মারিয়া চিনে মাটির থালায় রুটি মাংসের ঝেল নিয়ে এলো। তারপর কাঠের গ্লাশে জল দিল। ফ্রান্সিস গ্লাশটা নিয়ে সবটুকু জল খেয়ে ফেলল। মারিয়া আরও এক গ্লাশ জল দিল।
ফ্রান্সিস আস্তেআস্তে খেতে লাগল। খাচ্ছে আর ভাবছ্যোরিদেরকথা। কোথায় আছে ওরা?
–এখন কী করবে? মারিয়া বলল।
–সেটাই তো ভাবনা। ওরা জাহাজে চড়ে রাজা ভিলিয়ানের রাজ্যে গিয়েছিল। তুমি তো এইটুকুই জানো।
–হ্যাঁ। কিন্তু মারিয়া লাফিয়ে উঠল–মনে পড়েছে আমাদের জাহাজটা কদিন পরেই ফিরে এসেছিল এখানে।
-হ্যারিরা সেই জাহাজে ফেরে নি–এই তো? ফ্রান্সিস বলল।
–হা হা। তুমি কী করে বুঝলে? মারিয়া বলল।
–এইসব সেনাপতি-টতি অনেক দেখেছি। নিজেদের ভীষণ ক্ষমতাধর প্রমাণের জন্যে সব করতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
-তাহলে এখন কী করবে? মারিয়া বলল।
–রাজা ভিলিয়ানের রাজ্যের ভিগো নগরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–সেকি! এই জাহাজ চালিয়ে যাবে মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা দুজন? মারিয়া বলল।
–না–আমরা চারজন। ফ্রান্সিস বলল।
–ওপরের ডেক-এদুজন রাজাভিলিয়ানের সৈন্য আহত অবস্থায় রয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
তারা কি আমাদের কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবে? মারিয়া বলল।
–দু-একদিনের মধ্যে যতটা সাহায্য পাবো ততটাই নেবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি কী করবো? মারিয়া বলল।
রান্না করবে খেতে দেবে। আর সেলাই ফেঁড়াই করবে। ফ্রান্সিস বলল।
–না, প্রয়োজনে আমি তলোয়ার নিয়ে লড়াই করবো। মারিয়া বলল।
–দোহাই লড়াইর ময়দানে তোমাকে আমি দেখতে চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি প্রায় প্রতিদিন তলোয়ার চালানো অভ্যেস করি। মারিয়া বলল।
–শিখেছো কার কাছে? ফ্রান্সিস বলল।
–শাঙ্কো। মারিয়া বলল।
–শাঙ্কোটা তোমার মাথাটি খেয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমিই শাঙ্কোকে বলেছি শেখাতে। মারিয়া বলল।
–ও প্রথমে আপত্তি করেছিল। আমি শুনি নি। ও তোমার কথাও বলেছিল। আমি বলেছি তোমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমিই তোমাকে বোঝাবো। মারিয়া বলল।
-ঠিক আছে বাবা। তুমি তলোয়ার চালানো শেখো, লড়াই করো। ফ্রান্সিস বলল। তাহলে আমি ত লড়তে পারবো। মারিয়া বলল।
–তা পারবে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–ঐআহত দুজন সৈন্যকে কে খেতে দেয়?
-আমিই খেতে দিই। তবে ওষুধ তো আর পড়ছেনা। জানি না কী করে শরীরের কাটাগুলো সারবে। মরিয়া বলল।
ভেন থাকলে চিকিৎসা হত। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস। এখন কী করবে? মারিয়া বলল।
রাজা ভিলিয়ানের রাজ্য ভিগোতে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া চোখ বড়ো বড়ো করে বলল–তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই ক’জন আমরা এত বড়ো একটা জাহাজ চালিয়ে ভিগো নগরে যেতে পারবো?
পারবো। জাহাজের পালগুলো খাঁটিয়ে দেব। সবকটা পাল। জোর বাতাস পেলে জাহাজ দ্রুত চলবে। আমাদের কিছুই করার থাকবে না। জাহাজ আপনি চলবে। শুধু হুইল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দিকটা ঠিক রাখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া কী বলতে গেল। ফ্রান্সিস ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ওকে থামিয়ে দিল। ফ্রান্সিস ফিস ফিস করে বলল-ডেক-এ কাদের চলাফেরারশব্দ শুনছি। মারিয়া কান পাতলা জুতোরশব্দ।
হঠাৎকার কান্না আর্তনাদ শোনা গেল। সেই সঙ্গে উচ্চ হাসি। তারপরে আরেকজনের গোঙানি শোনা গেল। সমুদ্রে কিছু পড়ার শব্দ শুনল ফ্রান্সিস। আবার হাসি শোনা গেল।
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–আহত সৈন্য দুজনকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হল। মারিয়া দু’হাতে বুক চেপে ফুঁপিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–কেঁদো না। আমি যদি মারিয়া ফ্রান্সিসের হাত চেপে ধরল–না-না। ওরা কতজন আছে কে জানে।
–যতজনই থাক আমি সবকটাকে নিকেশ করবো। মারাত্মকভাবে আহত দুই সৈন্যকে জলে ছুঁড়ে ফেলা। কী নির্মম।
না–না। যেও না। মারিয়া গলা চেপে বলল।
–না মারিয়া। আমি যাবোই। দরকার একটা তলোয়ার। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। মারিয়া বুঝলফ্রান্সিসকে আটকানো যাবেনা। ফ্রান্সিস চলল ওদেরঅস্ত্রঘরের দিকে। অস্ত্রঘরের দরজা খোলা। ফ্রান্সিস ঘরে ঢুকে অন্ধকারে দেখেই বুঝল–খুব বেশি অস্ত্র নেই। ওরই মধ্যে বেছে নিল একটা তলোয়ার। তুলে আনল। চলল ওপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে।
আস্তে আস্তে নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে উঠল। সিঁড়ির শেষে সিঁড়িঘরে উঠে দাঁড়াল। দেখল যুদ্ধজয়ী রাজা অপৰ্তোর দুজন সৈন্য ডেক-এ বসে আছে। হাত খালি। তলোয়ার কোমরবন্ধে খাপে রাখা।
ফ্রান্সিসকে দেখেই দুজন সৈন্য লাফিয়ে উঠল। তলোয়ার কোষমুক্ত করল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল–আহত সৈন্য দুজন কোথায়?
জলে ফেলে দিয়েছি। একজন কথাটা বলে হেসে উঠল। অন্যজন বলল,আমাদের আর লড়াইও করতে হয়নি। হত্যা করতেও হয়নি।
–সোজা পথে ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছো। ফ্রান্সিস বলল। দুজনেই জোরে হেসে উঠল।
এবার আমার সঙ্গেও যে ঝামেলা মেটাতে হয়। ফ্রান্সিস খাপ থেকে তলোয়ার খুলল।
তুমি কি আমাদের সঙ্গে লড়বে? একজন সৈন্য বলল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করে বলল।
ফ্রান্সিস তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে গেল। একজন সৈন্য তলোয়ার তুলে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিস এক পা সরিয়ে নিল। তারপর দ্রুত তলোয়ার চালাল। সৈন্যটি কোনোরকম সেই মার ঠেকালো। সৈন্যটি এবার ফ্রান্সিসের দিকে এগিয়ে গেল। শুরুহলো তলোয়ারের লড়াই। অল্পক্ষণের মধ্যেই সৈন্যটির হাতের তলোয়ার ছিটকে গেল। ও ডেক-এ বসে পড়ল। মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস ঐ অবস্থাতেই তলোয়ার চালাল। সৈন্যটির গলায় লাগল তলোয়রের কোপ। সৈন্যটি উপুড় হয়ে ডেক এর ওপরে পড়ে গেল। আর উঠে দাঁড়াতে পারলো না।
