কয়েকদিন পরে সকালবেলা। সমুদ্রতীরে ভেড়ানো জাহাজ থেকে রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা দেখল–দূর থেকে তিনটি জাহাজ আসছে। তারমধ্যে একটা সাধারণ জাহাজ। বাকি দুইটি যুদ্ধ জাহাজ। রাজার সৈন্যাবাসে সেই সংবাদ পৌঁছল। সেনাপতি ছুটে এলো। বলল সবাই তৈরি হও। সেনানিবাসে সাজো সাজো রব উঠল। সৈন্যরা তলোয়ার নিল। শিরস্ত্রাণ বর্ম পরে সৈন্যাবাস থেকে বেরিয়ে এসে সামনের বড়ো মাঠটায় একত্র হল। সার বেঁধে দাঁড়াল। সেনাপতি এলো। সৈন্যরা সামনে দাঁড়াল। একটু পরেই রাজা অপৰ্তো ও এলো। সেনাপতি চিৎকার করে বলল
–আমার মহান রাজা অপৰ্তো এসেছেন। সবাই রাজার জয়ধ্বনি করো। সৈন্যরা চিৎকার করে ধ্বনি দিল–মহান রাজা অপৰ্তো দীর্ঘজীবী হোন।
এবার রাজা অপৰ্তো গলা চড়িয়ে বলল–আমাদের বীর সৈন্যরা নরুল্লার রাজা আমাদের দেশ আক্রমণ করেছে। তোমরা শৌর্যে বীর্যে অন্য কোনো দেশের চেয়ে কম। নও। নরুল্লার রাজা ভিলিয়ানকে পরাস্ত করো। ওদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দাও। রাজা থামল। সৈন্যরা আবার ধ্বনি দিল–মহান রাজা অপৰ্তো দীর্ঘজীবী হোন।
রাজা অপৰ্তো দুজন অমাত্যর সঙ্গে চলে গেল। সেনাপতির নির্দেশে একদল সৈন্য তীরসংলগ্ন জাহাজে গিয়ে উঠল। সেই জাহাজ থেকে পরে অন্য জাহাজটায় উঠল। তখনই রাজা ভিলিয়ানের প্রথম জাহাজটা রাজা অপৰ্তোর জাহাজের গায়ে এসে লাগল। রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যরা তৈরি হল। কিছু সৈন্য লাফিয়ে রাজা অপৰ্তোর জাহাজে উঠে এলো। শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। চিৎকার আহতদের আর্তনাদ গোঙানিতে ভরে উঠল এলোকাটা।
জোর লড়াই শুরু হল। রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যরা প্রথম ধাক্কায় হেরে গেল। আহত সৈন্যরা নিজেদের জাহাজে চলে গেল।
এবার রাজা অপরে সেনাপতি সমুদ্রতীরের কাছে এসে চিৎকার করে হুকুম দিল– সবাই মাঠে নেমে এসো। এবার মাঠে লড়াই হবে।
রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা তাদের দুটো জাহাজ থেকেই পাতা পাটাতন দিয়ে সমুদ্রতীরে উঠে আসতে লাগল। উঠে এসে সার বেঁধে দাঁড়াল।
রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যরা জাহাজ থেকে নেমে সেই মাঠে চলে এলো। এবার লড়াই চলল বিস্তৃত প্রান্তরে।
ফ্রান্সিস যে ঘরে বন্দী ছিল সেই ঘরের সৈন্যরা সেনাপতির হুকুম শুনে বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস একা। কিন্তু যে খবরটা দিয়ে চলে গেল সে বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল। সব। সৈন্য বেরিয়ে গেলে ঘরটার দরজা তালা দিয়ে আটকে রেখে গেল।
ফ্রান্সিস চুপ করে বসেছিল। বুঝল এই সুযোগ। পালাবার এমন সুযোগ পরে নাও আসতে পারে।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠেদাঁড়াল। কান পাতল–রাজাঅপৰ্তোর বক্তৃতা শুনল। বুঝল কিছুক্ষণের মধ্যেই লড়াই শুরু হবে। ফ্রান্সিস বাইরে লাগানো তালাটা হাত বাড়িয়ে দরজার পাল্লার ফাঁক দিয়ে দেখল–তালাটা বেশ শক্ত তালা। তালা ভাঙা যাবেনা। কড়াটা ভাঙ্গতে হবে।
ফ্রান্সিস কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে ছুটে এসে তালা কড়ার জায়গাটায় লাথি মারল। তালা ভাঙল না। কড়াও খুলল না। ফ্রান্সিস আবার লাথি মারল। তালা বা কড়া খুলল না। এবার ফ্রান্সিস গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজায় লাথি মেরে চলল।
হঠাৎ কড়া ভেঙে ছিটকে গেল। দরজা খুলে গেল।
ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ছুটে ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলো। ঠিক তখনই একজন রাঁধুনি এলো। ফ্রান্সিসকে দেখে বললকী ব্যাপার? পালাচ্ছো নাকি?
-না-না। মরণপণ লড়াই করতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
–খুব ভালো কথা। রাঁধুনি চলে গেল।
এই সুযোগ। বন্দীদশা থেকে তো পালাতে পার। কিন্তু খাব কী? ফ্রান্সিস পায়ে পায়ে রসুই ঘরে এলো। দেখল থরে থরে সাজানো সুস্বাদু গোল রুটি। ঘরে কোনো রাঁধুনি নেই। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে চারটে রুটি ঢোলা জামার গলার কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। রুটিগুলো পেটের কাছে গিয়ে ফেট্টিতে আটকে রইল।
এবার ফ্রান্সিস এক ছুটে সৈন্যাবাসের বাইরে এলো। একটা মোটা ওকগাছের পেছনে দাঁড়াল। গাছের আড়াল থেকে দেখল জাহাজগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই চলছে। রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যদের সঙ্গে রাজা অপৰ্তোর সৈন্যদের। সমস্ত এলাকা জুড়ে চলেছে। মরণোন্মুখ সৈন্যদের আর্ত চিৎকার গোঙানি। দু’দলেরই সৈন্যরা চিৎকার করছে। তলোয়ার চালিয়ে উভয়পক্ষের সৈন্যরা লড়াই করতে লাগল। ফ্রান্সিসেরও ইচ্ছা হল একটা তলোয়ার পেলে লড়াইতে নামা যেত। কিন্তু কার হয়ে লড়বোকথাটা ভেবে ফ্রান্সিস মনে মনে হাসল।
ফ্রান্সিস দ্রুতপায়ে ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। সমুদ্রের দিক থেকে জোর বাতাস ছুটছে। ধুলো বালি উড়ছে। ফ্রান্সিস চোখ কুঁচকে ছুটল।
সমুদ্রতীরে পৌঁছল। বালির ওপর বসল। দূর থেকে দেখল জাহাজঘাটে তখনও লড়াই চলছে। ও সমুদ্রের দিকে তাকাল। দেখল সবকটা জাহাজই সমুদ্রতীরে ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। ফ্রান্সিস দূরে তাকাল। নাঃ, ওদের জাহাজটা নেই। অনেক দূরে ছোট্ট একটা জাহাজ আবছা দেখল। কিন্তু সেটা ওদের জাহাজ নয়।
জাহাজঘাটায় জাহাজগুলো পালা করে দেখতে গিয়ে ওদের জাহাজটা দেখল। ওদের জাহাজ লড়াইয়ে কেন? ফ্রান্সিস কিছুই বুঝতে পারল না। হ্যারিরা বোকার মতো লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে।
কী করবে ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারিরা খুব বোকার মতো কাজ করেছে। অথবা এও হতে পারে রাজা অপৰ্তোই ওদের বাধ্য করেছে লড়াইয়ে নামার জন্যে। ওরা মারিয়াকেই বা কোথায় রেখেছে। ওরা সবাই কি আমাদের জাহাজেই আছে? এরকম নানা চিন্তা ফ্রান্সিসের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
