–এখানে মরা গাছটার গোড়ায় কী ঢালছিলেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–ওষুধ। বৈদ্য বলল।
–কী ওষুধ? শাঙ্কো বলল।
–সেটা বললেও আপনি বুঝবেন না। তবুবলি ওষুধটার নাম উজিমা–গ্রীক শব্দ। অর্থ–জীবন। বৃদ্ধ বৈদ্য বলল।
–ঐ ওষুধ ঢাললেন কেন? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
–যাতে গাছটা বেঁচে থাকে। বৃদ্ধ বলল।
–গাছটা তো মরে গেছে। শাঙ্কো বলল।
–না। একেবারে মরে যায় নি। ওষুধ পেলে কোনোদিন মরবে না। বৈদ্য বলল।
–কেন ওষুধ দিচ্ছিলেন? শাঙ্কো বলল।
–আমরা বংশপরম্পরায় এই কাজটা করে আসছি। অবশ্যই গভীর রাতে এসে ওষুধটা দিই। বৃদ্ধ বৈদ্য বলল।
–ওষুধ কি প্রতিদিন দিয়ে থাকেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–না। মাসে একবার। বৃদ্ধ বলল।
–তাতে কি গাছটা বেঁচে যাবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। বৈদ্য বলল।
–বেশ। কিন্তু গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন কেন? শাঙ্কো বলল।
–সে অনেক কথা। যখন রাজা ওভিড্ডো এখানে রাজত্ব করতেন–তখন আমাদের পূর্বপুরুষ একজন রাজা ওভিচ্ছোকে কঠিন ব্যাধি থেকে চিকিৎসা করে সুস্থ করেছিলেন। রাজা সুস্থ হয়ে একদিন গভীর রাতে আমাদের পূর্বপুরুষ চিকিৎসককে একা এখানে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি নাকি বলেছিলেন–আপনি কি এই গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন? আমাদের পূর্বপুরুষ বলেছিলেন–একটা ওষুধ আমি আবিষ্কার করেছি সেটা মাসে একবার করে এই গাছটার গোড়ায় দিলে গাছটি মরবে না। বৃদ্ধ বলল।
–তবে মানুষের ওপরও কি ওষুধটা প্রয়োগ করা যায় না? শাঙ্কো বলল।
–না। এটা শুধু গাছকেই চিরজীবী করতে পারে। বৃদ্ধ বলল।
–আচ্ছা–ওষুধ দিয়ে এই গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে কি রাজা ওভিড্ডোর অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? শাঙ্কো জানতে চাইল।
বলতে পারবো না। বৃদ্ধ বলল।
–স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গাছটা মরে গেছে। শাঙ্কো বলল।
না। মরে যায় নি। আপনার বেলচাটা দিয়ে গাছটার কাণ্ডে জোরে খোঁচা দিন। বৃদ্ধ বলল।
শাঙ্কো বেলচাটা দিয়ে গাছটায় জোরে খোঁচা দিল। একটু পরে শাঙ্কো খোঁচা দেওয়া জায়গাটায় আঙ্গুল দিয়ে ঘষল। দেখল ভেজা ভেজা। কী যেন লেগেছে। গাছের রস। তাহলে তো গাছটা বেঁচে আছে। এ তো অকল্পনীয়।
–দেখলেন তো গাছটা এখনও জীবিত। বৃদ্ধ বৈদ্য বলল।
—হ্যাঁ। তাই তো দেখছি। শাঙ্কো বলল।
হঠাৎ নিস্তব্ধ বনটায় ঝরাপাতা ভাঙার শব্দ হল। শাঙ্কো আর বৃদ্ধটি চমকে উঠল। শাঙ্কো একটা ঝোপে বেলচাটা ছুঁড়ে ফেলে ছুটল পশ্চিমদিক লক্ষ্য করে। বৃদ্ধটি পালাতে গিয়ে আর পারল না। রাজা অপৰ্তোর সৈন্যরা ওকে ঘিরে ধরল।
দাড়িগোঁফওয়ালা সেই দলনেতা এগিয়ে এলো। বলল তুমি কে?
–আমি একজন কবিরাজ। এখানেই থাকি। বৃদ্ধ বলল।
–এখানে কী করছো? দাড়িগোঁফওয়ালা জিজ্ঞেস করল।
–আমার এক বন্ধু আমাকে গভীর রাতে এখানে আসতে বলেছিল। বৃদ্ধ বলল।
–কেন?
–তা জানি না। বৃদ্ধ বলল।
বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল? দাড়িগোঁফওয়ালা জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। কিন্তু আপনারা এসে পড়ায় বন্ধুটি পালিয়েছে। বৃদ্ধটি বলল।
–ঠিক আছে। আপনাকে বন্দী করা হল। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–কিন্তু আমি তো কোনো অপরাধ করি নি। বৃদ্ধ কবিরাজ বলল।
–এখন আমরা লড়াইয়ের মুখে। এসময় গভীর রাত–আপনার বন্ধু এই জঙ্গলে এসব সন্দেহজনক ব্যাপার। কে জানে। হয়তো শত্রুপক্ষকে নির্দেশ দিতে এসেছিলেন। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
–দোহাই–আমি গুপ্তচর নই। বৃদ্ধ কবিরাজ বলল।
–সেসব পরে দেখা যাবে। চলুন। দাড়িগোঁফওয়ালা বলল।
দাড়িগোঁফওয়ালা দলনেতা বলল-চলো সব। সৈন্যরা ওর পেছনে পেছনে চলল।
ওদিকে শাঙ্কো চেস্টনাট গাছের জঙ্গলের মধ্যে যথাসাধ্য দ্রুত ছুটল সমুদ্রের দিকে।
শাঙ্কো হাঁপাতে হাঁপাতে দূরবিস্তৃত সমুদ্রতীরে এসে পৌঁছল। দেখল চাঁদের আলো অস্পষ্ট। সমুদ্রে ঢেউও তেমন নেই। খুবই শান্ত সমুদ্র। হাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। বন্দরের দিকে তাকাল। দেখল দুটো জাহাজ অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওদের জাহাজ দেখা যাচ্ছে না।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে সমুদ্রে নামল। তারপর ছোটো জঙ্গলের ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে চলল।
দূর দিয়ে রাজা অপৰ্তোর যুদ্ধ জাহাজ পার হল। এবার ওদের জাহাজটা দেখা গেল।
শাঙ্কো সাঁতরে চলল। সাঁতরে এসে নিজেদের জাহাজের হালটা ধরল। হাঁপাতে লাগল। মুখ হাঁ করে। পুব আকাশে তখন সূর্য উঠছে।
শাঙ্কো হালের খাঁজে পা রেখে জাহাজে উঠল।
জাহাজের ডেক এ চার-পাঁচজন বন্ধু ঘুমিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুতিনজন শাঙ্কোকে দেখে এগিয়ে এলো। বলল–কী ব্যাপার শাঙ্কো। একজন বললতুমি কি স্নান করলে?
–মুণ্ডু। শোন্–হ্যারিকে এখানে আসতে বল্। একজন চলে গেল হ্যারিকে ডাকতে। একটু পরেই হ্যারি এলো। শাঙ্কোর ঐ অবস্থা দেখে বলল
-কী ব্যাপার শাঙ্কো? জলে নেমেছিলে কেন?
শাঙ্কো আস্তে আস্তে সব বলল। হ্যারি বলল–খুব বেঁচে গেছো। যাক গে–বোঝা যাচ্ছে–ঐ মরা গাছটার গুরুত্ব আছে। এখন চাই ফ্রান্সিসের মুক্তি। ততদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
হ্যারি –কয়েকটা ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছি না। সব গাছ ছেড়ে মরা গাছটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কেন? রাজা ওভিড্ডো কেন গাছটার গোড়ায় ওষুধ ঢালার ব্যবস্থা করেছিল। ঐ বৈদ্যরা বংশানুক্রমে ঐ মরা গাছটার গোড়ায় ওষুধ দিয়ে আসছে কেন? মরা গাছটা বেঁচে আছে এটাও একটা রহস্য। সত্যিই কি ওষুধে এখনও কাজ হচ্ছে? শাঙ্কো বলল।
