শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। ফিস ফিস করে বলল–ভাইসব কাছে এসো। সবাই শাঙ্কোর কাছে এলো।
আমি এখান থেকে পালাবার জন্যে একটা পরিকল্পনা করেছি। হ্যারিকে বলেছি। সেই পরিকল্পনা তোমাদের বলি। একমাত্র এইভাবেই পালানো সম্ভব। শাঙ্কো থামল। তার পর হ্যারিকে যেমন বলেছিল তেমন করে চাপা গলায় সব বলে গেল। শাঙ্কোর কথা শেষ হলে ভাইকিং বন্ধুরা মৃদুস্বরে ধ্বনি তুলল–ও হো-হো।
শাঙ্কো বসল। বলল–হ্যারি, এবার সময়টা ঠিক করো। হ্যারি বলল–দিনে তো পারা যাবেই না। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর।
–আজকেই, বলল শাঙ্কো।
বেশ আজকেই পালাবো। হ্যারি বলল।
দিন শেষ হল। রাতে হ্যারিদের খেতে দেওয় হল। খাওয়া শেষ করে সবাই শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো বাদে। শাঙ্কো তখনও ঐ পরিকল্পনাটা ভাবছে। সম্ভাব্য ঘটনাও ভাবছে। মোটকথা শাঙ্কো সবদিক ভেবে স্থির সঙ্কল্পে এলো।
তখন রাত শেষ। হঠাৎ কয়েদঘরে হৈ চৈ শুরু হল। প্রথমেই শাঙ্কোরা রাজা অপৰ্তোর যে ক’জন সৈন্য বন্দী ছিল তাদের ওপর চড়াও হল রাজ অপৰ্তোর সৈন্যরা অবাক। শুরু হল ধাক্কাধাক্কি। ভাইকিংরা নিজেদের মধ্যেও মারপিট শুরু করল।
তিনজন প্রহরী ছুটে এলো। দরজার কাছে দাঁড়াল। মারামারি দেখল। গলা চড়িয়ে বলল প্রহরীরা মারামারি থামাও নইলে আমি দলপতিকে খবর দিতে যাচ্ছি। হ্যারি চাপা গলায় বলল–চালাও। ভাইকিংরা চিৎকার করতে করতে পরস্পরের ঘাড়ে লাফিয়ে উঠতে লাগল।
তিন প্রহরী সমস্যায় পড়ল। কী করবে বুঝে উঠতে পারলনা। একজন ছুটল দলপতির বাড়ির দিকে। মারামারি গোলমাল কিছুটা থামল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই দলপতি এলো। আবার চিৎকার চ্যাঁচামেচি জোরে শুরু হল। দলপতি গলা চড়িয়ে বলল–এসব মারপিট এখানে চলবে না। থামো সব। কে কার কথা শোনে। হ্যারি বন্ধুদের কাছে এসে আস্তে বলে গেল–কয়েকজন মেঝেয় পড়ে যাও। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন ভাইকিং পর পর মেঝেয় পড়ে গেল। দলপতি প্রহরীদের দরজা খুলতে বলল। দরজা খোলা হল। দলপতি এগিয়ে গেল। চিৎকার করে বলে উঠল–এসব গুণ্ডামি বন্ধ করো। নইলে চাবুকের মার খাবে।
মারামারি হৈহল্লা আরও বেড়ে গেল। হ্যারি দলপতির কাছে গেল। বলল–যদি আমার কথা শোনেন তো বলি।
-বলো। দলপতি বলল।
–এরা সবাই গুণ্ডা খুনে। এদের হাত বেঁধে দিন। তাহলে আরমারামারিকরতে পারবে না।
–ঠিক আছে। তাই করছি। সেনাপতি বলল। তারপর প্রহরীদের ডাকল। প্রহরীরা দলপতির কাছে এগিয়ে গেল। দলপতি বলল–সব কটার হাত বাঁধ। যদি তার পরেও মারামারি করে সবকটাকে চাবুক মার। কেউ যেন বাদ না যায়।
দলপতি চলে গেল।
এবার হ্যারি প্রহরীদের বলল–শক্ত দড়ি এনে বাঁধো সবকটাকে।
দুজন প্রহরী দড়ি আনতে ছুটল। একটু পরে লম্বা দড়ি আনল। দড়ি দিয়ে হ্যারি ভাইকিং বন্দীদের দুহাত বাঁধতে লাগল। রাজা অপৰ্তোর বন্দী সৈন্যরাও বাদ গেল না। দড়ি বাঁধা হলে হ্যারির হাতও প্রহরীরা দড়ি দিয়ে বাঁধল। হ্যারি দেশীয় ভাষায় বলল– গণ্ডগোল কমাও। ভাইকিংরা চুপচাপ মেঝেয় পাতা কাপড়ে বসে পড়ল।
হ্যারি প্রহরীদের বলল–ভাই একটা কাজ করো। প্রত্যেক দড়ি বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে একটা লম্বা শক্ত দড়ি ঢুকিয়ে দাও। সবাই বাঁধা পড়ে যাবে। গণ্ডগোল কমবে।
প্রহরীরা তাই করল। এবার সব চুপ।
প্রহরীরা বেরিয়ে গেল। বাইরের বারান্দায় গিয়ে পাহারা দিতে লাগল।
রাতের খাওয়াদাওয়া মিটল। প্রহরীরা এঁটো কাঠের বাসন গ্লাশ নিয়ে চলে গেল। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। গলার ঢোলা ফাঁক দিয়ে হাত ঢোকাল। ছোরাটা বের করল। তারপর সবাইর হাত বাঁধা দড়ি কেটে দিল। রাত বেশি হতে লাগল। ভাইকিংরা সবাই চুপচাপ শুয়ে রইল।
গভীর রাত তখন। শাঙ্কো আবার উঠে বসল। তারপর লম্বা দড়িটা একমাথা থেকে টেনে টেনে সবটা খুলে নিল। লম্বা দড়ির একটা মাথায় পাথরের টুকরো বাঁধল। তারপর দড়িটা দোলাতে লাগল। একবার বেশি করে দুলিয়ে নিয়ে উপরের দিকে কড়িকাঠ লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। মাথাটা কড়িকাঠের আর ছাতের মধ্যে দিয়ে পাথর বাঁধা মুখটা নীচে পড়ে গেল। শাঙ্কো দড়ির মুখটা এবার কোমরে বেঁধে নিল। বন্ধুরা দড়ির অন্য মুখটা টেনে ধরল। শাঙ্কো এবার দড়ি ধরে ধরে আস্তে আস্তে উঠে কড়িকাঠটা ধরল। তারপর ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে চলল খোদলটার দিকে। তখনই হঠাৎকড়িকাঠের কাঠটায় মচ্ করে শব্দ হল। শাঙ্কো সাবধান হল। খুব আস্তে আস্তে ঝুলতে ঝুলতে খোদলটার কাছে এলো। তারপর মাথাটা খোঁদলে ঢুকিয়ে দিয়ে পার হল। ওধারে গিয়ে এবার থামতে লাগল। ঘরে তখন কয়েকজন বন্ধু দড়িটা টেনে ধরে রাখল। শাঙ্কো আস্তে আস্তে মাটিতে নেমে এলো৷ একবার দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখল। একটা মাঠমতো জায়গা পরে পাথরের বাড়িঘর। কোনো বাড়িঘরেই আলো নেই। শাঙ্কো কোমরের বাঁধা দড়ি খুলল।
এবার প্রথমে দড়ি ধরে উঠতে লাগল ভেন। বেশ কসরৎ করেই ভেন খোঁদলে গিয়ে পৌঁছল। তারপর মাথা ঢুকিয়ে খোঁদলের বাইরে চলে এলো। শাঙ্কো দড়িটা টেনে ধরে রইল। ভেন আস্তে আস্তে নেমে এলো। ভেন তখন বেশ হাঁপাচ্ছে। রাজা অপৰ্তোর বন্দী সৈন্যরা একে একে বেরিয়ে এলো কয়েদঘর থেকে। একইভাবে সবাই কয়েদঘরের বাইরে চলে এলো। শাঙ্কো বলল–জাহাজঘাটে যাওয়ার রাস্তাটা কোনদিকে বুঝতে পারছি না।
–আমাদের দক্ষিণমুখে যেতে হবে। তারপর সেদিকে হাঁটতে লাগল। চাঁদের আলো খুব বেশি নয়। সেই আলোতে হ্যারিরা এগিয়ে চলল। মিনিট দশ-পনেরো হাঁটার পরই বাঁ দিকে দেখল বড়ো রাস্তা। চলেছে দক্ষিণমুখো। হ্যারি ঐ দিকেই চলল।
