একটা বেশ বড়ো পাথরের বাড়ির সামনে হ্যারিদের থামতে বলা হল। বাড়িটার তুলনায় প্রবেশ দ্বার খুবই ছোটো একজন একজন করে ঢোকা যায়। প্রবেশ দ্বারের দুপাশে চার-পাঁচজন প্রহরী। হাতে বর্শা। কোমরে তলোয়ার গোঁজা।
হ্যারি ঘুরে দাঁড়াল। দলপতির কাছে গেল। বলল–এটা কয়েদখানা আমরা। এখানে এসে কয়েদখানায় থাকবো সেনাপতির সঙ্গে তো তেমনি কথা হয় নি।
–আমি নিরুপায়। এটা সেনাপতির হুকুম। দলপতি বলল। হ্যারি দুহাত তুলে চিৎকার করে বলল–আমরা এই কয়েদখানায় ঢুকবো না। আমাদের সরাইখানায় রাখা হোক। ভাইকিং বন্ধুরাও ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝতে পারলো। ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল–ও– হোহো। ভাইকিংদের ক্রুদ্ধ চেহারা দেখে দলপতি একটু ঘাবড়ে গেল। হ্যারি উল্টেদিকে হাঁটতে লাগল। বন্ধুরাও ওর পেছনে এসে দাঁড়াল। বিস্কো চিৎকার করে বলে উঠল– এই বাড়িতে আমরা ঢুকবো না। আমাদের কোনো সরাইখানায় নিয়ে যেতে হবে। শুরু হল হৈ হল্লা। হ্যারিরা তখন সারি ভেঙে ফেলেছে। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বলল সবাইকে ঘিরে রাখো। সৈন্যরা পরস্পর হাত ধরে হ্যারিদের আটকে রাখল। দলপতি দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বলল–তোমরা শোনেনা। এটা সেনাপতির হুকুম। আমাকে মানতেই হবে। যদি না মানি তাহলে আমাকে মরতে হবে। তোমরা কি চাও আমার মৃত্যু হোক। আমিও তো তোমাদের সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করি নি।
হৈ হল্লা কমল। হ্যারি ভেকে বলল ফ্রান্সিস নেই। আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।
–বাধা দিয়ে লাভ নেই। ওরা সংখ্যায় বেশি। তার ওপর আমরা নিরস্ত্র। ওরা যদি তলোয়ার চালায় আমরা কেউ বাঁচবোনা। বন্দী জীবন মেনে নাও। এখন এটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। হ্যারিও সেটা বুঝতে পারছিল। জাহাজঘাটা থেকে আরো যে সৈন্য ওদের সঙ্গে এলো এটাও সেনাপতির ধূর্তামি।
হ্যারি গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব। এখন এভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে আমরই বিপদে পড়বো। আমরা নিরস্ত্র নিরুপায়। এখন বন্দীদশা মেনে নাও। আমার অনুরোধ শান্ত হও। সময় ও সুযেগ নিশ্চয়ই আসবে। তার জন্যে বেঁচে থাকতে হবে। সশস্ত্র সৈন্যরা যদি আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমরা কেউ বাঁচবো না। হৈ হট্টগোল থেমে গেল।
ভাইকিংরা অস্তে আস্তে লোহার দরজা দিয়ে ঢুকতে লাগল। ঢোকার আগে শাঙ্কো জোর গলায় বলে উঠল–সেনাপতি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। হ্যারি জোরে বলে উঠল–শাঙ্কো–শান্ত হও। মাথা গরম করো না।
সবাই ভেতরে ঢোকার পর হ্যারি ঢুক। একটা চত্বরমতো পার হয়ে সারি সারি ঘর। প্রত্যেকটি ঘরের সম্মুখে প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ঘরটি ছেড়ে তৃতীয় ঘরটার সামনে এলো সবাই। দলপতি দাঁড়াতে হুকুম দিল। ভাইকিংরা দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রহরী চাবি দিয়ে দরজা খুলল। বেশ শব্দ করে দরজাটা খুলল। ভাইকিংরা ঘরটায় ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়ো। কাঠপাথর আর ঘাস দিয়ে তৈরি ছাতের কাছাকাছি দুদিকে দুটো জানালা। জানালা দুটোতে গরাদ নেই। মেঝেয় একটা মোটা কাপড় পাতা। কাপড়টায় সুতোর কাজ করা। দুদিকের দুটো পাথুরে দেয়ালে দুটো আংটায় লাগানো আছে দুটো মশাল। তার একটা এই দিনের বেলাতেও জ্বলছে।
মেঝেয় শুয়ে ছিল তিনজন বন্দী। হ্যারিদের দেখে দুজন উঠে বসল। হ্যারিরা ততক্ষণে বসে পড়েছে। পুরানো বন্দীদের একজন বলল–তোমরা কারা? দেখে মেনেহচ্ছে তোমরা বিদেশি।
হ্যাঁ ঠিকই ধরেছে। আমরা ভাইকিং। দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। কথাটা বলে হ্যারি মোটা কাপড়টায় শুয়ে পড়ল। মাথার পেছনে দুহাতের তেলো রাখল। তারপর চোখ পুঁজল। অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। ফ্রান্সিস এখনও মুক্তি পেল না। পালাতেও পারল না। রাজকুমারী রইলেন সেনাপতির জাহাজে। ওরা নিজেরা এখানে বন্দী হয়ে রইল। এটা অপ্রত্যাশিত। এখান থেকে মুক্তি পাবো কবে। হয় তো এখানেই সবাই এক এক করে মরবো। ফ্রান্সিস, রাজকুমারীর সঙ্গে হয়তো আর দেখাই হবে না।
হ্যারি চোখ খুলল। তাকিয়ে রইল ছাতের দিকে। কাঠ পাথর আর শুকনো লম্বা লম্বা ঘাসে তৈরি ছাতটা। তারপর তাকালো জানালা দুটোর দিকে। জানালা পর্যন্ত উঠতে পারলে গরদহীন জানালা দিয়ে পালানো সম্ভব। সেটা কীভাবে। সম্ভব?
শাঙ্কো এসে হ্যারির কাছে বসল। ওপরের দুটো খোঁদল দেখিয়ে বলল–হ্যারি যদি ঐ খোদলটার কাছে কোনোরকমে পৌঁছানো যায় তবে আমরা মুক্ত হতে পারবো। হ্যারি খোদল দুটো ভালো করে দেখল মেঝে থেকে খোদল দুটোর উচ্চতা হিসেব করল। বলল–হ্যাঁ এটা সম্ভব। কিন্তু অত উঁচুতে পৌঁছোতে পারলে তবে তো।
–হু–অত উঁচুতে পৌঁছোনোটাই আসল সমস্যা। শাঙ্কো বলল।
–আগে সেটাই ভাবো। হ্যারি বলল।
— হু ভাবছি। শাঙ্কো থামল। তরপর বলল–হ্যারি, প্রথমেই চাই একগাছা দড়ি।
–এখানে দড়ি পাবে কি করে? হ্যারি বলল।
–পাবো। শোনো হ্যারি–আমরা নিজেদের মধ্যে মারপিট শুরু করব। গোলমাল থামাতে প্রহরীরা নিই ঘরের মধ্যে ঢুকবে। আমরা তবু মারপিট চালিয়ে যাবো। প্রহরী থামাবার চেষ্টা করবে। কিন্তু আমরা থামবো না। ওরা দলপতিকে খবর দেবে। দলপতি আসবে। জানতে চাইবে এরকম মারামারির কারণ কী? তুমি দলপতিকে বলবে এরা সবাই গুণ্ডা খুনে। সবাইকে দড়ি দিয়ে বাঁধুন। আবার মারপিট শুরু করবে। দলপতি প্রহরীদের দড়ি এনে বাঁধতে বলবে। প্রহরী দড়ি কেটে ছোটো করে হাত বাঁধবে। এইবার হল বুদ্ধির খেলা। তুমি প্রহরীদের বলবে বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে একটা লম্বা দড়ি ঢুকিয়ে দাও। সবাই একসঙ্গে বন্দী হয়ে থাকবে। আর মারপিট করতে পারবে না। ঐ দড়ির সঙ্গে একটা পাথরের টুকরো বেঁধে কড়িকাঠের ফাঁকের মধ্যে দিয়ে দড়ি নিয়ে আসবো। এবার দড়ি বেয়ে উঠে ঐ খোদল দিয়ে বাইরে যাওয়া আর পালানো। হ্যারি শাঙ্কোর পরিকল্পনা ভেবে দেখল। হাসল। বলল–সাবাস শাঙ্কো। তুমি ফ্রান্সিসের মতোই সমস্যার সমাধান করতে শিখেছো। দেখো চেষ্টা করে।
