হ্যারি বলল–শাঙ্কো এবার বন্ধুদের ডেকে নিয়ে এসো। শাঙ্কো জাহাজঘাটের দিকে চলল। সেখানে গিয়ে দেখল মাত্র কয়েকজন বন্ধু বসে আছে।
শাঙ্কো বন্ধুদের বলল–জাহাজ কেনা হয়ে গেছে। আঙ্গুল দিয়ে খাঁড়িমতো জায়গাটা দেখাল। বলল–ওখানেই জাহাজটা দেখতে পাবেন। যে ক’জন এসেছিল তারা চলে গেল।
শাঙ্কো বসল। অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর পর ভাইকিং বন্ধুরা আসতে লাগল। শাঙ্কো তাদের জাহাজ কেনার কথা জানাল। জাহাজটা কোথায় রয়েছে তাও আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। শাঙ্কো আরো বলল একসঙ্গে যেও না। এক এক করে যাও।
শাঙ্কো হিসেব করে দেখল–আর দুজন বাকি। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই দু’জনও এলো। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। বলল–একসঙ্গে না। ছাড়া ছাড়া এসো। শাঙ্কো জাহাজের দিকে চলল।
সব ভাইকিংরা জাহাজে এসে উঠল এক এক করে। তোক ছোটো তবু জাহাজ দেখে সবাই খুশি। হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল-জাহাজটায় বেশি খাবার জল নেই। আটা ময়দা চিনও আনতে হবে। শাঙ্কো, আর একজনকে নিয়ে খাবার জিনিসগুলো কিনে আনো। অন্য দুজন যাও, জলের পিপে নিয়ে যাও। জল ভরে আনন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন খাবার জল নিয়ে ফিলে এলো। শাঙ্কোরা আটা ময়দা এসব কিনে আনল। সব মজুত করা হল। রাঁধুনি রান্না সারল। দুপুর নাগাদ সবাই খেল। খাওয়া শেষ হতে বিকেল হয়ে গেল।
সবাই কেবিনঘরে জাহাজের ডেক-এ শুয়ে বসে বিশ্রাম করছে তখনই হঠাৎ দুজন রাজা ভিলিয়নের সৈন্য তীরে এসে দাঁড়াল। তারপর জাহাজের পাতা পাটাতন দিয়ে জাহাজ উঠে এলো। দু’জন সৈন্য জাহাজে উঠে আসছে তখনই হ্যারি নিজেদের দেশীয় ভাষায় বলে উঠল–জাহাজ ছাড়ো–পালাতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে ভাইকিংরা জাহাজের পালগুলো খুলে দিল। পালগুলো বেগবান বাতাস পেয়ে ফুলে উঠল। সৈন্য দু’জন তলোয়ার খুলে এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বলল তোমাদের দলনেতা কে? হ্যারি এগিয়ে এলো।
তুমিই দলনেতা? একজন সৈন্য বলল।
হ্যাঁ। হ্যারি বলল।
–তোমরা আমাদের কয়েদঘরে বন্দী ছিলে? সৈন্যটি বলল।
–ঠিক মনে করতে পারছি না। শাঙ্কো বলল।
তোমরা কয়েদঘর থেকে ঘুলঘুলি দিয়ে পালিয়েছে। সৈন্যটি বলল।
শাঙ্কো গলা চড়িয়ে ওদের দেশীয় ভাষায় বলল–নোঙর তোলো–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাবো। একজন সৈন্য বলল–কী? তোমরা পাহারাদারদের ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছে। তাই কিনা?
ততক্ষণে জাহাজটা তীরভূমি থেকে অনেকটা চলে এসেছে। একজন সৈন্য এতক্ষণে সেটা দেখতে পেয়ে বলে উঠল–জাহাজ থামাও। ভাইকিংরা কেউ কিছু বলল না। জাহাজ আরো দূরে চলে এলো। হ্যারিরা চুপ। হঠাৎ সৈন্যটি হ্যারির সামনে এসে দাঁড়াল। হাতের খোলা তলোয়ারটা হ্যারির গলায় ঠেকিয়ে বলল–জাহাজ থামাও নইলে মরবে। শাঙ্কো বলে উঠল–ভাই–এদিকে এসো।
–কেন? হ্যারির গলা থেকে তলোয়ার না সরিয়ে বলল সৈন্যটি।
–একটা গোপন কথা আছে। শাঙ্কো বলল।
–ওখান থেকেই বলল। সৈন্যটি বলল।
–তা বলা যাবে না। জাহাজের এদিকটায় এসে দেখো। সৈন্যটি শাঙ্কোর কাছে এলো। শাঙ্কো বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে সৈন্যটিকে ল্যাঙ মারল। সৈন্যটি পাক খেয়ে ডেক-এর ওপর গড়িয়ে পড়ল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। শাঙ্কো দ্রুতহাতে তলোয়ারটা তুলে নিল। সৈন্যটি আস্তে আস্তে উঠে বসল। উঠে দাঁড়াল। অন্য সৈন্যটি এবার শাঙ্কোর দিকে খোলা তলোয়ার হাতে এগিয় এলো।
শাঙ্কো বলল–এখন আমার হাতেও তলোয়ার।
বেশ তো। লড়াই হবে। সৈন্যটি আক্রমণোদ্যত হল। শাঙ্কো বলল
–আক্রমণ করার আগেই তুমি খতম হয় যাবে। ভালো কথা বলছি শোনো জাহাজ এখনও তীরের কাছেই আছে। প্রাণে বাঁচতে চাও তো জলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। সাঁতরে তীরে গিয়ে ওঠো।
–না। আমরা লড়বো। সৈন্যটি বলল।
–তাহলে দেখো। লড়াই হোক। শাঙ্কো বলল।
সৈন্যটি তলোয়ার হতে এগিয়ে এলো। শাঙ্কো দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল তলোয়ার চালাল। সৈন্যটির ডান বাহু লম্বালম্বি কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। সৈন্যটি বসে পড়ল। কিন্তু হার মানল না। উঠে দাঁড়াল। তলোয়ার উঁচিয়ে এগিয়ে এলো। শাঙ্কো এক লাফে এগিয়ে এসে ওর তলোয়ারে নিজের তলোয়ার দিয়ে এত জোরে ঘা মারল যে সৈন্যটির হতের তলোয়ার ছিটকে গেল। শাঙ্কো এবার এসে সৈন্যটির পেট জড়িয়ে ধরল। তারপর ওকে এক ধাক্কায় রেলিঙের গায়ে ফেলল। তারপর কোমর ধরে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে দিল। সৈন্যটি কাটা হাত নিয়ে কোনোরকমে সাঁতরে চলল জাহাজঘাটের দিকে। শাঙ্কো ঘুরে দাঁড়াল। অন্য সৈন্যটির দিকে তাকাল। সৈন্যটি তখন ভয়ে কাঁপছে। শাঙ্কো বলল–এবার জলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। সৈন্যটি আর কোনোদিকে তাকিয়ে রেলিঙ থেকে সোজা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জাহাজঘাটের দিকে সাঁতরে চলল দুজনেই।
হ্যারিদের জাহাজ চলল। ফ্লেজার জাহাজ চালাচ্ছিল। ওর মনের খুঁতখুঁতানি যায় না। এত ছোটো জাহাজ চালিয়ে কোনো আনন্দ নেই।
পরদিন দুপুর নাগাদ জাহাজ রাজা অপৰ্তোর রাজ্যের জাহজঘাটের কাছে এলো। দূর থেকে হ্যারিরা দেখল জাহাজঘাটে জোর লড়াই চলছে। হ্যারিরা দূর থেকেই অস্পষ্ট শুনতে পেল সৈন্যদের চিৎকার ধ্বনি হৈ হৈ। হ্যারি ফ্লেজারের কাছে এলো। বলল– আমরা বেশ দূরে থাকবো। এখানেই নোঙর ফেল। ঘর ঘর শব্দে নোঙর ফেলা হল।
ওদিকে রাজা অপৰ্তোর সৈন্যদের আবাসে ফ্রান্সিসের একঘেয়ে দিন কাটতে লাগল। ঘরটায় সৈন্যরা থাকে। তারা ফ্রান্সিসকে বলে–যুদ্ধ শেষ না হলে তোমার মুক্তির আশা নেই। তাই ফ্রান্সিসও দিন গোণে। কতদিন কেটেছে এখানে। ফ্রান্সিস সেই নকশা আর লেখার কাগজটা সাবধানে রাখে। সবসময় নকশার কাগজটা কোমরের ফেট্টির মধ্যে গুঁজে রাখে। দু-চারজন সৈন্য ফ্রান্সিসের কাছে আসে। ও নিশ্চয়ই মুক্তি পাবে এইসব বলে। কিতান নামে একটা সৈন্যের সঙ্গে ফ্রান্সিসের খুব ভাব হয়েছে। কিতানই ফ্রান্সিসকে সব খবর দেয়। আর কয়েকদিনের মধ্যেই যে লড়াই শেষ হবে কিতান এ বিষয়ে নিশ্চিত।
