ফ্রান্সিস সমুদ্রের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল। দূরের জাহাজটা যুদ্ধ জাহাজ নয়। ঐ ছোট্ট জাহাজে যারা রয়েছে তারা যুদ্ধে যোগ দেয় নি। কে জানে ওটা কাদের জাহাজ? ফ্রান্সিস ভাবতে লাগল–এখন আমার প্রধান কর্তব্য মারিয়া আর বন্ধুদের সন্ধান করা। ওরা কোথায় থাকতে পারে। ভেবে পাচ্ছি না–ওরা কি যুদ্ধে কারো পক্ষ নিয়েছিল? আমাদের জাহাজটা তীরে ভেড়ানো আছে। হয়তো ওরা আমাদের জাহাজেই রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের এই ডামাডোল নিশ্চয়ই আমাদের জাহাজটাকেও কাজে লাগানো হয়েছে। তাহলে হয়তো মারিয়াকে বন্ধুদের জাহাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তো ওদের তীরভূমির কোথাও নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ওদের জাহাজে না যেতে পারলে কিছুই বোঝা যাবে না।
বিকেলের দিকে যুদ্ধক্ষেত্রে চিৎকার হৈ হৈ শোনা গেল না। তার মানে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। এখন কারা জয়লাভ করল ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
বিকেলের দিকেই বোঝা গেল। রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যদের বন্দী করা হতে লাগল। ওরই মধ্যে এবার রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যরা একটা জাহাজে উঠে জাহাজ ছেড়ে দিল। রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা বাধা দেবার আগেই জাহাজটা বেশ দূরে ভেসে গেল। জাহাজের সব পাল খুলে দেওয়া হল। জাহাজ বেশ গতি পেল। বোধহয় ওরাদাঁড়ও বাইছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই জাহাজ গভীর সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছল। রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা আর ওদের তাড়া করল না।
রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা যুদ্ধজয়ের আনন্দে মেতে উঠল। খাওয়াদাওয়া হৈ হৈ চলল সৈন্যদের মধ্যে।
একটু রাত হতেই হৈ হৈ থেমে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে যেন শুনশান। নিস্তব্ধ চারিদিক। শুধু সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে পড়ার একটানা শব্দ।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বুকের কাছে জামার ভেতর থেকে একটা গোল করে কাটা রুটিটা বের করল। বসল। রুটি খেতে খেতে ভাবতে লাগল ও কী করবে এখন? প্রথমে আমাদের জাহাজে তো যাই, দেখি কিছু হদিশ পাই কিনা–মারিয়ার বন্ধুদের।
আজ গভীর রাত। রুটির শেষ টুকরোটা চিবুতে চিবুতে ফ্রান্সিস সমুদ্রের জলে নামল। গলা পর্যন্ত জলে এসে নিঃশব্দে সাঁতার কাটতে লাগল। আকাশের চাঁদ অনুজ্জ্বল। তবু কিছুদূর পর্যন্ত সবঅস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস সাঁতরে চলল জাহাজঘাটের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজঘাটের কাছে এলে জাহাজগুলো অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস জলে শব্দ না। করে ওদের জাহাজের কাছে এলো। হালটা ধরল। হাঁপাচ্ছিল। একটু থেমে দম নিল।
হালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে জাহাজে উঠল। কিন্তু প্রথমেই ডেক-এ নামল না। হালের আড়াল থেকে ডেক-এর দিকে তাকাল। দেখল ডেক-এ দুজন সৈন্য শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস নিঃশব্দে ওদের কাছে এলো। দেখল–দুজনই মারাত্মক আহত। জায়গাটায় শুকনো রক্ত ছড়িয়ে আছে। সৈন্যদের পোশাক দেখে বুঝল এরা নরুল্লার রাজা ভিলিয়ানের সৈন্য।
ফ্রান্সিস আস্তে সরে এলো। সিঁড়িঘরের কাছে এলো। তারপর সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নেমে এলো। প্রথম কেবিনঘরটা দেখল। আস্তে দরজা খুলল। কেউ নেই। পরেরটাতেও কেউ নেই। ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। তাহলে তো এই জাহাজে বন্ধুরা কেউ নেই।
এবার নিজের কেবিনঘরের সামনে এলো। দরজা বন্ধ। ফ্রান্সিস আশান্বিত হল। তাহলে মারিয়া নিশ্চয়ই এই ঘরে আছে। ফ্রান্সিস দরজা টোকা দিল। সঙ্গে সঙ্গে মারিয়ার গলা শুনল–কে? ফ্রান্সিস কিছু বলল না। এতক্ষণে যেন সহজে শ্বাস নিতে পারছে। দরজাটায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অল্পক্ষণ। আবার মারিয়ার কিছুটা ভীত কণ্ঠস্বরকে ওখানে? ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–আমি ফ্রান্সিস।
মারিয়া চমকে উঠল। বলল–
–তুমি? মারিয়া ছুটে এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ বুজল। দুই গালে দুটো চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস ঘরের মৃদু আলোয় দেখল সেটা। ফ্রান্সিস মারিয়ার কাঁধে হাত রাখল। মৃদুস্বরে বলল–কেঁদো না। এই তো আমি এসেছি।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসাল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল মারিয়ার মাথার চুল উস্কোখুস্কো চোখমুখ শুকনো। মারিয়ার শরীরের এই অবস্থা দেখে ফ্রান্সিসের মন যেন কেঁদে উঠল। মৃদুস্বরে বলল–মারিয়া তোমাকে এইসব দুঃসাহসিক কাজে না আনলেই বোধহয় ভালো হত। মারিয়া ম্লান হাসল। বলল–আমিই তো জোর করে তোমার সঙ্গে এসেছি। তোমার কোনো দোষ নেই।
–তবু। মন মানে না। ফ্রান্সিস বলল।
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–এবার কাজের কথা বলল। হ্যারির কোথায়?
মারিয়া অস্তে আস্তে সব বলল। সবশেষে বলল হ্যারিরা আমাদের এই জাহাজ নিয়ে নরুল্লার রাজা ভিলিয়ানের রাজধানী ভিগো গিয়েছিল। আমাকে এখানেই সেনাপতির জাহাজে রেখে গিয়েছিল। তারপর আমি আর কিছুই জানি না।
ওরা বেঁচে আছে তো? ফ্রাসিস কতকটা আপনমনেই বলল।
-না-না। বেঁচে আছে বৈকি। তুমি এই নিয়ে ভেবো না। মারিয়া বলল।
–মারিয়া খাবারদাবার কিছু আছে? ফ্রান্সিস বলল।
নিশ্চয়ই কিছু আছে। অমি প্রতিদিনই বেশি করে রাঁধছি। আশা যদি তুমি আসো। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে খেতে দাও! ফ্রান্সিস বলল।
মারিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল–
-ভেজা পোশাক ছাড়ো। আমি আসছি। ভেজা পোশাকে এতক্ষণে শরীরটা শিরশির করতে লাগল। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি পোশাক পাল্টল। শুকনো পোশাক পরে শির শির ভাবটা কেটে গেল।
