হ্যারিদের ভাগ্য ভালো। পথে কোনো সৈন্যের সঙ্গে দেখা হলনা। দেখা হলে ভাগ্যে ভোগান্তি ছিল।
হ্যারিরা যখন জনশূন্য পথ দিয়ে এসে জাহাজঘাটে পৌঁছল তখন পুব আকাশে লাল ছোপ ধরেছে। কিছু পরেই সূর্য উঠল।
হ্যারি যে ভয়টা পেয়েছিল তাই হল। জাহাজঘাটায় এসে ওরা দেখল ওদের জাহাজটা নেই। আট-দশটা জাহাজ রয়েছে এই বন্দর শহরে। কিন্তু ওদের জাহাজটা নেই।
হ্যারিরা সমস্ত জাহাজঘাটা এলোকা ঘুরে ঘুরে দেখল। কিন্তু কোথায় ওদের জাহাজ? হ্যারি জাহাজঘাটার পাথরের ঘাটে বসে পড়ল। বন্ধুরাও কেউ কেউ দাঁড়িয়ে রইল কেউ কেউ বসল। হ্যারি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর মুখ তুলে বলল– উপায় নেই। এখানেই একটা জাহাজ কিনতে হবে।
–কিন্তু বিক্রি করবে এমন জাহাজ কি এখানে পাওয়া যাবে? শাঙ্কো বলল।
–চেষ্টা তো করতে হবে। তরপর দেখা যাক। হ্যারি বলল। বন্ধুরাও এই প্রস্তাবে সম্মত হল। তখন হ্যারি শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো তোমার কাছে ক’টা সোনার চাকতি আছে বলো। শাঙ্কো একবার আড় চোখে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে দেখে নিল। তারপর ফেট্টি থেকে সোনার চাকতিগুলো বার করে গুণল বলল–একশ চল্লিশটা স্বর্ণমুদ্রা আছে।
–দেখা যাক যারা বিক্রি করবে তারা কত চায়। হ্যারি বলল। হ্যারি উঠেদাঁ ড়াল। বলল সবাই দল বেঁধে বেরুলে সহজেই রাজা ভিলিয়ানের সৈন্যদের চোখে পড়ে যাবো। তা ছাড়া এতক্ষণে পাহারাদাররা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে আমার পালিয়েছি। কাজেই সবাই এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ো। আমি আরশাঙ্কো একসঙ্গে থাকবো। জাহাজ কেনার জন্যে ঘণ্টাখানেক চেষ্টা করবো। তারপর জাহাজ পাই বা না পাই সবাই এখনে আসবো। ঠিক এক ঘণ্টা পরে তোমরাও একে একে এই ঘাটে আসবে। একসঙ্গে নয়। এইভাবে দল বেঁধেও থাকবো না। তোমরা এলে শাঙ্কো তোমাদের কাছাকাছি এসে জাহাজ কেনা হয়েছ কিনা সেটা ফিস ফিস করে বলবে। না কেনা হলে এখন কী করবো সেটাও শাঙ্কো বলে দেবে।
সবাইছড়িয়ে পড়ল। হ্যারি তীরে বাঁধা জাহাজগুলোয় উঠতে লাগল। বলতে লাগল– জাহাজটা বিক্রি করবেন কিনা। জাহাজের ক্যাপ্টেন মাথা নেড়ে বলল–না। অন্য জাহাজ দেখুন। প্রায় সবকটা জাহাজেই হ্যারি গেল। কিনতে চাইল। কেউ রাজি হল না।
একটা জায়গায় দেখল সমুদ্রের জল খড়ির মতো একটা জায়গায় ঢুকে গেছে। সেখানে জলে ভাসছে একটা ছোটো জাহাজ।
–চলো শাঙ্কো–এই ছোটো জাহাজটাও দেখা যাক। হ্যারি বলল।
দুজনে তীরে রাখা পাটাতনটা দিয়ে জাহাজে উঠল। তিনজন নাবিক ডেকটা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছিল। ওদের একজনকে হ্যারি বলল—এই জাহাজের মালিকের সঙ্গে দেখা করবো।
–মালিক কে আমরা জানি না। আমাদের ক্যাপ্টনইসব। তার সঙ্গে দেখা করতে পারেন। হ্যারিরা কথা বলছে তখনই ক্যাপ্টেন ওদের দেখল। ক্যাপ্টন কাছে এলো। বেশ ভারি গলায় বলল–আপনাদের পরিচয়?
–আমরা ভাইকিং। দেশে দ্বীপে ঘুরে বেড়াই। হ্যারি বলল।
–ও। ক্যাপ্টেন চিবুকের কাঁচাপাকা দাড়ি চুলকে বলল–আপনারা এই দেশে এসেছেন কেন।
–অল্প কথায় তা বলা যাবে না আসার কারণ–আপনারা যদি এই জাহাজটা বিক্রি করেন আমরা কিনতে পারি। শাঙ্কো বলল।
–দেখুন ক্যাপ্টেন বলল–এই জাহাজটা আমরা বিক্রি করবো। তারপর লিসবনে চলে যাবো। ক্যাপ্টেন বলল।
–তাহলে আপনারা বিক্রি করবেন? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। অনেক ভেবেই স্থির করেছি জাহাজটা বিক্রি করে দেব। ক্যাপ্টেন বলল।
–কটা সোনার চাকতি লাগবে? হ্যারি বলল।
–সেটা পরে বলছি। আগে জাহাজটা ঘুরে দেখুন। ক্যাপ্টেন বলল।
–ঠিক আছে। হ্যারি বলল।
হ্যারি শাঙ্কোকে নিয়ে জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখল। খুব দামি জাহাজ নয়। তবে মোটামুটি সব ব্যবস্থাই আছে। জাহাজের ডেক কেবিনঘর স্নানঘর খুবই নিকৃষ্টমানের। ভাইকিংদের ছেলেবেলা থেকেই দুটো জিনিস দেখে শেখে–এক সমুদ্রে দুই জাহাজ নৌকো। ওদের অর্থ বেশি নেই। কাজেই উমানের জাহাজের দাম দেওয়া ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই ছোটো জাহাজটা কেনার চেষ্টা করল। এসব ভেবে হ্যারি স্থির করল এই জাহাজটাই কিনবে।
দুজনে জাহাজ দেখোপ্টেনেরকাছে এলো। ন্যাপ্টেন বলল–কেমন দেখলেন জাহাজটা?
–ভালো। এখন আসল কথা কত সোনার চাকতিতে বিক্রি করবেন? হ্যারি বলল।
–আপনারা কীসে দাম দেবেন? ক্যাপ্টেন বলল।
–আমাদের কাছে স্থানীয় মুদ্রা নেই। এই সোনার চাকতিগুলো আছে। কথাটা বলে শাঙ্কোর দিকে তাকাল। শাঙ্কো ফেট্টির ভাজ খুলে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করল। সোনার চাকতি দেখে ক্যাপ্টেনের চোখ দুটো লোভে চিকচিক্ করে উঠল।
–ঠিক আছে। দশটা চাকতি দেবেন। ক্যাপ্টেন বলল।
অত পারবো না। আটটা সোনার চাকতি দেব। শাঙ্কো বলল।
এত কমে কি হয়? ক্যাপ্টেন হেসে বলল।
–এর বেশি আমরা দিতে পারবো না। হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে–একটা সোনার চাকতি কম দিন। মানে–নটা সোনার চাকতি দিন। ক্যাপ্টেন বলল।
হ্যারি আর কথা বাড়াল। শাঙ্কোকে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো গুণে গুণে ন’টা সোনার চাকতি ক্যাপ্টেনকে দিল।
–আপনারা কবে এই জাহাজে আসবেন? ক্যাপ্টেন বলল।
–আমরা বলতে গেলে এসেই গেছি। হ্যারি বলল।
তার মানে? ক্যাপ্টেন বলল।
এখন আমরা এই জাহাজেই থাকবো। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। আমরা নেমে যাচ্ছি। ক্যাপ্টেন বলল।
ক্যাপ্টেন ওর কেবিনঘরে ঢুকল। সব গুছিয়েগাছিয়ে একটু পরেই বাক্স প্যাটরা হাতে বেরিয়ে এলো। তিনজন নাবিককে ডাকল। প্রত্যেককে কিছু মুদ্রা দিল। তারপর পাটাতন দিয়ে নেমে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সদর রাস্তায় ভিড়ে মিশে গেল।
