে তুলে নিল। সৈন্যটি অনুনয় করতে লাগল-জলে ফেলো না। জলে ফেলো না। ফ্রান্সিস সে কথা শুনল না। রেলিঙে উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে জলে ফেলে দিল। তারপর অন্য আহত সৈন্যটিকেও একইভাবে জলে ফেলে দিল।
ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়িঘরের দিকে চলল। দেখল মারিয়া সিঁড়িঘরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়া সবই দেখেছে। কিন্তু কিছুই বলল না।
কেবিন ঘরে এলো। মারিয়াও এলো। বলল–এখন কী করবে।
–এখান থেকে চলবে না। তুমি নোঙরটা তোলো। পারবে তো।
–হ্যাঁ হ্যাঁ পারবো। মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল।
–তাহলে যাও। আমি পালগুলো খুলে দিচ্ছি। এখন যে জোরে বাতাস বইছে পাল ভালো হাওয়া পাবে। যাও।
মারিয়া নোঙরের কাছে এলো। তারপর নোঙরের কাছি ধরে আস্তে আস্তে টানতে লাগল। নোঙরটা উঠেআসতে লাগল। কিছুক্ষণেরমধ্যেইমারিয়া নোঙারতুলে ফেলল। হাঁপাতে লাগল।
ডেক এ দেখল ফ্রান্সিস এর মধ্যে সব পাল খুলে দিয়েছে। বাতাসের তোড়ে। পালগুলো ফুলে গেছে। জাহাজও গতি পেয়েছে। বেশ জোরেই চলছে।
ফ্রান্সিস গোল হুইল-এর কাছে এলো। হুইল ঘোরাতে লাগল। জাহাজ চলল।
মারিয়া চলল রসুইঘরের দিকে। রান্না বসাল।
ফ্রান্সিস দিক ঠিক করে হুইলটা একটা কড়ার সঙ্গে আটকাল। তারপর ডেক-এ শুয়ে পড়ল। আকাশের দিকে তাকাল। ঝক্ঝক্ নীল আকাশ। মাঝে মাঝে সাদা মেঘ উড়ে আসছে। ফ্রান্সিস চোখ বুজল। এখন আকাশ দেখার সময় নয়। বন্ধুদের যে কোথায় খুঁজবে বুঝে উঠতে পারছে না। তাই মাথায় চিন্তা।
রাজা ভিলিয়ানের সেনাপতি নিশ্চয়ই হ্যারিদের ভিগোতে বন্দী করে রেখেছিল। তা না হলে ওদের ফিরিয়ে আনল না কেন? হ্যারিরা বন্দী হয়েছিল। নিশ্চয়ই পালাতে পারে নি। তাহলে তো ভিগো নগরে গিয়ে কয়েদখানায় খোঁজ করতে হয়। যদি সেখানে হ্যারি শাঙ্কোদের না পাই তাহলে বুঝবে যে ওরা অন্য কোথাও আছে।
মারিয়া এলো। বলল–খাবে এসো। ফ্রান্সিস উঠে বসল। দেখল জাহাজ বেশ দ্রুত গতিতেই চলেছে। হুইলের সঙ্গে কড়াটায় আটকানো। হাত দিয়ে দেখল ভালোভাবেই আটকানো আছে। ফ্রান্সিস সিঁড়িঘরের দিকে চলল। একবার সমুদ্রের চারদিকে তাকিয়ে দেখতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেক দূরে একটা ছোট্ট জাহাজ। যুদ্ধের সময় আমি কি ঐ জাহাজটাই দেখেছিলাম? এখন জাহাজটা আবার দেখা যাচ্ছে। ঐ জাহাজটা কি আমাদের জাহাজকেই অনুসরণ করছে? কিন্তু বিনা কারণে আমাদের অনুসরণ করবে কেন? ফ্রান্সিস এবার সবদিকেই তাকিয়ে নিল। না আর কোনো জাহাজ দেখা যাচ্ছে না।
খেতে বসে ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া একটা অদ্ভুত ব্যাপার।
কী ব্যাপার? মারিয়া বলল।
ডেক-এ উঠে দেখবে এসো একটা ছোট্ট জাহাজ আমাদের অনুসরণ করছে। ফ্রান্সিস বলল।
কী যে বলো। ছোট্ট জাহাজটা আমাদের অনুসরণ করবে কেন? মারিয়া বলল।
নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী কারণ? মারিয়া বলল।
–সেটাই তো বুঝতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি তো। মারিয়া বলল।
মারিয়া ডেক-এ উঠে এলো। চারদিকে তাকাল। দূরে দেখল–একটা ছোট্ট জাহাজ আসছে। এখান থেকে অবশ্য জাহাজের লোকজন দেখা যাচ্ছেনা। শুধু ছোট্ট জাহাজটাই দেখা যাচ্ছে। জাহজটায় কোনো নিশানাও উড়ছে না। কে জানে কোন্ দেশের জাহাজ।
মারিয়া ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–ছোট্ট জাহাজটা দেখলাম। লোকজন দেখা গেল না। মনে হয় আমদের অনুসরণ করছে। দূরত্বটা বেশ বেশি। কাছে গেলে অবশ্য ডেক-এ কারা আছে বোঝা যেত।
ওদিকে ভিগো নগরের জাহাজঘাট থেকে হ্যারিদের নতুন কেনা জাহাজটা ছাড়ল। চলল রাজা অপৰ্তোর দেশের দিকে। ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিশ্চয়ই ওখানে পাওয়া যাবে। এই জাহাজের ছোট্ট মাস্তুলটার মাথায় নজরদারির জন্যে কোনো আসন রাখা নেই। নজরদার পেড্রোর মন খারাপ। ও মাস্তুলের গায়ে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর নজরদারির কাজ করতে লাগল।
